
অটোয়া নদীর তীরে গড়ে ওঠা এ শহর যেন কানাডার হৃদস্পন্দন। বসন্তে টিউলিপের রঙিন সমারোহ, গ্রীষ্মে প্রাণচঞ্চল সবুজ ছায়া, শরতে আগুনরাঙা পাতার মিছিল আর শীতে শুভ্র তুষারের আস্তরণে মোড়া এই শহর এক আশ্চর্য রূপকথার নাম। ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের এক দুর্লভ সংমিশ্রণ অটোয়া। বৃক্ষের পাতায় পাতায় বয়ে চলে আদিবাসী সংস্কৃতির গোপন ভাষা, আর গগনে দাঁড়িয়ে থাকা পার্লামেন্ট বিল্ডিং যেন কানাডার অহংকার। অটোয়া শুধু একটি রাজধানী শহর নয়, এটি একটি বোধ, একটি পরিচয়, একটি সৌন্দর্যপিপাসু হৃদয়ের ঠিকানা।
অটোয়া’ অর্থ কেউ বলেন সওদাগর, কেউ বলেন জঙ্গলের মানুষ। ১৬১৩ সাল অর্থাৎ ইউরোপীয়রা আসার আগে অটোয়া নদীটি ছিল আদিবাসীদের হাইওয়ে। নামটি তাদেরই দেওয়া। ১৮৫৭ সালে বাঙালিরা যখন সিপাহী বিদ্রোহ ঘোষণা করলো, সে বছরই রানি ভিক্টোরিয়া অটোয়াকে কানাডার রাজধানী ঘোষণা করেন। না, বাঙালিদের সঙ্গে এ ঘটনার কোনো যোগসূত্র নেই। তবে ঐ সময়ে আমরা উভয়েই ছিলাম ব্রিটিশের অধীন। আজ আমরা স্বাধীন, কানাডা আজও ব্রিটিশের অধীন।
অটোয়াতে কয়েক হাজার বাংলাদেশির বসবাস। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরাও রয়েছেন। দিন দিন বাঙালিদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে বাঙালিরা ছুটে আসছেন এ শহরে—কানাডার অন্যান্য শহর থেকেও। রাজধানী বলে কথা! ছিমছাম এ শহরে বাঙালিরা বেশ ভালোই আছেন।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে রাজধানী অটোয়া পৌঁছলাম। আমাদের অটোয়া প্রতিনিধি ওবায়দুল হক এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল স্বাগত জানালেন। গিয়ে উঠলাম ওবায়েদের বাসায়। ‘দেশে-বিদেশে’র সহকারী সম্পাদক মহসিন বখত খুব শর্ট নোটিশে চলে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। নিজে তো গিয়েছেন, পরিবারের অন্য সবাইকেও সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন। তবে বাড়ির চাবি এবং গাড়ি রেখে গিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সোলেমান আলীর তত্ত্বাবধানে। ওবায়েদের ঘর থেকে ফোন করলাম তাঁকে (সোলেমান আলীকে)। তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর ওখানে চলে যাওয়ার আহ্বান জানালেন। আন্তরিক এ আহ্বান উপেক্ষা করা গেল না। চলে গেলাম সবাই মিলে তাঁর ওখানে। মাত্র কিছুদিন আগে তিনি মনট্রিয়ল থেকে অটোয়া এসেছেন।
বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ জমে উঠলো—রাজনীতি, দূতাবাস, বাঙালি সমাজ ইত্যকার বিষয়ে আলাপ কোনো সময় শেষ হয় না। সেদিনও হয়নি। খাওয়া-দাওয়া শেষে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত গল্প চললো।
পরদিন ঘুম থেকে উঠলাম সকাল এগারোটায়। ওবায়েদ বোধহয় পুরো সপ্তাহের ছুটি নিয়ে নিয়েছিল। জুয়েলও। দুজনে ঠিক সময় চলে এলে বের হলাম শহর দর্শনে।
