সম্পাদকের পাতা

কুইবেকের প্রাদেশিক নির্বাচনে বাংলাদেশি তাহমিনা কবির

নজরুল মিন্টো

দুই দশক আগে একজন দক্ষ অভিবাসী হিসেবে বাংলাদেশ থেকে কুইবেকে এসেছিলেন তাহমিনা কবির। তাঁর দেশের বাড়ি ঢাকার অদূরে গাজীপুর জেলায়। নতুন দেশে জীবন শুরু করার পর থেকেই তাঁর পথচলার বড় অংশ জুড়ে ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কখনো সমাজকর্মী, কখনো কমিউনিটি কর্মী, আবার কখনো নতুন অভিবাসীদের ফরাসি ভাষার সঙ্গে পরিচিত করে তোলার কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিনের সেই সামাজিক ও কমিউনিটি কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার সরাসরি রাজনীতির মাঠে নামছেন তাহমিনা। আগামী ৫ অক্টোবর কুইবেকের প্রাদেশিক নির্বাচনে মন্ট্রিয়লের Saint-Laurent আসন থেকে ক্ষমতাসীন Coalition Avenir Québec বা CAQ-এর প্রার্থী হয়েছেন তিনি।

কুইবেকের প্রিমিয়ার এবং CAQ নেতা Christine Fréchette গত ১৪ আগস্ট তাহমিনা কবিরের প্রার্থিতা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। একই দিনে মন্ট্রিয়লের আরও তিনটি আসনের প্রার্থীও ঘোষণা করা হয়। দলটির প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, ২০০৬ সালে skilled immigrant হিসেবে কুইবেকে আসেন তাহমিনা। এরপর থেকেই বিভিন্নভাবে নাগরিক ও কমিউনিটির সেবায় যুক্ত রয়েছেন তিনি।

পেশাগত জীবনে তাহমিনা একজন সোশ্যাল ওয়ার্কার ও কমিউনিটি কর্মী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং Université de Montréal থেকে সমাজকর্মে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন। মন্ট্রিয়লের CLSC Côte-des-Neiges-এর সঙ্গেও তাঁর পেশাগত সম্পৃক্ততা রয়েছে। নতুন অভিবাসীদের কুইবেক সমাজে একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে ফরাসি ভাষা শেখা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রেও কাজ করেছেন তাহমিনা। CAQ তাঁকে francisation ambassador হিসেবে উল্লেখ করেছে। ফরাসি, বাংলা ও ইংরেজি তিন ভাষাতেই তিনি কাজ করতে পারেন।

চাকরির বাইরেও তাঁর কমিউনিটি সম্পৃক্ততা বিস্তৃত। স্থানীয় একটি ডে-কেয়ারের পরিচালনা পর্ষদে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের governing board-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠনে বাংলা, ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় দোভাষীর দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিবাসী পরিবার, শিশু ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার কাছাকাছি থেকে কাজ করার এই অভিজ্ঞতাই পরে তাঁর রাজনৈতিক আগ্রহের ভিত্তি তৈরি করেছে। CAQ-এর ভাষ্য অনুযায়ী, আবাসন, গৃহহীনতা, দারিদ্র্য ও নগর নিরাপত্তা তাঁর বিশেষ আগ্রহের বিষয়।

রাজনীতিতে আসার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাহমিনা বলেছেন, কমিউনিটিতে মানুষের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার কাজ তিনি বরাবরই পছন্দ করেছেন। এখন Saint-Laurent-এর এমএনএ হিসেবে সেই কাজ আরও বড় পরিসরে করতে চান। তাঁর প্রচারের বক্তব্যে জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন এবং সরকারি সেবায় মানুষের প্রবেশাধিকারকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলছেন, Saint-Laurent-এর মানুষের প্রয়োজন ও উদ্বেগ শুনে সেগুলো কুইবেকের জাতীয় পরিষদে তুলে ধরাই হবে তাঁর লক্ষ্য।

তবে তাহমিনার সামনে রাজনৈতিক লড়াইটি সহজ নয়। Saint-Laurent দীর্ঘদিন ধরেই Quebec Liberal Party-এর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ২০২২ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে Liberal প্রার্থী Marwah Rizqy পেয়েছিলেন ১৪ হাজার ৩০৪ ভোট, যা মোট বৈধ ভোটের ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী CAQ-এর Mélanie Gauthier পেয়েছিলেন ৪ হাজার ৯১ ভোট বা ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। Rizqy জয়ী হয়েছিলেন ১০ হাজার ২১৩ ভোটের বিশাল ব্যবধানে। ২০১৮ সালেও তিনি এই আসনে প্রায় ৬২ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন।

