সম্পাদকের পাতা

কানাডায় অভিবাসনে কড়াকড়ি ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় ৯৬৮ বাংলাদেশি

নজরুল মিন্টো

গত কয়েক বছরে কানাডার অভিবাসন নীতিতে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন এসেছে। একসময় তুলনামূলকভাবে উদার বলে পরিচিত দেশটি এখন ভিসা, আশ্রয় আবেদন এবং দেশে থাকার বৈধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অনেক বেশি কঠোর। সেই কড়াকড়ির চাপ পড়ছে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ওপর, আর উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির সর্বশেষ হিসাবে, দেশটি থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা বিদেশি নাগরিকদের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। একই সঙ্গে আশ্রয় আবেদন যাচাইয়ে কড়াকড়ি বাড়ছে এবং বিদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর কার্যক্রমও দ্রুততর হচ্ছে।

সিবিএসএর হিসাবে, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত কানাডা থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ৯৬৮ জন বাংলাদেশি। সংস্থাটির ভাষায় তাঁরা ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াধীন শ্রেণিতে রয়েছেন। কারও ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি সংগ্রহ করা হচ্ছে, আবার কারও ক্ষেত্রে বাকি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করা হচ্ছে। একই সময়ে সব দেশ মিলিয়ে এই শ্রেণিতে রয়েছেন মোট ৪০ হাজার ৮২৭ জন বিদেশি নাগরিক। এর মধ্যে ৩৬ হাজার ৬২২টি মামলা রিফিউজি ক্লেইম-সংক্রান্ত।

দেশভিত্তিক তালিকাটি দেখলে কড়াকড়ির ব্যাপ্তি আরও পরিষ্কার হয়। ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি রয়েছেন ভারতের নাগরিক, ৭ হাজার ৬৬৯ জন। এরপর রয়েছে মেক্সিকোর ৬ হাজার ৫৬১, যুক্তরাষ্ট্রের ২ হাজার ১৭৯, চীনের ১ হাজার ৮৯২, নাইজেরিয়ার ১ হাজার ৬৪৭, কলম্বিয়ার ১ হাজার ২৩৭, পাকিস্তানের ১ হাজার ১৩৯, ব্রাজিলের ১ হাজার ১১৮ এবং চিলির ১ হাজার ৩০ জন নাগরিক। এর পরেই ৯৬৮ জন নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান। এসব সংখ্যা থেকে বোঝা যায়, কানাডার অভিবাসনসংক্রান্ত কড়াকড়ি এখন বড় পরিসরে কার্যকর হচ্ছে।

বাংলাদেশিদের জন্য আরও উদ্বেগের বিষয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসেই ২২৭ জন বাংলাদেশিকে কানাডা থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সংখ্যাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০২০ সালে পুরো বছর মিলিয়ে এই সংখ্যা ছিল ৩০৮। অর্থাৎ ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর সংখ্যা ২০২০ সালের পুরো বছরের সংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশে পৌঁছে গেছে।

কানাডা যে সামগ্রিকভাবেই ফেরত পাঠানোর গতি বাড়িয়েছে, সেটিও সংখ্যায় পরিষ্কার। ২০২৪ সালে দেশটি ১৭ হাজার ৩৯৭ জন বিদেশিকে ফেরত পাঠায়। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ১৬০ জনে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ফেরত পাঠানো হয়েছে ১০ হাজার ৬০৭ জনকে। সিবিএসএ জানিয়েছে, বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৪০০ জন এমন বিদেশি নাগরিককে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, যাঁদের কানাডায় থাকার আইনি অনুমতি নেই বা যাঁরা দেশটিতে থাকার অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছেন। এই কার্যক্রম জোরদার করতে সরকারের সীমান্ত পরিকল্পনা থেকে ৩০ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ চিত্রটি পাওয়া যায় কানাডার অভিবাসন ও শরণার্থী বোর্ডের পরিসংখ্যানে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট ১৭ হাজার ২৩৯টি রিফিউজি ক্লেইম শরণার্থী সুরক্ষা বিভাগে পাঠানো হয়েছিল। ওই বছর নিষ্পত্তি হওয়া মামলার মধ্যে ৭৫০টি গ্রহণ করা হয় এবং ১৭৫টি প্রত্যাখ্যান করা হয়। ২০২৫ সালে নতুন করে পাঠানো দাবি নেমে আসে ৪ হাজার ৭০টিতে। সে বছর ১ হাজার ২০৩টি দাবি গ্রহণ করা হলেও ৮৬৭টি প্রত্যাখ্যান করা হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৫৪৭টি নতুন দাবি জমা পড়ে। একই সময়ে ২৪৮টি গ্রহণ করা হয় এবং ২৯৩টি প্রত্যাখ্যান করা হয়। ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৯ হাজার ৯৭২টি দাবি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল।

এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, বাংলাদেশিদের শরণার্থী দাবির গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত কমছে। শুধু গৃহীত ও প্রত্যাখ্যাত সিদ্ধান্ত ধরলে দেখা যায়, ২০২৪ সালে সিদ্ধান্ত পাওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রায় ৮১ শতাংশের দাবি গৃহীত হয়েছিল। ২০২৫ সালে সেই হার নেমে আসে প্রায় ৫৮ শতাংশে। আর ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে তা আরও নেমে দাঁড়ায় প্রায় ৪৬ শতাংশে। অর্থাৎ বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের প্রতি কানাডার দৃষ্টিভঙ্গি আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর হয়ে উঠেছে।

