সম্পাদকের পাতা

কনজারভেটিভদের সামনে আসছে আরও কঠিন সময়

নজরুল মিন্টো

রাজনীতিতে কোনো দলের দুর্বলতার লক্ষণ সাধারণত একদিনে স্পষ্ট হয় না। প্রথমে হয়তো জনমত জরিপে ব্যবধান বাড়ে, তারপর তহবিল সংগ্রহে ভাটা পড়ে, দলের ভেতরে অস্বস্তি দেখা দেয় কিংবা একে একে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সরে যেতে শুরু করেন। প্রতিটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখলে খুব বড় কিছু মনে নাও হতে পারে। কিন্তু কয়েকটি ঘটনা পাশাপাশি ঘটতে থাকলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পিয়েরে পয়লিয়েভের নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভ পার্টির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও বলছে, সামনে তাদের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

অন্টারিওর ব্র্যান্টফোর্ড–ব্র্যান্ট সাউথ–সিক্স নেশনস আসনের কনজারভেটিভ এমপি ল্যারি ব্রক আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ২০২১ সালে প্রথম নির্বাচিত ব্রক দলের বিচারবিষয়ক সমালোচকের দায়িত্বও পালন করেছেন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি প্রায় ১৯ বছর প্রসিকিউটর হিসেবে কাজ করেছেন। এবার রাজনীতি ছেড়ে ব্র্যান্টফোর্ডের ক্রাউন অ্যাটর্নির কার্যালয়ে ফিরে যাচ্ছেন। তবে বিদায়ের সময়ও তিনি পিয়েরে পয়লিয়েভ ও কনজারভেটিভ ককাসের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁর পদত্যাগের ফলে আসনটিতে একটি উপনির্বাচনের প্রয়োজন হবে।

কিন্তু ব্রকের সিদ্ধান্তকে শুধু ব্যক্তিগত পেশা পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো রাজনৈতিক চিত্রটি ধরা পড়ে না। ২০২৫ সালের নির্বাচনের পর তিনি হচ্ছেন পয়লিয়েভের ককাস ছেড়ে যাওয়া সপ্তম এমপি। তাঁদের মধ্যে চারজন সরাসরি লিবারেল দলে যোগ দিয়েছেন। সাসকাচুয়ানের ক্যাথে ওয়াগানটলও ৩১ আগস্ট পদত্যাগ করছেন, আর কুইবেকের রিচার্ড মার্টেল সিনেটে নিয়োগ পাওয়ার পর তাঁর আসন ছেড়েছেন। অবশ্য সবার চলে যাওয়ার কারণ এক নয়। তারপরও অল্প সময়ের মধ্যে সাতজন এমপির ককাস থেকে সরে যাওয়া কনজারভেটিভ নেতৃত্বের জন্য স্বস্তির খবর নয়।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ অবশ্য জনমত জরিপে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি ন্যানোস রিসার্চের ট্র্যাকিংয়ে লিবারেলদের সমর্থন ছিল ৪২.৭ শতাংশ, কনজারভেটিভদের ৩১.৩ শতাংশ। এক সপ্তাহ পর লিবারেলদের সমর্থন বেড়ে ৪৪.৭ শতাংশে পৌঁছায়, আর কনজারভেটিভরা নেমে আসে ২৯.৫ শতাংশে। একই জরিপে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পছন্দের প্রশ্নে মার্ক কার্নিকে বেছে নিয়েছেন ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতা, পিয়েরে পয়লিয়েভকে ১৮.২ শতাংশ।

অন্য জরিপেও কনজারভেটিভদের পিছিয়ে থাকার চিত্র দেখা যাচ্ছে, যদিও ব্যবধান এক নয়। অ্যাবাকাস ডেটার জুনের শেষ থেকে জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত জরিপে লিবারেলদের সমর্থন ছিল ৪৪ শতাংশ, কনজারভেটিভদের ৩৬ শতাংশ। আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে অন্টারিও। সেখানে লিবারেলরা ৪৯ শতাংশ এবং কনজারভেটিভরা ৩৭ শতাংশ সমর্থন পেয়েছে। কানাডার ফেডারেল নির্বাচনে অন্টারিওতে রয়েছে ১২২টি আসন। ফলে দেশের সবচেয়ে বেশি আসনের এই প্রদেশে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা কনজারভেটিভদের জন্য বিশেষভাবে চিন্তার বিষয়।

