
বিমানযাত্রা যত আধুনিক ও আরামদায়কই হোক, ইকোনমি ক্লাস হোক কিংবা ফার্স্ট ক্লাস, আকাশে ওঠার পর যাত্রীদের স্বাধীনতার কিছু সীমারেখা টানা থাকে। নিজের আসনে বসা, সিটবেল্ট বাঁধা, ক্রুদের নির্দেশ মানা এবং সহযাত্রীদের স্বস্তির কথা মাথায় রাখা। নিয়মগুলো এতটাই সাধারণ যে আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। অথচ পৃথিবীর নানা প্রান্তে এমন সব ঘটনা ঘটেছে, যেখানে এই সাধারণ নিয়মই কারও কারও কাছে অসাধ্য হয়ে উঠেছে। কখনও কোনো যাত্রীর আচরণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে উড়োজাহাজকে মাঝপথে ফিরে আসতে হয়েছে, বদলাতে হয়েছে গন্তব্য কিংবা বাতিল করতে হয়েছে যাত্রা। শুনতে গল্পের মতো, কিন্তু ঘটনাগুলো সত্যি।
সর্বশেষ ঘটনাটি কানাডার। গত ৬ আগস্ট ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভিক্টোরিয়া থেকে টরন্টোর পিয়ারসন বিমানবন্দরগামী Porter Airlines-এর PD444 ফ্লাইট উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যাত্রীরা আসনে, বিমান গেট ছেড়ে রানওয়ের দিকে এগোচ্ছে। হঠাৎ বাধা। ছোট্ট এক শিশু নিজের আসনে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুতেই বসবে না, সিটবেল্টও বাঁধবে না। সঙ্গে থাকা অভিভাবক চেষ্টা করলেন, কেবিন ক্রুরাও বোঝালেন। লাভ হলো না। নিরাপত্তার নিয়মে আপস করার উপায় নেই বলে বিমান আবার টার্মিনালে ফিরে আসে। যাত্রীদের নামানো, লাগেজ বের করা এবং নতুন ফ্লাইট পরিকল্পনার কাজ শেষ হতে হতে রাত সাড়ে ১২টা পেরিয়ে যায়। ততক্ষণে ভিক্টোরিয়া বিমানবন্দরের রানওয়ে বন্ধ। ফলে একটি শিশুর ‘না’-এর কাছে পুরো ফ্লাইটের সেদিনের যাত্রা শেষ হয়ে যায়। যাত্রীদের পরদিন আরেকটি ফ্লাইটে পাঠানো হয়। ঘটনাটির এই বিবরণ Porter-এর বক্তব্যের সঙ্গে মেলে।
২০১৪ সালে টরন্টো থেকে কিউবাগামী Sunwing-এর একটি ফ্লাইটে দুই নারী এমন কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন যে শেষ পর্যন্ত কানাডার CF-18 যুদ্ধবিমান আকাশে তুলতে হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, তাঁরা উড়োজাহাজের টয়লেটে গিয়ে নিজেদের সঙ্গে আনা অ্যালকোহল পান করেন, সেখানে সিগারেট ধরিয়ে স্মোক ডিটেক্টর বাজিয়ে দেন, এরপর নিজেদের মধ্যেই ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। তাঁদের একজন বোমা বিস্ফোরণের হুমকি দেন, অন্যজনও সেই হুমকিতে সায় দেন। তখন বিমানটি দক্ষিণ ক্যারোলাইনার আকাশে। পাইলট টরন্টোয় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় NORAD দুটি CF-18 পাঠায় বিমানটিকে কানাডার আকাশসীমায় পাহারা দিয়ে আনতে। পিয়ারসনে দুই নারীকে নামিয়ে নেওয়ার সময় বিমানের ভেতর যাত্রীরা হাততালি দিয়ে উল্লাস করেছিলেন। একটি সাধারণ ফ্লাইটের সঙ্গে যুদ্ধবিমান যুক্ত হয়ে যাবে, কে ভেবেছিল!