চারদিকে ফুল আর ফুল—নানা রঙের টিউলিপ ফুল। এ শহরে প্রতি বছর টিউলিপ ফুলের ফেস্টিভাল অনুষ্ঠিত হয়। এদিন আবহাওয়া ছিল বেড়ানোর প্রতিকূলে। ঝড়ো হাওয়া আর গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। রাস্তাঘাট ছিল প্রায় জনশূন্য। গাড়ি থেকে নামতে ইচ্ছে করছিল না। ছবি দেখে যেমন ফলের স্বাদ পাওয়া যায় না, তেমনি বাইরে থেকে পার্লামেন্ট হিল কিংবা মিউজিয়াম অব সিভিলাইজেশন দেখে তৃপ্তি পেলাম না।
ওবায়েদকে জিজ্ঞেস করলাম, বাঙালিদের কোনো আড্ডা কোথাও জমে কি না। না, সে ধরনের পরিবেশ অটোয়াতে নেই। আরও জানলাম এখানে বিএনপি-আওয়ামী লীগ নেই। কোনো আঞ্চলিক সংগঠন নেই। বাংলাদেশের নামে একটাই সংগঠন আছে—বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অটোয়া ভ্যালি। অবাক লাগলো। এ কী করে সম্ভব! না ঠিকই, অটোয়ার বাঙালিরা প্রমাণ করেছেন—ইচ্ছে থাকলে সবই সম্ভব।
সন্ধ্যায় ঘরে ফিরতেই দেখি মহসিন বখত এবং মুক্তিযোদ্ধা শাহেদ বখত (ময়নু ভাই) বসে রয়েছেন। তারা তাদের আমেরিকা সফর সংক্ষিপ্ত করে একদিন আগেই ফিরে এসেছেন। আবার তল্পিতল্পা গোটাতে হলো।
সোলেমান ভাইয়ের স্ত্রী মনঃক্ষুণ্ণ হলেও ফিরে চললাম পুরনো বাসস্থানে। অর্থাৎ মহসিন বখতের বাড়িতে। পুরনো এজন্যেই বলছি, আগেরবারও ওখানে ছিলাম। এ বাড়ির বৈশিষ্ট্য প্রচুর। প্রথমত, এখানে থাকতে আমার ভালো লাগে। অতিথি ভাবটা আমার আসে না। দ্বিতীয়ত, এ বাড়িতে একজন মহিলা রয়েছেন যাকে মনে হয় অনেকদিনের চেনা। একজন প্রাণখোলা নারী—বেগম শাহেদ। হাসতে জানেন। গতবার দেখে গিয়েছিলাম তিনি একা। এবার এসে দেখি একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট পেয়েছেন। অর্থাৎ বেগম মহসিন।
রাতে আমরা বেরিয়ে গেলাম ‘সুপার এক্স’ দেখতে। বিরাট মেলা। প্রতি বছর এ সময় অটোয়ায় প্রধান আকর্ষণ এটা। ঠিক টরন্টোর কানাডিয়ান ন্যাশনাল এক্সিবিশনের মতো। শিশুদের জন্যে রকমারি খেলাধুলা ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা এবং জুয়া। রাত প্রায় একটা পর্যন্ত আমরা ওখানে কাটালাম। বেশ ভালোই লেগেছে। তবে সবচেয়ে বেশি খুশি দেখলাম সোলেমান ভাইকে। ময়নু ভাই জানালেন, এ খুশির কারণ তিনি ভিডিওতে বন্দি করে রেখেছেন।
অটোয়ার বাংলাদেশি মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ‘মদিনা গ্রোসারি’। মালিকের নাম পারভেজ। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। তিনি ‘দেশে-বিদেশে’ পত্রিকার একজন অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। জানতে পারলাম তিনি রাতে দোকান বন্ধ করে ঘরে ঘরে পত্রিকা পৌঁছে দেন। পত্রিকাটি তাঁর অত্যন্ত ভালো লাগে।