ল্যারি ব্রকের নিজের আসনের বর্তমান হিসাবও কনজারভেটিভদের জন্য সুখকর নয়। গত নির্বাচনে তিনি ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে সহজেই জয়ী হয়েছিলেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই আসনটি ২০০৮ সাল থেকে কনজারভেটিভদের দখলে রয়েছে। অথচ নির্বাচনী বিশ্লেষণভিত্তিক ওয়েবসাইট ৩৩৮কানাডার ২৬ জুলাইয়ের হিসাবে Brantford–Brant South–Six Nations এখন আর নিরাপদ কনজারভেটিভ আসন নয়; লিবারেল ও কনজারভেটিভদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও কনজারভেটিভদের দীর্ঘদিনের বড় সুবিধা কমে আসছে। রাজনৈতিক দলের জন্য এই অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী বিজ্ঞাপন, প্রচার, কর্মী, সফর এবং ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর নানা কাজে দলীয় অনুদানের অর্থ ব্যয় হয়। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে কনজারভেটিভদের তহবিল সংগ্রহ আগের তুলনায় কমেছে। ফলে দলের সমর্থক ও দাতাদের আগ্রহ আগের মতো আছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।

কনজারভেটিভদের জন্য আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে মার্ক কার্নিকে ঘিরে। ২০২৫ সালের নির্বাচনের আগে পয়লিয়েভের বড় রাজনৈতিক সুবিধা ছিল তৎকালীন লিবারেল সরকারের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ। নেতৃত্ব বদলের পর সেই সমীকরণও বদলে গেছে। কার্নিকে সামনে রেখে লিবারেলরা নতুন করে জনসমর্থন গড়ে তুলতে পেরেছে, আর সাম্প্রতিক জরিপে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পছন্দের প্রশ্নেও তিনি পয়লিয়েভের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

কনজারভেটিভদের অন্টারিও, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, কুইবেক এবং বড় শহরের আশপাশের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে ভালো ফল করাও জরুরি। কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপে বিশেষ করে অন্টারিওতে তাদের পিছিয়ে থাকা উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। আজ যে আসনকে নিরাপদ মনে হচ্ছে, ভোটের ব্যবধান আরও বাড়লে আগামী নির্বাচনে সেটিও কঠিন লড়াইয়ের আসনে পরিণত হতে পারে। ব্র্যান্টফোর্ডের বর্তমান চিত্র সেই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ।

কানাডার রাজনীতিতে কয়েক মাসেই জনমত বদলে যেতে পারে। অর্থনীতি খারাপ হলে, বেকারত্ব বাড়লে, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ তীব্র হলে কিংবা কার্নি সরকারের বড় কোনো ভুল হলে কনজারভেটিভরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু উল্টোভাবে বর্তমান ধারা যদি চলতেই থাকে, আরও এমপি সরে যান, তহবিল সংগ্রহের ব্যবধান কমতে থাকে এবং বিশেষ করে অন্টারিওতে লিবারেলদের বড় ব্যবধান বজায় থাকে, তাহলে কনজারভেটিভদের শুধু জনপ্রিয়তাই আরও কমবে না, পরবর্তী নির্বাচনে তাদের বর্তমান অনেক আসনও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

ল্যারি ব্রকের পদত্যাগ তাই একটি আসন শূন্য হওয়ার সাধারণ খবর নয়। ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটছে, যখন দলটি জনমত জরিপে পিছিয়ে, তহবিল সংগ্রহে আগের সুবিধা হারাচ্ছে এবং ২০২৫ সালের নির্বাচনের পর সাতজন এমপি ককাস ছেড়েছেন। এখন পিয়েরে পয়লিয়েভের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই ধারাটি থামানো। তা না হলে আজ যে দুর্বলতা জরিপের সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে, আগামী দিনে তার প্রভাব আসনসংখ্যাতেও দেখা যেতে পারে।

তথ্যসূত্র:
The Globe and Mail (August 6, 2026)
Global News (August 7, 2026)


Back to top button