কানাডার নীতিতেও এ সময় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালের মার্চে আইনে পরিণত হওয়া সি-১২ নম্বর বিল আশ্রয় ব্যবস্থায় নতুন শর্ত যোগ করেছে। ২৪ জুন ২০২০-এর পর প্রথমবার কানাডায় প্রবেশের এক বছরের বেশি সময় পরে কেউ আশ্রয় দাবি করলে, ৩ জুন ২০২৫ বা তার পর করা সেই দাবি সাধারণ নিয়মে আর অভিবাসন ও শরণার্থী বোর্ডে পাঠানো হবে না। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্থলসীমান্তের নির্ধারিত প্রবেশপথের বাইরে ঢুকে ১৪ দিন বা তার বেশি সময় পরে আশ্রয় চাইলে সেই পথও কঠিন হয়ে গেছে। অর্থাৎ আশ্রয় আবেদনকে ঘিরে আগের অনেক ফাঁকফোকর বন্ধ করার দিকেই এগিয়েছে কানাডা।

কানাডার সরকারি নথি বলছে, ২০২৪ সাল থেকেই যেসব দেশ থেকে ভিসার অপব্যবহার, ভুল তথ্য দেওয়া কিংবা কানাডায় পৌঁছে পরে আশ্রয় দাবির প্রবণতা বেশি বলে চিহ্নিত হচ্ছিল, সেসব দেশের আবেদন আরও কড়া যাচাইয়ের মধ্যে আনা হয়। ওই তালিকায় বাংলাদেশ, ভারত ও নাইজেরিয়ার নামও রয়েছে। নতুন ঝুঁকি সূচক, গোয়েন্দা তথ্য এবং কর্মকর্তাদের জন্য বাড়তি নির্দেশনার কারণে ভিসা যাচাই এখন আগের তুলনায় অনেক কঠোর হয়েছে।

সাম্প্রতিক ফুটবল বিশ্বকাপও এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাই পর্যন্ত বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট অনুমোদন নিয়ে কানাডায় বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ১৭৫ জন পরে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০ জন বাংলাদেশি। আরও বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাংলাদেশিদের মাত্র ৪৫টি ভিজিটর ভিসা অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সংখ্যাটি বড় নয়, কিন্তু এই তথ্য দেখাচ্ছে যে সাময়িক ভ্রমণের সুযোগ নিয়েও কেউ কেউ স্থায়ী থাকার পথ খুঁজেছেন। ফলে বাংলাদেশিদের আবেদন নিয়ে কানাডার কর্তৃপক্ষের সন্দেহ ও কড়াকড়ি আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশিদের জন্য আরও কঠিন বার্তা আসছে ইউরোপ থেকেও। ইউরোপীয় আশ্রয় সংস্থার হিসাবে, ২০২৫ সালে ইউরোপের সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে বাংলাদেশিরা ৩৬ হাজার ৯০১টি রিফিউজি ক্লেইম করেছেন। সংখ্যার হিসাবে বাংলাদেশ ছিল চতুর্থ বৃহত্তম আবেদনকারী দেশ। আগের বছরের তুলনায় আবেদন কিছুটা কমলেও সংখ্যাটি এখনও বড়। কিন্তু বড় ধাক্কা হলো, ২০২৫ সালে বাংলাদেশিদের প্রথম ধাপের স্বীকৃতির হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর মধ্যে খুব অল্পসংখ্যকের আবেদনই প্রথম ধাপে স্বীকৃতি পেয়েছে।

সর্বশেষ চিত্র আরও কঠিন। ২০২৬ সালের মে মাসেও ইউরোপে প্রায় ৩ হাজার বাংলাদেশি রিফিউজি ক্লেইম করেছেন এবং টানা অষ্টম মাসের মতো তাঁরা আবেদনকারীদের মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম গোষ্ঠী ছিলেন। ওই মাসে বাংলাদেশিদের স্বীকৃতির হার আরও নেমে দাঁড়ায় মাত্র ২ শতাংশে। ১২ জুন থেকে নতুন সীমান্ত আশ্রয় প্রক্রিয়াও কার্যকর হয়েছে।

আরও উদ্বেগের বিষয়, ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রনটেক্সের হিসাবে ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহিঃসীমায় অনিয়মিত সীমান্ত পারাপারের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই ছিল শীর্ষে। মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুটেও বাংলাদেশি নাগরিকদের শনাক্তের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ। বৈধ পথের বাইরে ঝুঁকিপূর্ণ রুট ব্যবহারের এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে এবং বৈধ ভিসা ও আশ্রয় আবেদন যাচাইয়েও বাড়তি কড়াকড়ির পরিবেশ তৈরি করছে।

কানাডা এখন আশ্রয় আবেদন যাচাই এবং বিদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে অনেক বেশি কঠোর। বাংলাদেশের জন্য এই বার্তা আরও স্পষ্ট, কারণ একদিকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা বাংলাদেশিদের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে শরণার্থী দাবির গ্রহণযোগ্যতা কমছে, আবার ইউরোপেও একই রকম নেতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে। মিথ্যা তথ্য, সাজানো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ভিত্তিহীন আশ্রয় দাবির পথ ধরে বিদেশে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা এখন শুধু ঝুঁকিপূর্ণই নয়, তা বৈধভাবে বিদেশে যেতে চাওয়া বাংলাদেশিদের জন্যও বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তথ্যসূত্র:
Canada Border Services Agency
Immigration and Refugee Board of Canada


Back to top button