পারভেজ আমাকে উপলক্ষ করে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন অটোয়া শহর থেকে খানিকটা দূরে। এ শহরের নাম নেপিয়ান। রাত আটটায় আমরা পৌঁছালাম তাঁরই আত্মীয় সেলিম লিবরা খানের বাড়িতে। অনেক লোককে তিনি নিমন্ত্রণ করেছেন এ অনুষ্ঠানে। আমন্ত্রিত অতিথিদের গল্পগুজবে ঘর গমগম করছিল। একে একে পরিচয় হলো সবার সঙ্গে। মাত্র একমাস হয় কানাডায় এসেছেন এমন লোকও যেমন ছিলেন, তেমনি দুই যুগ ধরে বসবাস করছেন তারাও এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের লোকও। প্রত্যেকেই নিয়মিত পত্রিকা পড়েন।
শুরু হলো আলোচনা। আলোচনায় একদিকে পত্রিকার প্রশংসা যেমন স্থান পেল, তেমনি নানা পরামর্শও দিয়েছেন কেউ কেউ। পারভেজ সকল অতিথিকে নৈশভোজে আপ্যায়িত করেন।
দুপুরে এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হলো। তাঁর নাম মইনুল ইসলাম। আলাপ হওয়ার পর তাঁকে ছেড়ে আসতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। গাড়িতে উঠেই ময়নু ভাইকে বললাম, এ ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ শেষ হয়নি। রাতে তাঁর সঙ্গে আবার বসতে চাই। ময়নু ভাই ভদ্রলোককে ফোন করে আমার অভিপ্রায়ের কথা জানালেন। রাত বারোটায় আমরা তাঁর বাড়িতে গেলাম।
ষাটোর্ধ্ব ভদ্রলোক। বয়সের ছাপ মোটেই লক্ষ করা যায় না। তরুণদের মতো তাঁর কথাবার্তা, আচরণ। কানাডায় বিগত দিনগুলোতে এ পর্যন্ত যত লোকের সঙ্গে দেখা হয়েছে, এমন হাস্যোজ্জ্বল প্রাণখোলা মানুষ দেখিনি। এমন প্রাণচাঞ্চল্য তরুণদের মাঝেও নেই বুঝি! তিনি সাপ্তাহিক ‘দেশে-বিদেশে’র একনিষ্ঠ ভক্ত।
মইনুল ইসলাম ইংল্যান্ডে ছিলেন দীর্ঘদিন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে লন্ডনকেন্দ্রিক যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সে আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। স্মৃতি থেকে অনেক মজার মজার কাহিনি শোনালেন। ছোট ছোট সে কাহিনি, কিন্তু প্রাণস্পর্শী। বাঙালিরা সপ্তাহ শেষে বেতন পেয়ে টাকাটা কীভাবে উদার হস্তে মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে তুলে দিতেন, কীভাবে বাস রিজার্ভ করে দূর-দূরান্ত থেকে লন্ডন শহরে ছুটে আসতেন—তার জীবন্ত ইতিহাস তিনি।
প্রবাসীরা মুক্তিযুদ্ধে কীভাবে সহায়তা করেছিলেন, তার অনেক গল্প আমরা শুনেছি। কিন্তু নাম না-জানা নিরক্ষর ব্যক্তিরা তাদের বেতনের চেক ভাঙিয়ে কীভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে টাকাগুলো আন্দোলনকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার অপেক্ষা করতেন—তাদের কথা কোথাও শুনিনি। লন্ডনের রাজপথে হাজার হাজার বাঙালি যখন ‘জয় বাংলা’ বলে গগনবিদারী আওয়াজ তুলতেন, তখন সে মিছিলের বয়োবৃদ্ধরা ‘হায়রে বাংলা’ বলে বুক চাপড়াতেন।
সে আহাজারির কথা আমরা এ পর্যন্ত জানতে পারিনি। মইনুল ইসলাম সে কাহিনি শোনালেন। দেশ স্বাধীন হয়ে গেলে তিনি লন্ডনে ‘বনফুল’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট দিয়েছিলেন। সে রেস্টুরেন্টে বাংলাদেশের খ্যাতনামা ব্যক্তিদের পদচারণা ছিল প্রায়ই। টুকরো টুকরো সেসব কাহিনীর অংশবিশেষও শোনালেন।
