অক্সফোর্ডের ভুয়া ডিগ্রি দেখিয়ে প্রতারণা মামলায় ব্রিটিশ বাংলাদেশি আমরান হুসেইনের চার বছরের কারাদণ্ড
নজরুল মিন্টো

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডনের বার্কবেক থেকে উচ্চতর ডিগ্রি, এনএইচএসের জ্যেষ্ঠ পদে কাজের অভিজ্ঞতা এবং যোগ্যতার পক্ষে শক্ত রেফারেন্স। জীবনবৃত্তান্ত দেখে তাঁকে আদর্শ প্রার্থী বলেই মনে হওয়ার কথা। বাস্তবে এসব দাবির অধিকাংশই ছিল মিথ্যা। তাঁর অক্সফোর্ডের ডিগ্রি ছিল না, বার্কবেকের কোর্সও তিনি শেষ করেননি। যে জ্যেষ্ঠ পদে কাজ করার কথা বলেছিলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে তাঁর কোনো কর্মরেকর্ড পাওয়া যায়নি। এমনকি রেফারেন্সদাতাদের একজনের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
এই মিথ্যা জীবনবৃত্তান্ত ব্যবহার করেই বছরের পর বছর যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বা এনএইচএসের একের পর এক চাকরি পেয়েছিলেন ব্রিটিশ বাংলাদেশি আমরান হুসেইন। শেষ পর্যন্ত একটি নিয়োগপূর্ব যাচাইয়ে তাঁর প্রতারণা ধরা পড়ে। তদন্তে বেরিয়ে আসে ২ হাজার ৭১টি চাকরির আবেদন, মিথ্যা তথ্য দিয়ে পাওয়া ১৩টি পদ এবং এনএইচএসের ১ লাখ ৬৮ হাজার পাউন্ডের বেশি আর্থিক ক্ষতির হিসাব।
মেইডস্টোন ক্রাউন কোর্ট ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই ৪০ বছর বয়সী আমরান হুসেইনকে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। কেন্টের ওয়েস্টারহামের ফ্রেঞ্চ স্ট্রিটের এই বাসিন্দা মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রতারণার তিনটি অভিযোগ স্বীকার করেন।
প্রতারণা ধরা পড়ে ২০২১ সালে। আমরান ডেভন পার্টনারশিপ এনএইচএস ট্রাস্টে জরুরি সেবা ও পরিচালনাবিষয়ক একটি উচ্চপদে আবেদন করেন। প্রাথমিকভাবে তাঁকে চাকরির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিয়োগ চূড়ান্ত করার আগে তাঁর দেওয়া তথ্য যাচাই করতে গিয়ে কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়।
আবেদনপত্রে আমরান দাবি করেছিলেন, তিনি কভেন্ট্রি অ্যান্ড ওয়ারউইকশায়ার পার্টনারশিপ এনএইচএস ট্রাস্টের একটি জ্যেষ্ঠ পরিচালনা পদে কর্মরত। কিন্তু এনএইচএসের কর্মী তালিকায় তাঁর নাম পাওয়া যায়নি। ডেভন ট্রাস্ট বিষয়টি সরাসরি যাচাই করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, আমরান হুসেইন কখনোই তাদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করেননি। এই একটি অসংগতি ধরা পড়ার পর তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্ম-অভিজ্ঞতা ও রেফারেন্সগুলোও যাচাই করা হয়।
তদন্তে দেখা যায়, আমরানের দেওয়া একজন রেফারেন্সদাতা ছিলেন কাল্পনিক। নিজের যোগ্যতার পক্ষে অন্য কয়েকটি রেফারেন্স পাঠানো হয়েছিল তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন এনএইচএস ই-মেইল ঠিকানা থেকে।
আমরান আরও দাবি করেছিলেন, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডনের বার্কবেক থেকে তাঁর এমএসসি ডিগ্রি রয়েছে। বার্কবেকের কথিত ডিগ্রির পক্ষে একটি সনদও জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ই জানায়, তিনি সংশ্লিষ্ট কোর্স শেষ করেননি। কয়েকটি পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য হওয়ার দাবিরও কোনো প্রমাণ মেলেনি।
এনএইচএস কাউন্টার ফ্রড অথরিটির তদন্তে দেখা যায়, আমরান মোট ২ হাজার ৭১টি এনএইচএস পদে আবেদন করেছিলেন। বিপুলসংখ্যক আবেদনের মধ্য থেকে মিথ্যা যোগ্যতা, বানানো কর্ম-অভিজ্ঞতা ও ভুয়া রেফারেন্স ব্যবহার করে তিনি ১৩টি প্রশাসনিক চাকরি পান। সব আবেদন সফল হওয়ার প্রয়োজন ছিল না; অল্প কয়েকটি নিয়োগই তাঁকে বেতন ও পরবর্তী চাকরির জন্য নতুন অভিজ্ঞতার দাবি করার সুযোগ করে দিয়েছিল।
চাকরি পাওয়ার পরও তাঁর আচরণে একটি নির্দিষ্ট ছক ছিল। কাজে যোগ দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি অসুস্থতার ছুটি নিতেন এবং চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া বা চাকরিচ্যুত হওয়া পর্যন্ত অনুপস্থিত থাকতেন। কোনো পদে সামান্য কাজ করেছেন, কোনো পদে কার্যত কাজই করেননি। তারপরও প্রতিটি চাকরির নাম পরবর্তী আবেদনে অভিজ্ঞতা হিসেবে ব্যবহার করতেন। তদন্তকারীদের হিসাবে, এসব নিয়োগে এনএইচএসের ক্ষতি হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭২ পাউন্ড ৪১ পেন্স।
তাঁর প্রতারণা শুধু এনএইচএসের চাকরিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি নটিংহামের একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ, কেন্ট কাউন্টি কাউন্সিলের জনস্বাস্থ্য বিভাগ এবং ইউকে হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সির একটি প্রযুক্তি কর্মসূচিতেও মিথ্যা তথ্য দিয়ে পদ লাভ করেছিলেন।
আমরানের প্রতারণা ধরা পড়েছিল কোনো জটিল প্রযুক্তি বা দীর্ঘ গোপন অভিযানে নয়। একটি প্রতিষ্ঠান শুধু তাঁর দেওয়া চাকরির তথ্য যাচাই করেছিল। সেখানেই প্রশ্নটি থেকে যায়: একটি ফোনকল ও কয়েকটি নথি যাচাইয়ে যে মিথ্যা ধরা পড়ল, তা ১৩টি চাকরির দরজা পেরিয়ে এত দূর এল কীভাবে?
তথ্যসূত্র: NHS Counter Fraud Authority









