
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের আবেদন মানে এত দিন ছিল কাগজপত্র, আঙুলের ছাপ, অপরাধের রেকর্ড যাচাই, সাক্ষাৎকার এবং ইংরেজি ও নাগরিক জ্ঞান পরীক্ষার দীর্ঘ পথ। এখন সেই পথের সঙ্গে যুক্ত হলো মানুষের মুখে মুখে পাওয়া তথ্যও। আবেদনকারী কোথায় থাকেন, কীভাবে চলেন, কর্মস্থলে তাঁর পরিচিতি কেমন, আশপাশের মানুষ তাঁকে কীভাবে জানেন, এসব বিষয়ও প্রয়োজনে খতিয়ে দেখবেন অভিবাসন কর্মকর্তারা। অর্থাৎ নাগরিকত্বের আবেদনপত্রে লেখা পরিচয় আর বাস্তব জীবনের পরিচয়ের মধ্যে মিল আছে কি না, সেটিও এবার যাচাইয়ের আওতায় আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা ইউএসসিআইএস ২৫ আগস্ট প্রকাশিত নতুন নীতিমালায় এই নির্দেশনা কার্যকর করেছে। সংস্থাটি একে বলছে ব্যক্তিগত তদন্ত বা ‘নেইবারহুড ইনভেস্টিগেশন’ (neighborhood investigation)। নতুন নীতি অনুযায়ী, নাগরিকত্বের আবেদন বিচার করার সময় প্রয়োজনে কর্মকর্তারা আবেদনকারীর বাসা ও কর্মস্থলের আশপাশের মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন। প্রতিবেশী, বাড়ির মালিক, সহকর্মী, নিয়োগকর্তা কিংবা পরিচিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হতে পারে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার। প্রত্যেক নাগরিকত্বপ্রার্থীকে নিয়ে এমন তদন্ত হবে না। ইউএসসিআইএস বলেছে, কোন আবেদনপত্রে এই তদন্ত প্রয়োজন এবং কোনটিতে তা মওকুফ করা যাবে, সেই সিদ্ধান্ত হবে মামলাভিত্তিক। সংস্থাটির ফ্রড ডিটেকশন অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেট এবং ফিল্ড অপারেশনস ডিরেক্টরেট যৌথভাবে আবেদনপত্র, নথি ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। ফলে কারও দরজায় কর্মকর্তা যাবেন, আর কারও ক্ষেত্রে কেবল নথিপত্র ও সাক্ষাৎকারেই কাজ শেষ হবে।
এই নীতি একেবারে নতুন নয়। ১৯৫২ সালের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের ৩৩৫(এ) ধারায় নাগরিকত্বপ্রার্থীদের বিষয়ে ব্যক্তিগত তদন্তের ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়েছিল। বহু বছর ধরে এই ব্যবস্থার ব্যবহার থাকলেও ১৯৯১ সালের পর ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাচারালাইজেশন সার্ভিস, পরে ইউএসসিআইএস, সাধারণভাবে তা মওকুফ করে আসছিল। তখন মূল ভরসা ছিল এফবিআইয়ের অপরাধের রেকর্ড, বায়োমেট্রিক যাচাই এবং অন্যান্য নিরাপত্তা পরীক্ষা।
২০২৫ সালের আগস্টে ইউএসসিআইএস প্রথম পুরোনো এই ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেয়। গত এক বছরে কিছু আবেদনকারীর ক্ষেত্রে তদন্ত চালানোর পর এবার সেটিকে সংস্থার মূল নীতিমালার অংশ করা হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় ইউএসসিআইএস বলেছে, সাক্ষাৎকারে বলা কথা কিংবা জমা দেওয়া নথিতে যা ধরা পড়ে না, আশপাশের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য কখনও কখনও সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে।
তদন্তে মূলত দেখা হবে, আবেদনকারীর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের তথ্য সত্য কি না, তাঁর চরিত্র ও আচরণ কেমন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের নীতির প্রতি অনুগত কি না এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা ও জনকল্যাণের প্রতি তাঁর মনোভাব কী। আইনের ভাষায় যাকে ‘গুড মোরাল ক্যারেক্টার’ (good moral character) বলা হয়, সেই শর্তটি এবার আরও গভীরভাবে যাচাইয়ের সুযোগ পাচ্ছে ইউএসসিআইএস।