মইনুল ইসলাম জীবনে অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন। এদের মধ্যে যেমন আছেন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, তেমনি আছেন বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক এবং সঙ্গীতশিল্পী। তাঁর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার বিশাল। কত যে বিশাল, একবার কেউ আলাপ করলেই বুঝতে সক্ষম হবেন। প্রচুর পড়াশোনা করেন তিনি। বিশ্ব রাজনীতির সকল খবর তাঁর নখদর্পণে। সবচেয়ে বড় কথা, একজন বাঙালি বলে পরিচয় দিতে তিনি গর্ববোধ করেন।
এক বিচিত্র ধরনের জীবনযাপন করেন মইনুল ইসলাম। কাজের অবসরে তাঁর অভ্যাস বই পড়া। ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বই আর পত্রিকা। তাঁর ঘরে টেলিভিশন নেই। তিনি টেলিভিশন দেখেন না। খবর শোনেন রেডিওতে। কোথাও বেড়াতে যাওয়াও তাঁর পছন্দ নয়। বেশিরভাগ সময় বেড়াতে যান লাইব্রেরিতে। এমন মানুষ নিজেই যে একটি লাইব্রেরি হয়ে গেছেন, তা উপলব্ধি করলাম তাঁর সঙ্গে আলাপ করার পর।
মইনুল ইসলামের কিছু লক্ষ্য আছে। না, তাঁর এ লক্ষ্য গাড়ি, বাড়ি কিংবা কোটিপতি হওয়ার নয়। তিনি রাজনীতিতেও নাম লেখাতে চান না। তাঁর খুব ছোট্ট দুটি ইচ্ছের কথা তিনি আমাকে জানালেন। প্রথম ইচ্ছেটি হচ্ছে, প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর নামে একটি রাস্তার নামকরণ।
তিনি চান লেখকের জন্মভূমি মৌলভীবাজার শহরের পুরনো হাসপাতাল রোডটি সৈয়দ মুজতবা আলীর নামে করা হোক। আর দ্বিতীয় ইচ্ছে হচ্ছে—কবি ও সুরসাধক রাধারমণের নামে সুনামগঞ্জ শহরে একটি রাস্তার নামকরণ।
অবাক হলাম! যে কাজটি মৌলভীবাজার এবং সুনামগঞ্জবাসীর অনেক আগেই করার কথা ছিল, সে প্রস্তাব দিচ্ছেন অত্র দুই এলাকার বাসিন্দা না হয়েও একজন ব্যক্তি। তাও হাজার মাইল দূর থেকে, যিনি চল্লিশ বছর আগে দেশ ছেড়েছেন।
সত্যিই, মইনুল ইসলাম আমাদের লজ্জা দিলেন। তিনি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন। যে কৃতী পুরুষদের কারণে আমরা ধন্য এবং গর্বিত, তাদের আমরা মূল্যায়ন করতে পারিনি। এর চেয়ে লজ্জা আর কী হতে পারে?
মনীষীরা বলে গেছেন, ‘যে সমাজে গুণীর কদর হয় না, সে সমাজে গুণীর জন্ম হয় না।’
অজ্ঞতা হোক, আত্মার সীমাবদ্ধতা কিংবা যে কারণেই হোক, আমরা আমাদের কৃতী পুরুষদের সম্মান দিতে পারিনি। কিন্তু আর দেরি করা উচিত হবে না। আশা করবো মইনুল ইসলামের প্রস্তাব অনুযায়ী শীঘ্রই দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী তথা তাবৎ নাগরিকরা উল্লিখিত দুই কৃতী পুরুষকে সম্মানিত করে ধন্য হবেন।
সর্বশেষ: মৌলভীবাজার শহরের প্রধান একটি সড়কের নাম সৈয়দ মুজতবা আলীর নামে নামকরণ করা হয়েছে।
টরন্টো, ২৬ আগস্ট ১৯৯৭









