
টরন্টো ডাউনটাউনের ইউনিভার্সিটি অ্যাভিনিউ দিয়ে হাঁটলে কাচে মোড়া একটি বিশাল ভবনের সামনে চোখ আটকে যায়। প্রবেশপথে কখনো উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে থাকেন বাবা-মা, কখনো হুইলচেয়ারে বসা শিশুর মুখে ফুটে ওঠে হাসি। কারও হাতে খেলনা, কারও মাথায় রঙিন টুপি, কেউ আবার জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াইটি লড়ছে ছোট্ট একটি শরীর নিয়ে। ভবনটির নাম The Hospital for Sick Children। তবে কানাডাসহ বিশ্বজুড়ে এটি পরিচিত এক আদুরে নামে, SickKids।
এই হাসপাতালের দরজা দিয়ে প্রতিদিন অসুস্থ শিশুরা প্রবেশ করে। তাদের কেউ কয়েক ঘণ্টা পর বাড়ি ফিরে যায়, কারও চিকিৎসা চলে মাসের পর মাস। একই ভবনের গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা খুঁজে চলেন এমন সব রোগের উত্তর, যেসব রোগের নাম শুনলেই একসময় পরিবারে নেমে আসত হতাশা। সেই হাসপাতালই টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বের সেরা শিশু হাসপাতালের স্বীকৃতি পেয়েছে।
মার্কিন সাময়িকী Newsweek ও আন্তর্জাতিক তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান Statista প্রকাশিত World’s Best Specialized Hospitals 2027 তালিকায় বিশ্বের ২৫০টি শিশু হাসপাতালের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছে টরন্টোর সিককিডস। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে Boston Children’s Hospital এবং তৃতীয় স্থানে Children’s Hospital of Philadelphia। বহু দশক ধরে শিশু চিকিৎসায় বিশ্বনেতৃত্ব দেওয়া এই দুই মার্কিন প্রতিষ্ঠানকে পেছনে রেখে কানাডার একটি হাসপাতালের পরপর দুই বছর শীর্ষস্থান ধরে রাখা নিঃসন্দেহে বিরাট অর্জন।
হাসপাতালের সুনাম, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সনদ এবং রোগী ও পরিবারের দেওয়া চিকিৎসার ফলাফলসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে এ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। মূল্যায়নের সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে বিশ্বের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকে। অর্থাৎ এ স্বীকৃতি শুধু একটি আধুনিক ভবন কিংবা ব্যয়বহুল চিকিৎসা সরঞ্জামের পুরস্কার নয়। এটি চিকিৎসক, নার্স, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, সমাজকর্মী এবং শিশুদের পাশে থাকা অসংখ্য মানুষের দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি।
তালিকায় কানাডার আরও দুটি হাসপাতাল প্রথম ১৫টির মধ্যে স্থান পেয়েছে। ভ্যাঙ্কুভারের BC Children’s Hospital রয়েছে নবম স্থানে এবং ক্যালগেরির Alberta Children’s Hospital পঞ্চদশ স্থানে। শিশু চিকিৎসার বৈশ্বিক মানচিত্রে কানাডার অবস্থান কতটা শক্তিশালী, এই তিনটি হাসপাতালের অবস্থান তারই প্রমাণ।
সিককিডসের গল্পটি অবশ্য শুরু হয়েছিল কোনো বিশাল ভবন দিয়ে নয়। শুরু হয়েছিল ছয়টি শয্যা, একটি ভাড়া করা বাড়ি এবং কয়েকজন সাহসী নারীর উদ্যোগে।
১৮৭৫ সালে টরন্টোতে শিশুদের জন্য আলাদা চিকিৎসাব্যবস্থা প্রায় ছিল না। অসুস্থ দরিদ্র শিশুদের দুর্দশা দেখে কানাডীয় সমাজসেবী এলিজাবেথ ম্যাকমাস্টার কয়েকজন নারীকে সঙ্গে নিয়ে একটি ছোট বাড়ি ভাড়া করেন। সেখানে স্থাপন করা হয় ছয়টি লোহার খাট। সেই ছয় শয্যার হাসপাতালই আজকের সিককিডস। একজন নারীর সহমর্মিতা থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিষ্ঠানটি দেড় শতাব্দী পেরিয়ে এখন বিশ্বের শিশু চিকিৎসার দিকনির্দেশক।
প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই সিককিডস শুধু অসুস্থ শিশুকে চিকিৎসা দেয়নি, শিশু চিকিৎসার ধারণাটিকেই বদলে দিয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীর ও শিশুর শরীর এক নয়, তাদের রোগের ধরন, ওষুধের মাত্রা, মানসিক প্রয়োজন এবং সুস্থ হয়ে ওঠার পথও আলাদা। আজ কথাটি স্বাভাবিক মনে হলেও উনিশ শতকে শিশুদের জন্য আলাদা হাসপাতাল গড়ে তোলা ছিল যুগান্তকারী চিন্তা।