নাগরিকত্বের আবেদনে সাধারণ নিয়মে একজন গ্রিনকার্ডধারীকে আবেদন করার আগে অন্তত পাঁচ বছর যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে থাকতে হয়। ওই পাঁচ বছরে অন্তত ৩০ মাস তাঁকে দেশটিতে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকতে হয় এবং আবেদন করার আগে কমপক্ষে তিন মাস নিজ অঙ্গরাজ্য বা ইউএসসিআইএসের সংশ্লিষ্ট এলাকায় বসবাস করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকের স্বামী বা স্ত্রীর জন্য কিছু ক্ষেত্রে তিন বছরের নিয়ম প্রযোজ্য। এ ছাড়া ইংরেজি ভাষার মৌলিক জ্ঞান, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা, সুনাগরিক চরিত্র এবং আনুগত্যের শপথ নেওয়ার শর্তও রয়েছে।
নতুন নীতিতে আবেদনকারীদের জন্য একটি পথও খোলা রাখা হয়েছে। কেউ চাইলে নিজ উদ্যোগে চরিত্র ও পরিচয় সম্পর্কে সাক্ষ্যপত্র জমা দিতে পারবেন। ইউএসসিআইএস বলেছে, এমন চিঠি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং আবেদনকারীর পরিবারের সদস্য নন, এমন পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে হলে তা বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। চিঠিতে আবেদনকারীর চরিত্র, বসবাস, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, সংবিধানের নীতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং নাগরিকত্বের যোগ্যতা সম্পর্কে তথ্য থাকতে পারে। তবে এসব চিঠি জমা দিলেই ব্যক্তিগত তদন্ত হবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ইউএসসিআইএসের হাতেই থাকবে।
এই পরিবর্তনের মধ্যেই নাগরিকত্ব পরীক্ষার নিয়মেও আগের বছর বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর বা তার পরে যাঁরা ফরম এন ৪০০ জমা দিয়েছেন, তাঁদের জন্য নতুন নাগরিক জ্ঞান পরীক্ষা প্রযোজ্য। আগে ১০০টি প্রশ্নের তালিকা থেকে সর্বোচ্চ ১০টি প্রশ্ন করা হতো এবং ছয়টির সঠিক উত্তর দিলেই পাস করা যেত। এখন প্রশ্নভান্ডার ১২৮টি। কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ ২০টি প্রশ্ন করবেন, পাস করতে অন্তত ১২টির সঠিক উত্তর দিতে হবে। তবে ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবরের আগে আবেদন করা ব্যক্তিরা আগের ১০০ প্রশ্নের পরীক্ষার নিয়মেই থাকবেন।
৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী এবং অন্তত ২০ বছর ধরে গ্রিনকার্ডধারী আবেদনকারীদের জন্য বিশেষ ছাড় বহাল আছে। তাঁরা নির্ধারিত ২০টি প্রশ্ন থেকে ১০টি প্রশ্নের উত্তর দেবেন। এর মধ্যে ছয়টির উত্তর সঠিক হলেই তাঁরা পাস করবেন। ইংরেজি পরীক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁদের জন্য ভাষাগত ছাড় রয়েছে।
নাগরিকত্বের সাক্ষাৎকার পেরিয়ে অনুমোদন পেলেও সঙ্গে সঙ্গে কেউ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে যান না। আনুগত্যের শপথ নেওয়ার দিন পর্যন্ত তাঁর যোগ্যতা বহাল আছে কি না, তা দেখার সুযোগ ইউএসসিআইএসের থাকে। নতুন নীতির ফলে নাগরিকত্বের আবেদন এখন শুধু ফরমের ঘর পূরণ আর পরীক্ষার প্রস্তুতির বিষয় নয়। আবেদনকারীর ঠিকানা, কর্মজীবন, ভ্রমণের হিসাব, কর নথি এবং আশপাশের মানুষের কাছে তাঁর পরিচয়, সবকিছুর মধ্যে সামঞ্জস্য রাখার প্রয়োজন আরও বেড়ে গেল।
Sources:
U.S. Citizenship and Immigration Services
USCIS Naturalization Civics Test Guide







