
ঘটনাস্থল কুইন্স। নিউইয়র্ক শহরের এই এলাকায় বহু দেশের অভিবাসী মানুষের বসবাস। বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচিত বসতিগুলোও এখানেই। সেই কুইন্সে ছয় সপ্তাহের মধ্যে একে একে তিন ব্যক্তিকে অপহরণ করার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। পরিচিত মানুষ, পরিচিত এলাকা। সেখানেই একের পর এক এমন ঘটনা ঘটতে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা আজ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আরও উদ্বেগের বিষয়, অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগীরা সকলেই বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্য।
তিনটি ঘটনার কেন্দ্রে একই নাম, আবু চৌধুরী। জ্যামাইকার ‘বিডি ফ্রেশ সুপারমার্কেট’-এর অন্যতম মালিক এই বাংলাদেশি ব্যবসায়ী। তাঁর সঙ্গে জড়িয়েছেন কয়েকজন সহযোগী এবং তখনকার প্রেমিকা, পরবর্তী সময়ে স্ত্রী ইফফাত লুবনা। গাড়িতে তুলে নেওয়া, বিভিন্ন জায়গায় আটকে রাখা, মারধর, ভিডিও করা, অচেতন করে দেওয়া। অপহরণের ঘটনাগুলোতে চলে একই ধরনের নির্যাতন। একটি ঘটনায় ব্যক্তিগত প্রতিশোধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুক্তিপণের দাবিও।
ঘটনার শুরু ২০২৩ সালের ২৭ মার্চ। কুইন্সের জ্যামাইকা এলাকায় খাবার কিনে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন বাংলাদেশি অভিবাসী মোবারক দেওয়ান। ১৮১তম স্ট্রিট ও হিলসাইড অ্যাভিনিউয়ের কাছে তাঁর পথ আটকে তাঁকে জোর করে গাড়িতে তুলে নেন আবু চৌধুরী। মোবারকের সঙ্গে তাঁর আগেই বিরোধ তৈরি হয়েছিল। টিকটকে চৌধুরীকে নিয়ে ভিডিও দিয়েছিলেন মোবারক, এমনকি তাঁকে লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জও জানিয়েছিলেন। এবার মোবারক সেই চৌধুরীর হাতেই বন্দি।
মোবারকের বিরোধ ছিল সুলতানা রাজিয়া নামে এক নারীর সঙ্গেও। প্রসিকিউটরদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজিয়া ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ৩০ হাজার ডলারের বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। রাজিয়া পাল্টা তাঁকে মিথ্যাবাদী ও প্রতারক বলেন। টিকটকের লাইভে চলতে থাকে তর্ক, গালাগাল আর ব্যক্তিগত আক্রমণ। সেই ঝগড়ার দর্শকও ছিলেন। পরে ‘বাবা কিং’ নামে পরিচিত এক টিকটক ব্যক্তিত্ব আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে জানান, তাঁদের লাইভে নিয়মিত এমন বাদানুবাদ হতো।
গাড়ির ভেতরেই মোবারককে মারধর শুরু করেন আবু চৌধুরী। চালকের আসনে তাঁর সহযোগী ছিলেন আরেক বাংলাদেশি-আমেরিকান রুহেল চৌধুরী। অপহরণে ব্যবহৃত গাড়ি সরবরাহ ও চালানোর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। মোবারককে নিয়ে গাড়িটি কুইন্সের এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ঘুরতে থাকে। ফোনে যোগাযোগ চলতে থাকে অন্য সহযোগীদের সঙ্গে। রাতের বিভিন্ন সময়ে তাঁরাও এসে যোগ দেন। কেউ মারধর করেন, কেউ দেন মেরে ফেলার হুমকি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়। গাড়ির গন্তব্য বদলায়, মোবারকের মুক্তি মেলে না।
