সম্পাদকের পাতা

অর্ধশতাব্দী আগের অপরাধে ৯০ বছর বয়সে ১৬ বছরের কারাদণ্ড

নজরুল মিন্টো

প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে এক কিশোরীর জীবনে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অপরাধের বিচার হলো ২০২৬ সালে। অভিযুক্ত দানিয়েল ডেলভসের (Daniel Delves) বয়স এখন ৯০ বছর। পেশায় ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা ১৯৭০-এর দশকের ইংল্যান্ডের। দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত ১ সেপ্টেম্বর লন্ডনের Snaresbrook Crown Court তাঁকে ১৬ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। আদালতে তিনি এক কিশোরীকে ধর্ষণের ১১টি ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।

আদালতে বলা হয়, মেয়েটির বয়স যখন ১৩ বছর, তখন থেকেই দানিয়েল তাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া শুরু করেন। তখন মেয়েটির মা ছিলেন দানিয়েলের গার্লফ্রেন্ড। এই সম্পর্ককেই তিনি অস্ত্র বানিয়েছিলেন। স্নেহ দেখান, কাছে টানেন, অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু সেই স্নেহের আড়ালেই চলছিল অন্য এক প্রস্তুতি। আদালতের ভাষায়, সেটি ছিল grooming। বিশ্বাস অর্জন করে ধীরে ধীরে একটি শিশুকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে অপরাধকেও তার কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে।

কিশোরীকে বোঝানো হয়েছিল, তার সঙ্গে যা করা হচ্ছে তা নাকি ভবিষ্যতের জন্য এক ধরনের প্রস্তুতি। এরপর মেয়েটি বারবার যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। কখনো নিজের ঘরে, কখনো দানিয়েলের গাড়িতে। একই সঙ্গে তাকে বিষয়টি মায়ের কাছ থেকে গোপন রাখতে বলা হতো। মাত্র ১৪ বছর বয়সে মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়ে।

একটি শিশুর গর্ভধারণ যে কোনো পরিবারেই অসংখ্য প্রশ্ন তৈরি করার কথা। কিন্তু এখানেও সত্য চাপা দেওয়ার পথ বের করেন দানিয়েল। আদালতে প্রসিকিউশন জানায়, তিনি মেয়েটিকে বলতে বাধ্য করেন যে স্কুলের একটি ছেলে তার অনাগত সন্তানের বাবা। সেই গল্পই পরিবারে চালু হয়ে যায়। শিশুটি জন্ম নেওয়ার পর কিশোরীর মা নবজাতককে নিজের সন্তান হিসেবে বড় করতে থাকেন বলে আদালতে জানানো হয়েছে।

সন্তান জন্মের পরও থামেনি নির্যাতন। নির্যাতন চলতে থাকে তার বয়স প্রায় ১৬ বছর হওয়া পর্যন্ত। এক পর্যায়ে মেয়েটির মা উল্টো মেয়েকেই দানিয়েলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ করেন এবং তাকে মারধর করেন বলে আদালতে শুনানি হয়েছে।

মেয়েটি শেষ পর্যন্ত তার এক খালার কাছে নির্যাতনের কথা জানায়। সেই খালাই তাকে পুলিশের কাছে যেতে সহায়তা করেন। অর্থাৎ ১৯৭০-এর দশকেই পুলিশের সামনে অভিযোগটি পৌঁছেছিল। তিনি শিশু অবস্থাতেই অভিযোগ করেছিলেন। তারপর যা ঘটেছিল, সেটিই সম্ভবত পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

প্রসিকিউটর Richard Sedgwick আদালতকে জানান, মেয়েটির মা তাকে অভিযোগ প্রত্যাহারে প্রভাবিত করেন। মায়ের চাপে কিশোরী পুলিশকে জানায়, তার অভিযোগটি সত্য নয়। এরপর তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়।

এই অভিজ্ঞতা একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। ব্রিটেনে শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে পরিচালিত এক দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ ভুক্তভোগী নির্যাতন চলার সময় কাউকে কিছু বলেননি। আর যাঁরা বলেছিলেন, তাঁদের অনেকের অভিজ্ঞতাও সুখকর ছিল না। অভিযোগ জানানোর পর ৪৭ শতাংশের ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অনেককে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে, অনেককে উল্টো দায়ী করা হয়েছে, আবার কাউকে কাউকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অনেক ভুক্তভোগী কয়েক বছর নয়, কয়েক দশক পর প্রথমবার নির্যাতনের কথা বলতে পারেন। ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ, পরিবার ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা এবং বিশ্বাস না করার ভয় এর বড় কারণ।

প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ২০২৩ সালে নারীটি আবার পুলিশের কাছে যান। এবার অভিযোগটি আর হারিয়ে যায়নি। নতুন তদন্ত শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত দানিয়েলের বিরুদ্ধে মামলা আদালতে পৌঁছায়। প্রথম দিকে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু বিচার চলাকালে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে দোষ স্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত ১১টি ধর্ষণের ঘটনায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ৯০ বছর বয়সেও তাই তাঁকে ১৬ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। কারাদণ্ডের পাশাপাশি ভুক্তভোগীকে £135,000 ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দানিয়েলকে।

এত পুরোনো অপরাধের বিচার কীভাবে সম্ভব হলো, তার উত্তর ব্রিটিশ আইনে রয়েছে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে শিশুদের বিরুদ্ধে গুরুতর যৌন অপরাধের অভিযোগ জানানোর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। অপরাধ যত পুরোনোই হোক, পুলিশ তদন্ত করতে পারে এবং পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলা করা যেতে পারে। সময় পেরিয়ে গেলেও তাই অপরাধী আইনের আওতার বাইরে চলে যান না।

তবে পুরোনো মামলায় প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে। সাক্ষী মারা যেতে পারেন, নথি হারিয়ে যেতে পারে, স্মৃতি দুর্বল হতে পারে। বহু বছর আগের ঘটনায় প্রমাণ সংগ্রহের এমন জটিলতা থাকলেও শুধু সময় পেরিয়ে গেছে বলে গুরুতর যৌন অপরাধের বিচার বন্ধ হয়ে যায় না।

দানিয়েলের আইনজীবী Yogain Chandarana আদালতে বলেন, তাঁর মক্কেল তরুণ বয়সে করা অপরাধের জন্য অনুতপ্ত এবং দীর্ঘদিন ধরে সেই অনুশোচনা বহন করছেন। আদালত সেই বক্তব্য শুনেছে। কিন্তু বয়স কিংবা অনুশোচনা শেষ পর্যন্ত অপরাধের গুরুত্বকে ঢেকে দিতে পারেনি।

৯০ বছর বয়সী দানিয়েল এখন কারাগারে যাবেন। জীবনের বাকি সময়ের প্রায় পুরোটাই তাঁকে কারাগারে কাটাতে হবে।

তথ্যসূত্র:
Daily Star, 10 September 2026

Back to top button
🌐 Read in Your Language