২০২৪ সালে মেক্সিকো সিটির এক ঘটনা আবার উল্টো ধরনের। Aeromexico-এর গুয়াতেমালাগামী একটি বিমান প্রায় পাঁচ ঘণ্টা দেরি করছিল। যাত্রীদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় বিমানের ভেতর পর্যাপ্ত বাতাস ও পানি ছাড়াই অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। একপর্যায়ে এক যাত্রী জরুরি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে বিমানের ডানায় গিয়ে দাঁড়ান, পরে আবার ভেতরে ফিরে আসেন। এরপর তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু গল্পের আসল চমক অন্য জায়গায়। বিমানের অন্তত ৭৭ জন যাত্রী লিখিত বিবৃতিতে ওই ব্যক্তির পক্ষ নেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছিল এবং লোকটি সবার স্বার্থেই কাজ করেছেন। জরুরি দরজা খোলার মতো আচরণ নিরাপত্তাবিধির মধ্যে পড়ে না, কিন্তু অভিযুক্তের পক্ষে যখন এতজন সহযাত্রী লিখিতভাবে দাঁড়িয়ে যান, ঘটনাটি বিমানযাত্রার বিচিত্র ইতিহাসে জায়গা পাওয়ার মতোই।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে Boston Logan Airport-এ JetBlue-এর San Juanগামী একটি বিমান উড্ডয়নের জন্য চলতে শুরু করেছিল। এমন সময় এক যাত্রী হঠাৎ জরুরি দরজা খুলে দেন। সঙ্গে সঙ্গে emergency slide বেরিয়ে আসে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার আগে ওই ব্যক্তি তাঁর বান্ধবীর সঙ্গে একটি মোবাইল ফোন নিয়ে তর্ক করছিলেন। সেই তর্কের পর আচমকা উঠে গিয়ে বিমানের দরজাই খুলে দিলেন! অন্য যাত্রীরা দ্রুত তাঁকে থামান। পুলিশ আসে, আর JetBlue-কে শেষ পর্যন্ত অন্য বিমান এনে যাত্রীদের গন্তব্যে পাঠাতে হয়। প্রেমের ঝগড়ার পরিণতি যে একটি উড়োজাহাজ বদলে ফেলতে হতে পারে, সেটিও বোধহয় বেশির ভাগ মানুষের কল্পনার বাইরে।
মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা বিমানের দরজা খোলা আর আকাশে ওড়ার সময় দরজা খোলার মধ্যে পার্থক্য বিশাল। ২০২৩ সালের মে মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার Asiana Airlines-এর একটি Airbus A321 Jeju থেকে Daegu যাচ্ছিল। বিমানটিতে মোট ১৯৪ জন ছিলেন। অবতরণের কিছু আগে, প্রায় ৭০০ ফুট উচ্চতায়, এক যাত্রী হঠাৎ জরুরি দরজা খুলে ফেলেন। প্রবল বাতাস কেবিনে ঢুকে পড়ে। বিমানটি শেষ পর্যন্ত নিরাপদে অবতরণ করে এবং ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়। ঘটনার পর ১২ জনকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঘটনাটি এতটাই অস্বাভাবিক ছিল যে এর ভিডিও দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
এর চেয়েও বিব্রতকর ঘটনা ঘটেছিল ২০২২ সালের নভেম্বরে নিউইয়র্ক থেকে নয়াদিল্লিগামী Air India-র একটি ফ্লাইটে। ঘটনাস্থল ছিল বিমানের বিজনেস ক্লাস। অভিযোগ অনুযায়ী, অতিরিক্ত মদ্যপান করা এক যাত্রী একপর্যায়ে এক সহযাত্রীর ওপর মূত্রত্যাগ করেন। এমন ঘটনায় বিমানের ভেতর চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কিন্তু গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। বিষয়টি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে Air India-র ভূমিকা নিয়েও ভারতে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। অভিযুক্ত যাত্রী শঙ্কর মিশ্রকে পরে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ঘটনার যথাযথ ব্যবস্থাপনা না করায় ভারতের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা DGCA Air India-কে ৩০ লাখ রুপি জরিমানা করে।
২০২৪ সালের এপ্রিলে ডাবলিন থেকে লানজারোতেগামী Ryanair-এর একটি ফ্লাইটে এক যাত্রীর আচরণ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বিমানটিকে পর্তুগালের পোর্তোতে ঘুরিয়ে নিতে হয়। Ryanair-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি যাত্রীদের ওপর হামলা চালান। এমনকি ক্রুদের ওপরও চড়াও হন। এর ফলে ১৬০ জনের বেশি যাত্রী ও ছয়জন ক্রুকে পোর্তোতে রাত কাটাতে হয়। পরে Ryanair তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডাবলিনের আদালত তাঁকে ১৫ হাজার ইউরো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন।
এমন ঘটনা যে একেবারে বিরল বিচ্ছিন্ন কাণ্ড, পরিসংখ্যান তা-ও বলছে না। International Air Transport Association বা IATA-এর ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে গড়ে প্রতি ৩৫৫টি ফ্লাইটে একটি করে বিশৃঙ্খল যাত্রী আচরণের ঘটনা (unruly passenger incident) রিপোর্ট হয়েছে। ২০২৪ সালে হারটি ছিল প্রতি ৩০৭ ফ্লাইটে একটি। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ক্রুদের নির্দেশ না মানা নিয়ে। তালিকায় আছে মৌখিক দুর্ব্যবহার, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় অসংযত আচরণ, ধূমপান এবং নিরাপত্তা নির্দেশ উপেক্ষা করার ঘটনাও।
ভিক্টোরিয়ার শিশুটির ‘না’ দিয়ে শুরু হওয়া এই গল্পগুলো পড়ার পর একটি কথাই মনে হয়: আকাশপথে গন্তব্য আগে থেকে জানা থাকে, কিন্তু সহযাত্রীদের সম্পর্কে আগে থেকে জানা যায় না। কেউ গন্তব্যে পৌঁছে শুধু লাগেজ নিয়ে নেমে যান, আবার কেউ রেখে যান এমন এক গল্প, যা বছর পরও সংবাদমাধ্যমে ঘুরে বেড়ায়। তাই জানালার পাশের আসন পাওয়া যতটা ভাগ্যের ব্যাপার, পাশের আসনে কে বসবেন, সেটিও কম রোমাঞ্চের নয়। এসব ঘটনা যেন তারই প্রমাণ।
তথ্যসূত্র:
Global News, August 8, 2026.
Canadian Aviation Regulations