একপর্যায়ে আবু চৌধুরী তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আবাসিক এলাকার রাস্তায় নগ্ন অবস্থায় দাঁড় করান। মোবাইল ফোনে সেই দৃশ্য ধারণ করেন। অপহরণের বিভিন্ন মুহূর্তেও তিনি ভিডিও করছিলেন। প্রসিকিউটরদের বিবরণ অনুযায়ী, রাত ৯টা ১২ মিনিটে একটি গ্যারেজের সামনের জায়গায় মোবারককে নিয়ে এসে রাজিয়াকে ভিডিও কল করেন চৌধুরী। এরপর স্বামী ও চাচাকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে পৌঁছান রাজিয়া। সঙ্গে আনেন একটি ঝাড়ু। মোবারককে ঘুষি মারেন, ঝাড়ু দিয়েও আঘাত করেন।
পরে মোবারকের বিবস্ত্র ভিডিওটি টিকটকে প্রকাশ করেন রাজিয়া। ক্যাপশনে লেখেন ‘Mental Health Awareness Month’, সঙ্গে বিদ্রূপের ইমোজি। অপহরণের তিন দিন পর এক ফোনালাপে তিনি বলেন, তাঁরা মোবারককে পিটিয়েছেন এবং প্রতিশোধ নিয়েছেন। সেই ফোনালাপের কথাও আদালতে উঠে আসে। টিকটকে কথার লড়াই দিয়ে যে বিরোধের শুরু হয়েছিল, তার জেরে মোবারককে নির্যাতন ও বিবস্ত্র করা হয় এবং সেই অপমানের দৃশ্যটি পরে টিকটকে ছড়িয়ে দেন রাজিয়া।
দীর্ঘ নির্যাতনের মধ্যে তৃষ্ণায় পানি চান মোবারক। তাঁকে পানি দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে মেশানো ছিল ঘুমের ওষুধ। পানি পান করার পর তিনি জ্ঞান হারান। পরদিন যখন জ্ঞান ফেরে, তখন তিনি স্থানীয় একটি হাসপাতালে। শরীরে একাধিক আঘাত। খাবার কিনে বাড়ি ফেরার পথে শুরু হওয়া অপহরণে প্রায় ১৩ ঘণ্টা কাটিয়েছেন তিনি।
এর প্রায় ছয় সপ্তাহ পর আরেকটি অপহরণ। ইফফাত লুবনা ও এক ব্যক্তি বাংলাদেশে একই কলেজে পড়তেন। দুজন যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর ২০২৩ সালে তাঁদের আবার যোগাযোগ হয়। আবু চৌধুরী ওই ব্যক্তির কাছে কলেজজীবনে লুবনার পরিচিতি সম্পর্কে জানতে চান। সহপাঠী যা বলেছিলেন, তা লুবনাকে জানান চৌধুরী। উত্তর শুনে দুজনই ক্ষুব্ধ হন। বিচারে প্রমাণিত তথ্য অনুযায়ী, লুবনা সম্পর্কে ওই মন্তব্যের শাস্তি দিতেই তাঁকে অপহরণ করা হয়।
১০ মে লং আইল্যান্ড সিটিতে তাঁকে ফাঁদে ফেলে আবু চৌধুরীর গাড়িতে আটকে রাখা হয়। গাড়ির ভেতরে চৌধুরী ও লুবনা তাঁকে লাথি ও ঘুষি মারেন। এরপর অন্য সহযোগীদের ডেকে আনা হয়। একটি স্কুলের পেছনে রড ও ছুরি দিয়ে নির্যাতন করা হয় তাঁকে। হাত-পা বেঁধে মুখও বন্ধ করে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে চৌধুরী তাঁকে একটি বড়ি খেতে বাধ্য করেন। সেটি খাওয়ার পর তিনি জ্ঞান হারান। প্রায় তিন দিন ধরে কুইন্সের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। তিনি বন্দি থাকা অবস্থাতেই চৌধুরী ও লুবনা আরেক ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে অপহরণের পরিকল্পনা করেন।
