সম্পাদকের পাতা

Birth Tourism ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৯০০ ভিসা বাতিল

নজরুল মিন্টো

বছরের পর বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক দম্পতি যুক্তরাষ্ট্রে আসতেন একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। স্ত্রী সন্তানসম্ভবা, আর পরিকল্পনা ছিল শিশুটির জন্ম হবে আমেরিকার মাটিতে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশু সাধারণভাবে জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন নাগরিকত্ব পায়। এই সুযোগকে ঘিরেই বিস্তার ঘটে Birth Tourism-এর। পরে বিদেশিদের আবাসন, হাসপাতাল ও সন্তান জন্মের ব্যবস্থা করে দিতে গড়ে ওঠে নানা প্রতিষ্ঠান ও মধ্যস্থতাকারী নেটওয়ার্ক।

বারাক ওবামার প্রশাসনের সময় ২০১৫ সালের মার্চে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় এ ধরনের ব্যবসার বিরুদ্ধে বড় অভিযান চালায় ফেডারেল এজেন্টরা। অভিযানে ৩৫টি তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করা হয়। তদন্তে এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া যায়, যারা মূলত চীনা নারীদের পর্যটক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এনে সন্তান জন্ম দেওয়ার ব্যবস্থা করত। তদন্তকারীদের অভিযোগ ছিল, গ্রাহকদের ভিসা সাক্ষাৎকারে সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন করা এবং অভিবাসন কর্মকর্তাদের কাছে কী বলতে হবে, সে বিষয়েও পরামর্শ দেওয়া হতো।

ওই তদন্তের ধারাবাহিকতায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সময় ২০১৯ সালে ১৯ জনের বিরুদ্ধে ফেডারেল অভিযোগ আনা হয়। মার্কিন বিচার বিভাগ জানায়, Birth Tourism ব্যবসার অপারেটর ও গ্রাহকদের বিরুদ্ধে সেটিই ছিল এ ধরনের প্রথম ফেডারেল ফৌজদারি মামলা। Birth Tourism যে বড় অঙ্কের ব্যবসায় পরিণত হয়েছিল, তার নমুনাও পাওয়া যায় ওই মামলায়। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠান পাঁচ শতাধিক চীনা নারীকে সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এনেছিল এবং জনপ্রতি ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার মার্কিন ডলার নিত। আরেক প্রতিষ্ঠানের ‘VIP’ প্যাকেজের মূল্য ছিল এক লাখ ডলার পর্যন্ত।

এরপর ২০২০ সালের ২৪ জানুয়ারি ট্রাম্প প্রশাসন B শ্রেণির নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার নিয়ম পরিবর্তন করে। নতুন বিধিতে বলা হয়, কোনো কনস্যুলার কর্মকর্তা যদি মনে করার যথেষ্ট কারণ পান যে আবেদনকারীর যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রধান উদ্দেশ্য সেখানে সন্তান জন্ম দিয়ে শিশুর মার্কিন নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা, তাহলে সেই উদ্দেশ্যে B ভিসা দেওয়া হবে না।

জো বাইডেনের প্রশাসনেও ওই ভিসা বিধি বহাল থাকে এবং আগের Birth Tourism মামলাগুলোর বিচার চলতে থাকে। ২০২৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় এ ধরনের একটি ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগে দুজনকে ষড়যন্ত্র ও আন্তর্জাতিক অর্থপাচারের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে ফেডারেল জুরি। অর্থাৎ প্রশাসন বদলালেও Birth Tourism ঘিরে ভিসা প্রতারণা ও সংগঠিত ব্যবসার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ অব্যাহত ছিল।

দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে ট্রাম্প এ অভিযান আরও বিস্তৃত করেন। চলতি বছরের এপ্রিলে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা ICE Birth Tourism নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে নতুন উদ্যোগ নেয়। এরপর ৬ আগস্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প Ending Birth Tourism শিরোনামে Executive Order 14419 জারি করেন। এতে পররাষ্ট্র দপ্তর ও ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটিকে Birth Tourism ঠেকাতে ভিসা ও প্রবেশসংক্রান্ত ক্ষমতা সক্রিয়ভাবে ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়।

নির্বাহী আদেশে Birth Tourism-এ অংশ নেওয়া ব্যক্তির পাশাপাশি এতে সহায়তাকারী ব্যক্তি ও নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে ভিসা বা অন্যান্য ভ্রমণ অনুমোদন প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তবে কোনো নারী গর্ভবতী হলেই তার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ হয় না। বৈধ চিকিৎসার প্রয়োজনেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেন, যদি ভিসার শর্ত পূরণ করেন এবং সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন না করেন।

১২ আগস্ট মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর গঠন করে Birth Tourism Prevention Task Force। দপ্তরটি জানায়, এই দল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসাধারীদের ভ্রমণের ইতিহাস ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা করছে এবং Birth Tourism-এ অংশ নেওয়া বা এতে সহায়তার তথ্য পাওয়া গেলে ভিসা বাতিলসহ ব্যবস্থা নিচ্ছে।

২০ আগস্ট পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট জানান, Birth Tourism-সংক্রান্ত অভিযানে প্রায় ৯০০টি ভিসা বাতিল করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জাতীয়তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এর মধ্যে কোন দেশের কতজন নাগরিক রয়েছেন, তা জানা যায়নি।

২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের আওতা সীমিত করতে Executive Order 14160 জারি করেন। এতে অবৈধভাবে বা সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের সন্তানের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি আদালতে গড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছে।

২০২৬ সালের ৩০ জুন সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ ভোটে ট্রাম্প প্রশাসনের ওই উদ্যোগের বিরুদ্ধে রায় দেয়। আদালত জানায়, অবৈধভাবে বা সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বিদেশিদের সেখানে জন্ম নেওয়া সন্তানরাও চতুর্দশ সংশোধনীর নাগরিকত্ব সুরক্ষার আওতায় পড়ে।

ফলে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব এবং Birth Tourism এক বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুর নাগরিকত্ব সাংবিধানিক প্রশ্ন। আর সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন করে বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভিজিটর ভিসা নেওয়া ভিসা ও অভিবাসন আইনের আলাদা বিষয়।

Birth Tourism-এর মাধ্যমে বছরে ঠিক কত শিশু যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়, তার নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ সরকারি হিসাব নেই। একইভাবে প্রায় ৯০০ বাতিল ভিসার মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন কি না, সে তথ্যও এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি।

তবে সাম্প্রতিক অভিযান একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে ভিসা আবেদনে সফরের উদ্দেশ্য গোপন করা, মিথ্যা তথ্য দেওয়া কিংবা কোনো নেটওয়ার্কের সহায়তায় ভিসা ব্যবস্থাকে পাশ কাটানোর চেষ্টা গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তাই সন্তানের মার্কিন নাগরিকত্বের আশায় ভুল তথ্য বা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে Birth Tourism-এর পথে পা বাড়ানোর আগে এর আইনি পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি।

তথ্যসূত্র:
U.S. Department of State, Birth Tourism Prevention Task Force
U.S. Department of Justice, Birth Tourism Cases


Back to top button
🌐 Read in Your Language