সিলেট ট্রিপল মার্ডারে নতুন মোড় সম্পত্তি বিরোধে ভাড়াটে খুনির অভিযোগ পরিবারের
নজরুল মিন্টো

সিলেট নগরীর রায়নগরে ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় নতুন মোড় এসেছে। নিহত দম্পতির যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা কোতোয়ালি মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়ে হত্যাকাণ্ডের পেছনে দীর্ঘদিনের সম্পত্তি বিরোধ ও পূর্বপরিকল্পিত হামলার অভিযোগ তুলেছেন।
শুক্রবার, ১৪ আগস্ট রাতে সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে সেলিনা সুলতানা সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ, মামলা প্রত্যাহারে একাধিকবার হুমকি এবং হত্যাকাণ্ডের পর গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও মামলার কাগজপত্র খোয়া যাওয়ার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, তাঁর দেওয়া এজাহারে ঘটনার পরপরই পুলিশের হাতে আটক রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়নি। সেলিনা অভিযোগে দাবি করেছেন, সম্পত্তি বিরোধের ধারাবাহিকতায় ‘পেশাদার ভাড়াটে খুনি’ ব্যবহার করে তাঁর বাবা-মা ও গৃহকর্মীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। ঘটনার পরদিন ১৩ আগস্ট যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরেন সেলিনা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, রায়নগর এলাকার একটি সম্পত্তি এবং পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমির মালিকানা নিয়ে আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এই বিরোধকে কেন্দ্র করে একাধিক মামলা আদালতে বিচারাধীন ছিল। আব্দুস সাত্তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ওই মামলাগুলোর আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন বলে তাঁর মেয়ে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন।
সেলিনা সুলতানার দাবি, মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাঁর বাবা এবং তাঁকে বিভিন্ন সময় চাপ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি বিকেলে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামসহ কয়েকজন তাঁদের পৈতৃক বাসায় যান এবং মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন। একপর্যায়ে তর্ক-বিতর্কের মধ্যে তাঁদের ‘দেখে নেওয়া হবে’ বলে হুমকি দেওয়া হয়। ওই ঘটনার পর সেলিনা কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন।
ঘটনা সেখানেই থেমে থাকেনি বলে দাবি পরিবারের। সেলিনা তাঁর অভিযোগে বলেন, ২০২৫ সালের ১৮ মে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের সামনে আবারও মামলা প্রত্যাহারের জন্য আব্দুস সাত্তার ও মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে চাপ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তৌহিদুল ইসলামকে মারধর এবং আব্দুস সাত্তারকে আঘাত করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। এ ঘটনায় পরে আদালতে মামলা করা হয়েছিল বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেলিনার ভাষ্য অনুযায়ী, এরপরও মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি বন্ধ হয়নি। এমনকি আব্দুস সাত্তারের নিয়োজিত আইনজীবীকেও প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। পরিবারের বক্তব্য, এসব ঘটনার ধারাবাহিকতার মধ্যেই ঘটে ১২ আগস্টের ভয়াবহ তিন হত্যাকাণ্ড।
বুধবার, ১২ আগস্ট সকালে সিলেট নগরীর রায়নগর রাজবাড়ী আবাসিক এলাকার মিতালী-১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয়তলা থেকে ৮২ বছর বয়সী আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী ৭৬ বছর বয়সী সুরাইয়া বেগম এবং তাঁদের গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনজনের শরীরেই ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়াকে আটক করে পুলিশ। তিনি ওই বাড়িতে আগে রঙের কাজ করেছিলেন। পুলিশের প্রথম দিনের বক্তব্যে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে তুলে ধরে বলা হয়েছিল, বাবুল একাই তিনজনকে হত্যা করেছেন। পরিবারের এজাহারে সম্পত্তি বিরোধ ও পূর্বপরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ সামনে আসায় পুলিশের সেই প্রাথমিক বর্ণনার পাশাপাশি তদন্তে এখন ভিন্ন একটি দিকও যুক্ত হয়েছে। বাবুল মিয়াকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
সেলিনা সুলতানা অভিযোগ করেছেন, হত্যাকাণ্ডের পর বাসা থেকে তাঁর বাবার সম্পত্তিসংক্রান্ত মামলার গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, সাধারণ ডায়েরির কপি এবং বিভিন্ন দলিল নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ‘১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিল’ ঘিরে বিরোধের কথা তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, ওই দলিল ও ভূমিসংক্রান্ত বিরোধের কারণে তাঁর বাবাকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চাপ দেওয়া হচ্ছিল।