শিশুদের পুষ্টির ইতিহাসেও সিককিডসের নাম জড়িয়ে আছে। বিশ শতকের শুরুতে অপুষ্টি ও শিশুমৃত্যু ছিল ভয়াবহ সমস্যা। হাসপাতালের চিকিৎসক ফ্রেডেরিক টিসডল, থিওডোর ড্রেক ও অ্যালান ব্রাউন সহজে হজমযোগ্য এবং ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ একটি শিশুখাদ্য তৈরি করেন। ১৯৩০-এর দশকে ‘Pablum’ নামে পরিচিত সেই খাদ্য উত্তর আমেরিকার অসংখ্য শিশুর পুষ্টি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের বড় অংশ আবার শিশু চিকিৎসা ও গবেষণায় ব্যয় করা হয়েছিল।
সিককিডসের সবচেয়ে আলোচিত বৈজ্ঞানিক সাফল্যগুলোর একটি আসে ১৯৮৯ সালে। হাসপাতালের বিজ্ঞানী ড. ল্যাপ-চি সুইয়ের নেতৃত্বাধীন গবেষকেরা আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে মিলে সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগের জন্য দায়ী জিন শনাক্ত করেন। এই বংশগত রোগটি প্রধানত ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দায়ী জিনের সন্ধান পাওয়ার পর রোগ নির্ণয়, ওষুধ তৈরি এবং ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসার নতুন পথ খুলে যায়। একটি টরন্টো হাসপাতালের গবেষণাগারে করা সেই আবিষ্কার বিশ্বের লাখো রোগীর জীবনে আশার আলো জ্বালিয়েছে।
সিককিডসের আরেকটি বড় শক্তি তার গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এটি কানাডার সবচেয়ে বড় হাসপাতালভিত্তিক শিশু স্বাস্থ্য গবেষণাকেন্দ্র। চিকিৎসা ও গবেষণা এখানে দুটি আলাদা জগৎ নয়। হাসপাতালের শয্যায় কোনো চিকিৎসক যে প্রশ্নের মুখোমুখি হন, গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা তার উত্তর খোঁজেন। আবার গবেষণাগারের নতুন আবিষ্কার যত দ্রুত সম্ভব পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলে রোগীর কাছে। ফলে একটি শিশুর চিকিৎসা থেকে পাওয়া জ্ঞান ভবিষ্যতে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের আরেকটি শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে।
সিককিডসের গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালি বিজ্ঞানীদের নামও। বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় জন্ম নেওয়া ড. বিবুধেন্দ্র ‘অমু’ সরকার ১৯৬৪ সালে সিককিডসে যোগ দেন প্রতিষ্ঠানটির প্রথম মৌলিক বিজ্ঞানী হিসেবে। মেনকেস রোগের চিকিৎসায় তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা বিশ্বজুড়ে অসংখ্য শিশুর জীবনে আশার আলো জ্বালিয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৪ সালে তাঁকে অর্ডার অব কানাডার সদস্য হিসেবে সম্মানিত করা হয়। বাংলাদেশি অণুজীববিজ্ঞানী ড. সেঁজুতি সাহাও সিককিডসে পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। পরে দেশে ফিরে শিশুস্বাস্থ্য ও সংক্রামক রোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় যুক্ত হন।
তবে সিককিডসের শ্রেষ্ঠত্ব কেবল বড় বড় আবিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি শিশু হাসপাতালে ঢুকলে ভয় পেতে পারে, সূচ দেখলে কাঁদতে পারে, দীর্ঘ চিকিৎসায় স্কুল ও বন্ধুদের হারিয়ে একা হয়ে যেতে পারে। তাই এখানে চিকিৎসার পাশাপাশি আছে খেলা, পড়াশোনা, সংগীত, শিল্পচর্চা এবং মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা। চিকিৎসক রোগ সারান, নার্স সাহস দেন, শিক্ষক পড়াশোনার সঙ্গে সংযোগ রাখেন, আর Child Life Specialist খেলনা ও গল্পের মাধ্যমে শিশুকে চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করেন। পরিবারকে চিকিৎসার অংশীদার হিসেবে গণ্য করার সংস্কৃতিও সিককিডসকে আলাদা করেছে।
কানাডার সার্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থার শক্তিও এই অর্জনের সঙ্গে যুক্ত। একটি শিশুর চিকিৎসার প্রয়োজন তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য দিয়ে নির্ধারিত হয় না। জনসাধারণের করের অর্থ, সরকারি সহায়তা, গবেষণা অনুদান এবং মানুষের দানের ওপর দাঁড়িয়ে সিককিডস সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা দিয়ে চলেছে। ধনী-দরিদ্র, অভিবাসী কিংবা বহু প্রজন্ম ধরে কানাডায় বসবাসকারী, শিশুর পরিচয়ের আগে এখানে গুরুত্ব পায় তার জীবন।
তথ্যসূত্র:
Newsweek
SickKids, History and Research Archives
SickKids Foundation







