
কানাডার কুইবেক প্রদেশের নতুন ধর্মনিরপেক্ষতা আইন Bill 94 কার্যকর হওয়ার পর মন্ট্রিয়লে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫০ জন বিভিন্ন পর্যায়ের হিজাব পরা মুসলিম স্কুলকর্মী চাকরি হারিয়েছেন। এই সংখ্যা শুধু একটি প্রশাসনিক পরিসংখ্যান নয়; এটি কুইবেকে শিক্ষা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতার সীমা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
মন্ট্রিয়লের বৃহত্তম ফরাসি ভাষার স্কুল সার্ভিস সেন্টার-এর তথ্য অনুযায়ী, এই ১৫০ জনের সবাই শিক্ষক নন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষাসহায়ক, বিশেষ শিক্ষা প্রযুক্তিবিদ, ডে-কেয়ার শিক্ষাকর্মী, লাঞ্চরুম মনিটর এবং শিক্ষার্থীদের সহায়তায় নিয়োজিত বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মী। অর্থাৎ, নতুন বিধিনিষেধের প্রভাব পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জনবলকেই স্পর্শ করেছে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে Bill 94। কুইবেক সরকার ২০২৫ সালে আইনটি পাস করে এবং ২০২৬ সালে এর বিভিন্ন ধারা কার্যকর করতে শুরু করে। আইনটির মূল লক্ষ্য, সরকারি বিদ্যালয়ে ধর্মীয় নিরপেক্ষতা আরও কঠোরভাবে নিশ্চিত করা। এর ফলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন এমন কর্মীরা দায়িত্ব পালনের সময় কোনো দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীক পরতে পারবেন না।
কুইবেক সরকারের যুক্তি, সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা অবশ্যই ধর্মীয়ভাবে নিরপেক্ষ হতে হবে। শিক্ষকের ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয় যেন শ্রেণিকক্ষের পরিবেশে কোনো প্রভাব না ফেলে, সেটিই এই নীতির ভিত্তি। সরকারের মতে, স্কুলে কর্মরত ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনের সময় একই নিয়ম অনুসরণ করা হলে শিক্ষার্থীরা একটি ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে।
তবে সমালোচকদের মতে, আইনের ভাষা সব ধর্মের জন্য সমান হলেও এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে হিজাব পরা মুসলিম নারীদের ওপর। দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারকারী স্কুলকর্মীদের মধ্যে তাঁদের উপস্থিতি বেশি হওয়ায় অনেককে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁদের সামনে ছিল দায়িত্ব পালনের সময় হিজাব খুলে রাখা অথবা ধর্মীয় বিশ্বাস অক্ষুণ্ন রেখে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পথ। আবার নতুন বিধান মানতে অস্বীকৃতি জানানোয় কেউ কেউ চাকরিও হারিয়েছেন।
মন্ট্রিয়লের স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৫০ জন কর্মী হারানো তাদের জন্যও সহজ বিষয় নয়। উত্তর আমেরিকার অন্যান্য অঞ্চলের মতো কুইবেকেও দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক ও শিক্ষাসহায়ক কর্মীর সংকট রয়েছে। বিশেষ শিক্ষা, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং ডে-কেয়ার কার্যক্রমে দক্ষ কর্মী পাওয়া আগেই কঠিন ছিল। নতুন আইনের ফলে সেই সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিতর্কটি শুধু ধর্মীয় স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে কর্মসংস্থানের অধিকারও জড়িয়ে আছে। একজন কর্মী দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার পরও তাঁর ধর্মীয় পরিচয় বা পোশাক চাকরিতে বাধা হওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তাঁদের মতে, এই আইন হিজাব পরা মুসলিম নারীদের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় চাকরি পাওয়া এবং সেখানে টিকে থাকার সুযোগ সীমিত করছে।
অন্যদিকে কুইবেক সরকার এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের ভাষ্য, আইনটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে লক্ষ্য করে করা হয়নি; এটি সব ধর্মের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। মুসলিম নারীর হিজাবের পাশাপাশি শিখদের পাগড়ি, ইহুদিদের কিপ্পা এবং দৃশ্যমান ক্রসও একই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে।
কুইবেকের ধর্মনিরপেক্ষতা নীতির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আদালতে লড়াই চলছে।বিরোধীদের অভিযোগ, ধর্মীয় প্রতীক নিষিদ্ধ করার নীতি কানাডার অধিকার ও স্বাধীনতার সনদে স্বীকৃত ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমতার অধিকারের পরিপন্থী।
এ পর্যন্ত প্রায় ১৫০ জন বিভিন্ন পর্যায়ের স্কুলকর্মীর চাকরি হারানোর ঘটনা সংখ্যার বিচারে খুব বড় না-ও মনে হতে পারে। কিন্তু এটি এমন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে, যার উত্তর শুধু আদালত বা রাজনীতিবিদদের কাছে নেই। প্রশ্নটি হলো: একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রের ধর্মীয় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে গিয়ে ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশের স্বাধীনতা কত দূর পর্যন্ত সীমিত করা যেতে পারে?
তথ্যসূত্র:
Canadian HR Reporter
Government of Quebec, Ministry of Education
Supreme Court of Canada









