
টরন্টোর বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচিত মুখ আরিফ আহমেদ। প্রবাসী টিভির সিইও। একই সঙ্গে তিনি কারাতে প্রশিক্ষক, ব্ল্যাক বেল্ট হোল্ডার। শিশুদের কারাতে শেখান। একদিন তিনি আমন্ত্রণ জানালেন তাঁর একটি ক্লাস দেখতে। আমন্ত্রণে বিস্ময়ের কিছু ছিল না। বিস্ময় ছিল ভেন্যুর নাম শুনে। ক্লাসটি চলছে বায়তুল আমান মসজিদে।
নির্দেশনা মেনে মসজিদের নিচতলায় গেলাম। গিয়ে দেখি, অনেক শিশু ও তাঁদের অভিভাবক উপস্থিত। শিশুদের পরনে সাদা কারাতে পোশাক। অন্যরকম এক পরিবেশ। সেদিন সম্ভবত সার্টিফিকেট বিতরণও ছিল। আরিফ আহমেদের বক্তব্য শুনলাম, অভিভাবকদের কথা শুনলাম, অতিথিদের কথাও শুনলাম। বেশ কিছু সময় কাটিয়ে একসময় বেরিয়ে এলাম। বিষয়টি সেখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ হলো না।
বের হওয়ার পর দু-চারজনের সঙ্গে দেখা হলো, কয়েকটি ফোনও এল। কথাবার্তা শুনে মনে হলো, আরিফ আহমেদ যেন বিরাট এক অপরাধ করে ফেলেছেন। মসজিদের মতো পবিত্র স্থানে খেলাধুলা! শিশুদের কারাতে! মসজিদ পরিচালনা কমিটি কীভাবে অনুমতি দিল! কেউ কেউ বিষয়টিকে ধৃষ্টতা বলতেও কুণ্ঠা করলেন না।

সেদিন আমি কারও প্রশ্নের উত্তর দিইনি। বলা ভালো, দিতে পারিনি। সত্যি বলতে, তখন আমি কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মসজিদ মানে নামাজের জায়গা, এই ধারণা আমাদের অনেকের ভেতরেই গভীরভাবে বসে আছে। নামাজঘরের পবিত্রতা নিয়ে মানুষের সংবেদনশীলতা অমূলক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মসজিদ কি কেবল নামাজের ঘর? মসজিদ কমপ্লেক্সের বাকি অংশ কি সারাবছর খালি পড়ে থাকবে? শিশু, তরুণ, নারী, প্রবীণ, নতুন অভিবাসী, বিপদগ্রস্ত পরিবার, তাদের জন্য মসজিদের কোনো সামাজিক ভূমিকা থাকবে না?
এই প্রশ্নগুলো মাথায় নিয়ে আমি কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারের খোঁজ নিতে শুরু করি। জানতে চাই, নামাজ ছাড়া সেখানে আর কী কী হয়। যত খোঁজ নিলাম, ততই বিস্মিত হলাম। বুঝলাম, আমরা অনেকেই মসজিদ কমপ্লেক্সের বাস্তবতা জানি না।

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন শহরের কয়েকটি মসজিদের পরিচালনা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে যেটুকু জানলাম, তা হলো, সেখানকার মসজিদগুলো নামাজের পাশাপাশি শিক্ষা, নারী ও যুব কার্যক্রম, দাতব্য কাজ এবং সামাজিক সেবায় সক্রিয়। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সময়ের সঙ্গে এসব কার্যক্রমে অংশগ্রহণও বেড়েছে।
উত্তর আমেরিকার অনেক মসজিদের নামের পাশে Islamic Cultural Center, Islamic Centre, Muslim Community Center বা Islamic Society লেখা থাকে। আমরা যেটাকে কেবল নামাজের স্থান বলে মনে করি, প্রশাসনিক ও সামাজিক বাস্তবতায় সেটি ধর্মীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি বহুমুখী কমিউনিটি সেন্টারের ভূমিকাও পালন করে। সেখানে নামাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় শিক্ষা, শিশু-কিশোর কার্যক্রম, সিনিয়রদের জন্য নানা আয়োজন, ফুড ব্যাংক, কাউন্সেলিং, ফিউনারেল সার্ভিস, এমনকি খেলাধুলাসহ কমিউনিটির প্রয়োজনভিত্তিক আরও অনেক কাজ।
এই বাস্তবতা উত্তর আমেরিকার মুসলিম জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এখানে নতুন প্রজন্ম স্থানীয় স্কুল, ভাষা ও ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশে বড় হয়। ফলে মসজিদ যদি কেবল নামাজের সময় দরজা খোলে, নতুন প্রজন্মের বড় অংশ মসজিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবে না। তাই ইসলামিক সেন্টারগুলো নামাজের পাশাপাশি শিক্ষা, সামাজিক সহায়তা, পরিচয় রক্ষা এবং কমিউনিটি গঠনের জায়গা হয়ে উঠেছে।
