শ্রমশোষণ ও যৌন নিপীড়ন মামলায় সাসকাচুয়ানে দুই বাংলাদেশির সাজা নির্ধারণ ২২ অক্টোবর
নজরুল মিন্টো

সাসকাচুয়ানের আলোচিত যৌন নিপীড়ন ও শ্রমশোষণ মামলায় দুই বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী সোহেল হায়দার ও মোহাম্মদ মাসুমকে দোষী সাব্যস্ত করার রায়ের বিস্তারিত প্রকাশ্যে এসেছে। শুক্রবার ২১ আগস্ট প্রকাশিত সর্বশেষ আদালত প্রতিবেদনে বিচারক মিগেল মার্টিনেজ বলেছেন, দুই আসামির অপরাধ নিয়ে তাঁর “কোনো যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ নেই।” একই সঙ্গে আদালতে S.K. নামে পরিচিত বাংলাদেশি নারীটির সাক্ষ্যকে তিনি বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য বলে গ্রহণ করেছেন। প্রায় ১৮ মাস ধরে দফায় দফায় চলা বিচার শেষে গত জুনে শুনানি শেষ হয় এবং ৭ আগস্ট দুই ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
সোহেল হায়দার মানবপাচারের একটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে মোহাম্মদ মাসুম মানবপাচারের পাশাপাশি তিনটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগেও দোষী হয়েছেন। ১৪ আগস্ট তাঁদের সাজা নির্ধারণের কথা থাকলেও তা হয়নি। আদালত সাজা নির্ধারণের শুনানি পিছিয়ে আগামী ২২ অক্টোবর নতুন তারিখ ধার্য করেছেন। এর আগে দুই দোষী ব্যক্তির বিষয়ে পৃথক সাজাপূর্ব প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৭ আগস্ট রায়ের পর থেকেই হায়দার ও মাসুম হেফাজতে রয়েছেন এবং অক্টোবরের শুনানি পর্যন্ত তাঁরা সেখানেই থাকবেন।
ঘটনার শুরু ২০২২ সালে। বাংলাদেশ থেকে ভিজিটর ভিসায় কানাডায় আসা ওই নারী টরন্টোয় অবস্থানকালে চাকরির সন্ধান করছিলেন। একটি চাকরির বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে সোহেল হায়দারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। হায়দার তাঁকে সাসকাচুয়ানের Gull Lake-এ তাঁর রেস্তোরাঁয় কাজের প্রস্তাব দেন এবং কাজের অনুমতিপত্রের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন। তাঁকে মাসে এক হাজার ডলার বেতন, থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু Gull Lake-এ গিয়ে তাঁর জীবন দ্রুত বদলে যায়। আদালতে উঠে আসে, তিনি দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা, সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করতেন; দুপুরের খাবারের জন্য বিরতি ছিল মাত্র আধঘণ্টা। অথচ সেই কাজের জন্য তিনি বেতন পাননি।
একপর্যায়ে তাঁকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে Gull Lake থেকে Tisdale-এ নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তিনি মোহাম্মদ মাসুমের Little Town Restaurant-এ কাজ শুরু করেন। আদালতে ওই নারী জানান, কাজের অনুমতিপত্রের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে মাসুম তাঁর কাছ থেকে ২০ হাজার ডলার দাবি করেন। একই সঙ্গে ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে একাধিকবার তাঁকে যৌন নিপীড়ন করা হয় এবং বিষয়টি প্রকাশ না করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। বিচারক মার্টিনেজ দীর্ঘ জেরা ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে ওই নারীর বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য বলে গ্রহণ করেন। শেষ পর্যন্ত মাসুমকে মানবপাচারের পাশাপাশি তিনটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
এই ঘটনা বাইরে আসার পেছনে সাসকাচুয়ানের প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য ডগ স্টিল এবং সাবেক সদস্য হিউ নার্লিয়েনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। Gull Lake-এর রেস্তোরাঁয় নিয়মিত যাতায়াতের সময় স্টিল ওই নারীর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। পরে নারীটিকে Tisdale-এ পাঠানো হলে তিনি নার্লিয়েনকে বিষয়টি দেখতে বলেন। নার্লিয়েন Little Town Restaurant-এ গিয়ে গোপনে ওই নারীকে স্থানীয় নবাগত অভিবাসী সহায়তা কেন্দ্রের যোগাযোগের তথ্য দেন। সেই সূত্র ধরে তিনি সাহায্য চাইতে সক্ষম হন। পরে তাঁকে Swift Current-এ নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে নতুন ফোন নম্বর, ব্যাংক হিসাবের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য কার্ড এবং নতুন কাজের অনুমতিপত্র পেতে সহায়তা করা হয়। সহায়তাকারীরাই পরে বিষয়টি আরসিএমপিকে জানান।
মামলাটি সাসকাচুয়ানে কর্মসংস্থানের আড়ালে মানবপাচার ও শ্রমশোষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এখানে কাউকে সীমান্ত পেরিয়ে পাচার করার প্রচলিত চিত্রের বদলে সামনে এসেছে একজন নতুন অভিবাসীর চাকরি, কাজের অনুমতিপত্র, আয় ও চলাফেরার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তাঁকে শোষণের ঘটনা। আদালতের রায়ে সেই নিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘ সময় কাজ করানো, বেতন না দেওয়া এবং অভিবাসন পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর মাসুমের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যৌন নিপীড়ন।
এখন মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ দিন ২২ অক্টোবর। সেদিন সাসকাটুনের প্রাদেশিক আদালতে সোহেল হায়দার ও মোহাম্মদ মাসুমের সাজা নির্ধারণের বিষয়টি আবার উঠবে। তার আগে তাঁদের ব্যক্তিগত পটভূমি ও সাজা নির্ধারণে প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয় নিয়ে সাজাপূর্ব প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়বে। যৌন নিপীড়ন, শ্রমশোষণ ও মানবপাচারের এই আলোচিত মামলায় শেষ পর্যন্ত দুই বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীর ভাগ্যে কী শাস্তি অপেক্ষা করছে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র:
saskNOW, August 21, 2026