এবার অবশ্য Saint-Laurent-এর নির্বাচনী চিত্র কিছুটা ভিন্ন। Marwah Rizqy বর্তমানে কুইবেকের জাতীয় পরিষদে স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে রয়েছেন এবং আসন্ন নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না। ফলে দীর্ঘদিন পর আসনটিতে কোনো বর্তমান এমএনএ পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে থাকছেন না। সেই অর্থে Saint-Laurent এবার একটি উন্মুক্ত আসন। তবে অতীতের ভোটের ফল বলছে, Liberalদের শক্ত অবস্থান ভেঙে CAQ-এর জন্য জায়গা তৈরি করা তাহমিনার বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হবে।

২০ আগস্ট পর্যন্ত Saint-Laurent আসনে তাহমিনার বিপক্ষে ঘোষিত প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন Québec solidaire-এর Étienne Loiselle-Schiettekatte, Parti Québécois-এর Pierre-Étienne Nantel, Parti conservateur du Québec-এর Barry Rolbin, Green Party of Quebec-এর Pierre-Christophe Dagher Falardeau এবং Canadian Party of Quebec-এর Audrey Baillairgé। এছাড়া Joe Young দলীয় পরিচয় ছাড়া প্রার্থী হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন। তবে আসনটিতে দীর্ঘদিন আধিপত্য ধরে রাখা Quebec Liberal Party ২০ আগস্ট পর্যন্ত তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি।

Saint-Laurent আবার মন্ট্রিয়লের অত্যন্ত বহুসাংস্কৃতিক একটি এলাকা। এখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের মাতৃভাষা ফরাসি বা ইংরেজি নয়। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসী পরিবার এই এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমন একটি আসনে নিজে অভিবাসী হিসেবে কুইবেকে এসে সমাজকর্ম ও ভাষাগত সহায়তার কাজে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতাকে নির্বাচনী প্রচারে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে তাহমিনার। বাংলা, ফরাসি ও ইংরেজি তিন ভাষায় তাঁর যোগাযোগের সক্ষমতাও বহুভাষিক ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

Saint-Laurent মন্ট্রিয়লের অত্যন্ত বহুসাংস্কৃতিক একটি আসন। Élections Québec-এর ২০২১ সালের আদমশুমারি-ভিত্তিক হিসাবে, এখানে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী সংখ্যায় তুলনামূলক ছোট হলেও বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসী পরিবারও এই এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমন একটি বহুসাংস্কৃতিক এলাকায় নিজে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসী হিসেবে কুইবেকে এসে দীর্ঘদিন কমিউনিটি ও ভাষাগত সহায়তার কাজে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন তাহমিনা। বাংলা, ফরাসি ও ইংরেজি তিন ভাষায় তাঁর যোগাযোগের সক্ষমতাও রয়েছে।

CAQ নেতৃত্বও তাহমিনার কমিউনিটি অভিজ্ঞতাকেই সামনে আনছে। প্রার্থী ঘোষণার সময় Christine Fréchette বলেন, নতুন প্রার্থীদের কমিউনিটির প্রতি দায়বদ্ধতা, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করার মানসিকতা দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হবে। তাহমিনার ক্ষেত্রে সেই পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে প্রায় দুই দশকের সামাজিক ও কমিউনিটি কাজ।

২০০৬ সালে একজন অভিবাসীর নতুন জীবন শুরু করা থেকে ২০২৬ সালে কুইবেকের জাতীয় পরিষদে যাওয়ার লড়াই, তাহমিনা কবিরের পথচলা এখন নতুন এক পর্যায়ে। এতদিন মানুষের সমস্যা শুনেছেন সমাজকর্মী ও কমিউনিটি কর্মী হিসেবে। এবার সেই অভিজ্ঞতাকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে রূপ দিতে চাইছেন তিনি। Saint-Laurent-এর ভোটাররা তাঁকে সেই সুযোগ দেবেন কি না, তার উত্তর মিলবে ৫ অক্টোবরের নির্বাচনে।

এনএন/ ২০ আগস্ট ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language