মিসিসাগার ইসলামিক সেন্টার অব কানাডায় ইবাদতের পাশাপাশি শিক্ষা, কমিউনিটি কার্যক্রম ও সেবামূলক নানা আয়োজন রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের ইসলামিক সোসাইটি অব বোস্টন কালচারাল সেন্টার আরও বড় উদাহরণ। নামাজের পাশাপাশি তাদের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে কোরআন ও তাজবিদ শিক্ষা, নিকাহ ও পারিবারিক সেবা, জাকাত, শিল্পচর্চা, বইপাঠ, উইকেন্ড স্কুল, ইন্টার্নশিপ, সাংস্কৃতিক উৎসব, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও নাগরিক আলোচনা। কেন্দ্রটির ভেতরে স্কুল, ক্যাফে, সামাজিক সেবা সংগঠন, উপহার সামগ্রীর দোকান, ফিউনারেল সার্ভিসসহ বহুমুখী কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা রয়েছে।
জুমার দিন প্রায় সব মসজিদে মুসল্লিদের উপচে পড়া ভিড় থাকে, অনেক জায়গায় বেসমেন্টেও নামাজ হয়। কিন্তু সপ্তাহের বাকি সময়ে কমপ্লেক্সের অনেক জায়গা খালি থাকে। নামাজের পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখে সেসব জায়গায় শিশু, তরুণ, নারী ও প্রবীণদের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালু করা গেলে মসজিদ শুধু ইবাদতের জায়গা নয়, কমিউনিটির আপন ঠিকানাও হয়ে উঠতে পারে।
অনেক ইসলামি স্কলারের মতে, শরীরচর্চা ও নির্দোষ বিনোদন ইসলামে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যদি তা ইবাদত, শালীনতা ও দায়িত্ববোধকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। অর্থাৎ ইসলামের আপত্তি খেলাধুলায় নয়; আপত্তি অশালীনতা, অপচয়, নামাজে বিঘ্ন, ক্ষতি ও উদ্দেশ্যহীনতায়।
মসজিদ কমপ্লেক্সের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। আল্লাহর স্মরণ, নামাজ ও কোরআন তিলাওয়াতের পরিবেশ বিঘ্নিত না হলে সেখানে খেলাধুলা বা বিনোদনমূলক কার্যক্রম করা যেতে পারে। তবে কাজটি যেন মসজিদের মূল উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে না যায়।
নামাজঘর ও মসজিদ কমপ্লেক্সের অন্যান্য অংশ এক নয়। নামাজের মূল জায়গা পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও ইবাদতের পরিবেশে রাখতে হবে। নামাজের সময় অন্য কোনো কার্যক্রম চলবে না।
Islamic Society of Markham তাদের জিম ব্যবহারের নিয়মে বলেছে, নামাজের ১৫ মিনিট আগে সব জিম কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং ফরজ নামাজ শেষ হওয়ার ১৫ মিনিট পর আবার শুরু করা যাবে। অর্থাৎ খেলাধুলা আছে, কিন্তু নামাজের মর্যাদা আগে। উত্তর আমেরিকার মসজিদ ব্যবস্থাপনার জন্য এটিই পরিমিত পথ।
Islamic Institute of Toronto-র ইনডোর জিমে বল হকি, বাস্কেটবল, ভলিবল এবং তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের খেলাধুলার আয়োজন রয়েছে। Islamic Foundation of Toronto-তেও যুব কার্যক্রম, শিক্ষা, খেলাধুলা, কর্মশালা এবং পরিবারভিত্তিক আয়োজন রয়েছে। Toronto Islamic Society-তেও শিশুদের ইসলাম শিক্ষা, হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের কোর্স, প্রাপ্তবয়স্কদের তাজবিদ, বিবাহ-পরামর্শ, সিনিয়র সাপোর্ট এবং জিম ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে।
