সম্পাদকের পাতা

ইউরোপের সঙ্গে নতুন অংশীদারিত্বে এগোচ্ছে কানাডা

নজরুল মিন্টো

স্ট্রাসবুর্গের ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বৃহস্পতিবার সকালটি শুরু হয়েছিল ইতিহাসের গল্প দিয়ে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ফিরে গেলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রক্তাক্ত ভিমি রিজে। যুদ্ধ শেষে দেশে ফেরার আগে এক কানাডীয় সৈনিক সেখান থেকে কয়েকটি ওকগাছের ফল সঙ্গে নিয়েছিলেন। কানাডার মাটিতে সেগুলো থেকে জন্ম নেয় গাছ। প্রায় এক শতাব্দী পর সেই গাছের উত্তরসূরি আবার ফিরে গেছে ফ্রান্সের ভিমিতে।

কার্নির কাছে এই যাওয়া-আসার গল্পটিই যেন কানাডা ও ইউরোপের সম্পর্কের প্রতীক। মানুষ, মূল্যবোধ, জ্ঞান, বাণিজ্য ও সংস্কৃতি শত বছর ধরে আটলান্টিকের দুই তীরের মধ্যে যাতায়াত করেছে। এবার সেই সম্পর্ককে আরও গভীরে নেওয়ার কথা বলছে দুই পক্ষ।

একদিন আগে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম ‘associate member’ বা সহযোগী সদস্য করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কার্নি জানালেন, কানাডা সেই উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। তাঁর ভাষায়, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু বর্তমান মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির মধ্যে আটকে না রেখে আরও বিস্তৃত ও গভীর অংশীদারত্বে নিয়ে যেতে চায় কানাডা।

তবে ‘সহযোগী সদস্য’ কথাটি শুনে কানাডা EU-এর ২৮তম সদস্য হতে যাচ্ছে এমন ভাবার কারণ নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান কাঠামোয় এই নামে কোনো নির্ধারিত সদস্যপদ নেই। কানাডাও পূর্ণ সদস্য হতে চাইছে না। কার্নি বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেছেন, সম্পর্কটির নাম কী হবে তার চেয়ে এর ভেতরে কী থাকবে সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চূড়ান্ত যে কাঠামো তৈরি হবে, সেটি কানাডার পার্লামেন্টে আলোচনা ও ভোটের জন্য তোলা হবে।

কার্নি তাঁর ভাষণে এই ভবিষ্যৎ সম্পর্কের একটি মোটামুটি নকশাও তুলে ধরেছেন। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, প্রতিরক্ষা শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটিং সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, মহাকাশ ও অর্থপ্রদান ব্যবস্থায় দুই পক্ষকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। কৃষিপণ্য ছাড়া অন্য পণ্য ও বিভিন্ন সেবার ডিজিটাল বাণিজ্য সহজ করা এবং আর্থিক সেবায় দুই বাজারকে আরও কাছে আনার কথাও বলেছেন।

মানুষের চলাচলেও বড় পরিবর্তনের কথা ভাবা হচ্ছে। কার্নি চান কানাডা ও ইউরোপের তরুণদের জন্য আটলান্টিকের দুই পাশে পড়াশোনা, কাজ ও বসবাসের সুযোগ আরও সহজ হোক। ইউরোপের Erasmus+ শিক্ষাবিনিময় কর্মসূচিতে কানাডার অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ Horizon Europe গবেষণা কর্মসূচিতে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।

এই সম্পর্ক শুধু পরিকল্পনার পর্যায়েও নেই। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ইতোমধ্যে অটোয়ায় নিজস্ব একটি অফিস খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অফিসটির কাজ হবে কানাডার পার্লামেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানো। এর দায়িত্বের পরিধির মধ্যে আর্কটিক অঞ্চলও থাকবে, যা দুই পক্ষের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

প্রতিরক্ষা খাতে কানাডা আরও আগেই একধাপ এগিয়েছে। দেশটি EU-এর Security Action for Europe বা SAFE কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া প্রথম অ-ইউরোপীয় দেশ। এর ফলে কানাডীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর জন্য ইউরোপের বড় সরকারি ক্রয়বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে মন্ট্রিয়লভিত্তিক Marconi Technologies এই উদ্যোগের আওতায় পোল্যান্ডের Cyber Command-এর জন্য কানাডায় তৈরি ORION tactical radio সরবরাহের প্রথম চুক্তি পেয়েছে।

অর্থনীতির দিক থেকেও সম্পর্কটির ভিত্তি বড়। ২০২৫ সালে পণ্য ও সেবা মিলিয়ে কানাডা ও EU-এর বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭৮ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের পর EU এখন কানাডার দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈশ্বিক বাণিজ্য অংশীদার। এই সম্পর্কের ভিত তৈরি করেছিল CETA মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি। ২০১৭ সাল থেকে চুক্তিটি অস্থায়ীভাবে কার্যকর রয়েছে।

কার্নির বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘collective resilience’, অর্থাৎ কোনো একটি দেশ বা বাজারের ওপর এমন নির্ভরশীল না থাকা, যাতে বাইরের চাপ এলেই নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। তাঁর মতে, ইউরোপের রয়েছে বড় বাজার, গবেষণা ও উন্নত উৎপাদনক্ষমতা। অন্যদিকে কানাডার রয়েছে বিপুল জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, মহাকাশ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম গবেষণার সক্ষমতা এবং শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা। দুই পক্ষের শক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগানোই তাঁর প্রস্তাবের মূল কথা।

এদিকে এই আলোচনা যখন এগোচ্ছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার রাতে বলেছেন, EU কানাডাকে সহযোগী সদস্য করার পথে এগোলে তিনি ইউরোপের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপ করতে পারেন। এমনকি কিছু পণ্যের বাণিজ্য বন্ধ করার কথাও বলেছেন তিনি।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট মেটসোলা বলেছেন, কানাডার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়। বর্তমান অনিশ্চিত বিশ্বে সমমনা দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানো প্রয়োজন বলেই ইউরোপ এই দরজা খুলতে চাইছে।

কার্নি বলেছেন, কানাডা কার সঙ্গে সম্পর্ক গড়বে সে সিদ্ধান্ত কানাডাই নেবে। একই সঙ্গে তিনি পরিষ্কার করেছেন, ইউরোপের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের উদ্দেশ্য আরেকটি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিবলয় তৈরি করা নয়। তাঁর বক্তব্য, লক্ষ্য এমন সক্ষমতা তৈরি করা যাতে কোনো শক্তি কানাডার বাজার, সার্বভৌমত্ব কিংবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।

রয়টার্স জানিয়েছে, ‘associate member’ ধারণাটি EU-এর সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এখনো বিস্তারিতভাবে আলোচনা হয়নি এবং কয়েকজন ইউরোপীয় কূটনীতিক এর কাঠামো ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে স্ট্রাসবুর্গের ঘোষণা কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়। বরং সামনে কী ধরনের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে, সেই আলোচনার দরজাটি খুলেছে।

পরবর্তী বড় ধাপ আগামী ২৯ ও ৩০ অক্টোবর মন্ট্রিয়লে Canada-EU Summit। কার্নি জানিয়েছেন, সেখানে নতুন অংশীদারত্বের কাঠামো আরও এগিয়ে নেওয়া হবে। এরপর প্রয়োজনীয় আলোচনা শেষে চূড়ান্ত প্রস্তাব কানাডার পার্লামেন্টে যাবে।

তথ্যসূত্র:
Prime Minister of Canada
European Parliament
Reuters

Back to top button
🌐 Read in Your Language