এই অভিযোগ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ হত্যাকাণ্ডের দিনই আব্দুস সাত্তারের কক্ষের তিনটি ওয়ারড্রোব তছনছ অবস্থায় পাওয়া যায়। মেঝেতে পড়ে ছিল একটি দলিলের কপি। শুরু থেকেই পরিবারের সদস্য, আইনজীবী এবং স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি সম্পত্তি বিরোধকে তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছিলেন।
আব্দুস সাত্তারের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক এর আগে জানিয়েছিলেন, রিকাবীবাজারের পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা ও সেখানে ইম্পাস টাওয়ার নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিরোধ চলছিল। গির্জা সমিতির কাছ থেকে লিজ নেওয়া সম্পত্তি নিয়ে ২০২৩ সালে আব্দুস সাত্তার স্বত্ব মামলা করেন। পরে সেই মামলার আদেশের বিরুদ্ধে সিভিল রিভিশন মামলা হয়। ওই মামলার পরবর্তী শুনানি ১৯ আগস্ট হওয়ার কথা ছিল। হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও আব্দুস সাত্তার আদালতে একটি শুনানিতে উপস্থিত হয়েছিলেন বলে তাঁর আইনজীবী জানিয়েছিলেন।
এখন পরিবারের লিখিত অভিযোগে সেই পুরোনো বিরোধ, হুমকি, জিডি, আদালত চত্বরে হামলার অভিযোগ এবং হত্যাকাণ্ডের পর দলিলপত্র খোয়া যাওয়ার বিষয়গুলো একসঙ্গে সামনে এসেছে।
পরিবারের অভিযোগে হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিত হত্যার ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেলিনা সুলতানা দাবি করেছেন, পূর্ববিরোধের ধারাবাহিকতায় ‘পেশাদার ভাড়াটে খুনি’ ব্যবহার করে তাঁর বাবা, মা এবং গৃহকর্মীকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার এবং তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এখন পরিবারের আনুষ্ঠানিক অভিযোগের পর এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। পুলিশের প্রথম দিনের বর্ণনা এবং পরিবারের সম্পত্তি বিরোধকেন্দ্রিক অভিযোগের মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, তার উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে রায়নগরের এই তিন হত্যার প্রকৃত পটভূমি।
আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের চার সন্তানই এখন দেশে পৌঁছেছেন। যুক্তরাজ্যে থাকা দুই মেয়ে বৃহস্পতিবার সিলেটে আসেন। পরদিন শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরেন একমাত্র ছেলে আরিফ ইফতেখার এবং তাঁদের আরেক মেয়ে। বহু দূরে ছড়িয়ে থাকা চার ভাইবোন শেষ পর্যন্ত বাবা-মায়ের কাছে ফিরলেন, কিন্তু সেই ফেরা ছিল না বহুদিন পর পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আনন্দের যাত্রা। তাঁরা ফিরেছেন বাবা-মাকে শেষবারের মতো দেখতে, জানাজায় দাঁড়াতে এবং চিরবিদায় জানাতে।
শুক্রবার আসরের নামাজের পর সিলেটের শাহী ঈদগাহ ময়দানে আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাঁদের মানিক পীরের টিলায় দাফন করা হয়। জানাজার আগে আরিফ ইফতেখার উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। তিনি বাবা-মায়ের জন্য সবার কাছে দোয়া চান এবং তাঁদের জীবদ্দশায় কারও সঙ্গে কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানান। কারও কোনো পাওনা থাকলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও বলেন তিনি। দূরদেশে বসে যাঁদের কণ্ঠ শুনেছেন, মুখ দেখেছেন, সেই বাবা-মাকেই এবার চার সন্তানকে সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে হলো।
নিহত গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের জানাজা ও দাফনও সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট রাতে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার সদর ইউনিয়নের রায়নগর গ্রামের বাড়িতে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সেখানেই পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। পরিবারসূত্রে জানা গেছে, কোরবানির ঈদের পর আব্দুস সাত্তারদের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন তাহমিনা এবং নিজের উপার্জন দিয়ে পরিবারকে সহায়তা করতেন।
১২ আগস্ট সকালে মিতালী-১১১ নম্বর বাড়িতে ঠিক কী ঘটেছিল, তিন হত্যার নেপথ্যে আসলে কী ছিল এবং এর পেছনে আর কারও ভূমিকা ছিল কি না, সেই উত্তর এখন পুলিশের তদন্তেই খুঁজে বের করতে হবে। তবে তদন্তের ফল যাই হোক, একটি পরিবারের জন্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আর কখনও আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমকে ফিরিয়ে দেবে না, ফিরিয়ে দেবে না তাহমিনা বেগমকেও। রায়নগরের সেই বাড়িতে এখন রয়ে গেছে শোক, বহু স্মৃতি এবং এক মর্মান্তিক এ ঘটনার গভীর ক্ষত।