১১ মে জ্যাকসন হাইটসে ৭২তম স্ট্রিট ও ব্রডওয়ের কাছের একটি রেস্তোরাঁর বাইরে লুবনার সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় ছিলেন আরেক ব্যক্তি। তিনি ভেবেছিলেন, এটি একটি ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ। সেখানে আবু চৌধুরী তাঁকে জোর করে একটি মিনিভ্যানে তুলে নেন এবং গাড়ির ভেতরেই মারধর শুরু করেন। এরপর চৌধুরী, লুবনা ও রুহেল তাঁকে একটি হোটেলে নিয়ে যান। সেখানে রড দিয়ে তাঁকে নির্যাতন করেন আবু চৌধুরী।
এরপর ফোন যায় ভুক্তভোগীর বাবার কাছে। ছেলের নিরাপত্তার বিনিময়ে আবু চৌধুরী দাবি করেন ২০ হাজার ডলার। একপর্যায়ে দুই অপহৃত ব্যক্তিকে আনা হয় একই হোটেলকক্ষে। আগে অপহৃত লুবনার সহপাঠীকে বলা হয়, অন্য বন্দিকে মারতে হবে। তিনি তা না করলে চৌধুরী তাঁকেই আবার মারবেন। নিজের ওপর নির্যাতন ঠেকাতে আরেক বন্দিকে আঘাত করার চাপ দেওয়া হয় তাঁকে।
অপহরণের তৃতীয় দিনে মুক্তিপণ চাওয়া ব্যক্তির হাত বেঁধে, চোখ ঢেকে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে ফেলে রাখা হয়। সেখানেই তিনি দাঁত দিয়ে বাঁধন কাটতে থাকেন। একসময় নিজেকে মুক্ত করতে সক্ষম হন। জানালা ভেঙে আশপাশের বাসিন্দাদের সাহায্য চান। তাঁদের বলেন, ৯১১-এ ফোন করতে। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে পৌঁছান তিনি। নির্যাতনের আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে তাঁকে এক সপ্তাহ ভর্তি থাকতে হয়।
এই তিন অপহরণের তদন্তে কাজ করে এফবিআই ও নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের যৌথ দল। বিচার এগিয়েছে কয়েক ধাপে। ২০২৩ সালের মে মাসের দুই অপহরণ ও সেগুলোর ষড়যন্ত্রের ঘটনায় ইফফাত লুবনাকে ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল দোষী সাব্যস্ত করেন জুরি। ২৬ জুন মোবারক দেওয়ানকে অপহরণের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হন সুলতানা রাজিয়া ও সৈয়দ রুবেল আহমেদ। শাহেদ আলম ও রুহেল চৌধুরী মার্চের অপহরণে নিজেদের ভূমিকার জন্য দোষ স্বীকার করেছেন।
সবশেষে বিচার হয় আবু চৌধুরীর। ব্রুকলিনের ফেডারেল আদালতে বিচারক নিনা আর মরিসনের সামনে দুই সপ্তাহ ধরে চলে বিচার। ২৪ সেপ্টেম্বর জুরি তাঁকে তিনটি অপহরণ ও তিনটি অপহরণের ষড়যন্ত্র, মোট ছয়টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। তাঁর বয়স বর্তমানে ৩৬ বছর। সাজা এখনো ঘোষণা হয়নি। মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
টিকটকে বিরোধ। ব্যক্তিগত আক্রোশে একে একে তিনজনকে বন্দি করা হয় গাড়িতে, হোটেলকক্ষে ও পরিত্যক্ত বাড়িতে। তিন বছরের বেশি সময় পর সেই অপরাধের দায় প্রমাণিত হয়েছে আদালতে। এখন অপেক্ষা সাজা ঘোষণার। আবু চৌধুরীকে হয়তো বাকি জীবন কারাগারেই কাটাতে হবে।
তথ্যসূত্র:
U.S. Attorney’s Office, Eastern District of New York, 24 September 2026
Deshe Bideshe, 6 July 2026







