
প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করেছে। পড়াশোনা থেকে চিকিৎসা, গবেষণা থেকে লেখালেখি, প্রতিদিনের অসংখ্য কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন মানুষের সঙ্গী। কিন্তু একই প্রযুক্তির সামনে যখন কোনো কিশোর পরিবারকে হত্যা করার কল্পনা নিয়ে বসে, চরিত্র তৈরি করে, গল্প বানায়, তখন বিষয়টি আর নিছক প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন সামনে আসে আরও কঠিন একটি প্রশ্ন। সন্তানের হাতে আদর করে স্মার্টফোন বা কম্পিউটার তুলে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সেই পর্দার আড়ালে তার চিন্তার জগতে কী ঘটছে, পরিবার তার কতটুকু জানতে পারছে?
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের অ্যাকটন শহরে মা ও ছোট ভাইকে হত্যার অভিযোগে ১৭ বছর বয়সী অর্জুন অরবিন্দের গ্রেপ্তারের ঘটনা সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম অর্জুনকে ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিসেবে উল্লেখ করেছে। তার বিরুদ্ধে ৪৫ বছর বয়সী মা সুধা ভেঙ্কটেশন এবং ১৪ বছর বয়সী ছোট ভাই সিদ্ধার্থ অরবিন্দকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ঘটনার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো হত্যাকাণ্ডের আগের কিছু অনলাইন কর্মকাণ্ড। মিডলসেক্স কাউন্টির ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি মারিয়ান রায়ান জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে অর্জুনের আচরণে উদ্বেগজনক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছিল। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সে ইন্টারনেট এবং ChatGPT ব্যবহার করে নিজের পরিবারকে হত্যার বিষয়ে নানা কাল্পনিক পরিস্থিতি ও কল্পকাহিনি তৈরি করছিল। রায়ানের ভাষায়, এগুলো ছিল অনেকটা গথিক উপন্যাসের মতো গল্প। সেখানে চরিত্র তৈরি করা হচ্ছিল এবং একের পর এক কাল্পনিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছিল, যার কেন্দ্রে ছিল পরিবারের সদস্যদের মৃত্যু বা তাদের আর বেঁচে না থাকার বিষয়টি।
ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার ১১ আগস্ট। সেদিন সকাল প্রায় সাতটার দিকে অর্জুনের বাবা কাজের জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় স্ত্রী সুধা ভেঙ্কটেশনকে শেষবার জীবিত দেখেছিলেন। সিদ্ধার্থকে সকালে একটি স্থানীয় বিনোদন কেন্দ্রে দেখা যায়। দুপুরের কিছু পর সে বাড়িতে ফিরে আসে।
সন্ধ্যায় একজন গৃহশিক্ষক নির্ধারিত সময়ে মার্থা লেনের বাড়িটিতে পড়াতে এসে দরজা বন্ধ পান। অনেক চেষ্টা করেও ভেতরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে তিনি অর্জুনের বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বাবাও স্ত্রী ও সন্তানদের ফোনে না পেয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার কিছু পর পুলিশকে বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেওয়ার অনুরোধ করেন।
পুলিশ বাড়িতে ঢুকে প্রথম তলায় ১৪ বছরের সিদ্ধার্থের মৃতদেহ এবং বেসমেন্টে সুধা ভেঙ্কটেশনের মৃতদেহ খুঁজে পায়। দুজনের শরীরেই গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল।
অর্জুন তখন বাড়িতে নেই। নেই তার মায়ের গাড়িটিও। পুলিশ রাতভর তাকে খুঁজতে থাকে। পরদিন বুধবার ভোর প্রায় ৩টা ৪০ মিনিটে অ্যাকটন থেকে প্রায় ১৩ মাইল দূরের ওয়েল্যান্ডের একটি পার্কিং লটে পুলিশ সেই Honda Accord গাড়িটি দেখতে পায়। গাড়ির ভেতরেই ছিল অর্জুন। কোনো বাধা ছাড়াই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
১৩ আগস্ট Concord District Court-এ তার বিরুদ্ধে দুটি হত্যা এবং গাড়ি সংক্রান্ত অভিযোগসহ একাধিক অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়। তার আইনজীবী ডেবরা ডিউইট একটি মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নের আবেদন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, অর্জুনের বাবা ছেলের জন্য সাহায্য চান। মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ সেপ্টেম্বর।
ম্যাসাচুসেটসের এই মর্মান্তিক ঘটনায় একটি পরিবার মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। একজন বাবা হারিয়েছেন স্ত্রী ও ছোট সন্তানকে, আর বড় সন্তান এখন সেই দুজনকে হত্যার অভিযোগে হেফাজতে। এই ঘটনা অভিভাবকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও রেখে গেছে। কিশোর সন্তান কতক্ষণ ফোন বা কম্পিউটারে সময় কাটাচ্ছে, শুধু সেই হিসাব রাখাই যথেষ্ট নয়। সে কী ধরনের বিষয় নিয়ে বারবার আগ্রহ দেখাচ্ছে, আচরণে বড় পরিবর্তন আসছে কি না, পরিবারের প্রতি অস্বাভাবিক ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে কি না, সহিংসতা বা প্রতিশোধের চিন্তা প্রকাশ পাচ্ছে কি না, এসবও পরিবারের নজরে থাকা দরকার। এমন লক্ষণ দেখা দিলে সেগুলোকে নিছক কিশোর বয়সের রাগ, কৌতূহল বা ‘গল্প লেখা’ বলে উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
তথ্যসূত্র:
CBS News Boston
The Guardian