নারীদের ক্ষেত্রেও উত্তর আমেরিকার মসজিদগুলো এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন। Fiqh Council of North America তাদের “The Inclusion of Women in Masjids” শীর্ষক বক্তব্যে নারীদের জন্য মসজিদকে স্বাগত, নিরাপদ ও সম্মানজনক জায়গা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। উত্তর আমেরিকার বাস্তবতায় নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য মসজিদের সঙ্গে যুক্ত থাকা জরুরি। অনেক ইসলামি স্কলার নারীদের সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া ও মসজিদ পরিচালনায় অংশগ্রহণের কথাও বলেছেন।
সিনিয়রদের জন্যও মসজিদ কমপ্লেক্স বড় আশ্রয়। Islamic Foundation of Toronto তাদের সিনিয়র কার্যক্রমে ব্যায়াম, নাশতা, পিকনিক, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কর্মশালা, কম্পিউটার শিক্ষা, বয়স্কদের খেলাধুলা এবং খাবার আয়োজনের কথা উল্লেখ করেছে। প্রবাসে বয়স্ক মানুষের একাকিত্ব বড় সমস্যা। মসজিদ সেখানে শুধু নামাজের জায়গা নয়, মানসিক সঙ্গ ও সামাজিক মর্যাদার জায়গা।
ফুড ব্যাংক, জাকাত বণ্টন, শরণার্থী ও নতুন অভিবাসীদের সহায়তা, চাকরি প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা, প্যারেন্টিং ক্লাস, বিবাহ ও পারিবারিক পরামর্শ, নিকাহ, ফিউনারেল সার্ভিস, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ, ঈদ মেলা, কমিউনিটি ডিনার, বারবিকিউ, বইপাঠ, ইসলামি শিল্পচর্চা ও শিশুদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সবই মসজিদ কমপ্লেক্সের অংশ হতে পারে, যদি তা ইসলামের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়।
সম্প্রতি নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় শুক্রবার নামাজের সময় মসজিদ প্রাঙ্গণে অনেক পুলিশ দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, কোনো সমস্যা হয়েছে কি না। তিনি জানালেন, নিউ ইয়র্ক পুলিশের নিয়োগ কার্যক্রম চলছে। প্রথমে বিস্ময় লাগলেও পরে ভাবলাম, আইডিয়াটি খারাপ নয়। মুসলিম তরুণদের মূলধারার পেশায় যুক্ত হওয়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে প্রতিনিধিত্ব, নাগরিক অংশগ্রহণ, এসবও তো কমিউনিটির প্রয়োজনের অংশ।
সেদিন বায়তুল আমান মসজিদের নিচতলায় শিশুদের কারাতে ক্লাস দেখে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তার উত্তর এখন আমার কাছে অনেক পরিষ্কার। প্রশ্নটি আসলে কারাতে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি মসজিদকে আমরা কীভাবে দেখি, তা নিয়ে। আমরা কি মসজিদকে কেবল নামাজের ঘরে আটকে রাখব, নাকি মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি সচল কমিউনিটি গড়ে তুলব?
মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হলে মসজিদের মর্যাদা কমে না; বরং মর্যাদা বাড়ে। নামাজ মসজিদের প্রাণ। আর সেই প্রাণকে ঘিরেই গড়ে উঠতে পারে শিক্ষা, মানবিক সেবা ও সামাজিক বন্ধনের পরিসর।
উত্তর আমেরিকার ইসলামিক সেন্টারগুলো সেই ধারণাকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। সেখানে সেজদা আছে, শিক্ষা আছে, শিশু আছে, তরুণ আছে, নারী আছে, প্রবীণ আছে, পরিবার আছে, বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা আছে। মসজিদ শুধু ইবাদতের ঘর নয়; বিশ্বাস, পরিচয়, সেবা ও সমাজ গঠনের এক সম্মিলিত ঠিকানা।
তথ্যসূত্র: Islamic Centre of Canada; Islamic Society of Boston Cultural Center; Islamic Society of Markham; Islamic Institute of Toronto; Islamic Foundation of Toronto; Toronto Islamic Society
নোট: ফিচার পোস্টারটি AI দিয়ে তৈরি প্রতীকী চিত্র।







