সম্পাদকের পাতা

স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে মাথা ঠান্ডা করতে হাঁটলেন ৪৫০ কিলোমিটার!

নজরুল মিন্টো

স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার পর ইতালিতে ৪৫০ কিলোমিটার হেঁটে ফানো পৌঁছনো ব্যক্তি
স্ত্রীর সঙ্গে বিবাদের পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার হেঁটে ফানো পৌঁছেছিলেন ইতালির ৪৮ বছরের ওই ব্যক্তি।

স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া হলে মানুষ কত কিছুই না করে। কেউ পাশের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে থাকেন। কেউ বন্ধুকে ফোন করেন। কেউ রাগ কমাতে বাড়ির আশপাশে একটু হাঁটাহাঁটি করেন। ইতালির কোমো এলাকার ৪৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তিও সেদিন তেমন কিছুই করেছিলেন। স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার পর মাথা ঠান্ডা করতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন হাঁটতে। কিন্তু মাথা ঠান্ডা হতে ঠিক কতটা পথ হাঁটা দরকার, সেটা সম্ভবত তিনি নিজেও জানতেন না।

হাঁটতে হাঁটতে প্রথমে শহর ছাড়ালেন। তারপর পরিচিত এলাকা। একসময় নিজের অঞ্চলও পেছনে পড়ে গেল। তবু পা থামল না। এক দিন গেল, তারপর আরেক দিন। এভাবে প্রায় এক সপ্তাহ পর যখন পুলিশ তাঁর হাঁটা থামাল, তখন তিনি বাড়ি থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরে। উত্তর ইতালির কোমো থেকে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেছেন মধ্য ইতালির অ্যাড্রিয়াটিক উপকূলের ফানো শহরে।

ঘটনাটি ২০২০ সালের নভেম্বরের শেষ দিকের। তখন পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের মতো ইতালিও করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল। মানুষের চলাচলে ছিল কঠোর বিধিনিষেধ। রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত দেশজুড়ে কারফিউ কার্যকর ছিল। অথচ সেই সময়েই একজন মানুষ একা হেঁটে চলেছেন শহরের পর শহর পেরিয়ে।

লোকটির নাম সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি। জানা যায়, তিনি ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় কোমো প্রদেশে থাকতেন। স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে পরে পুলিশকে তিনি বলেছিলেন, মাথা ঠান্ডা করতেই হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। উদ্দেশ্যটি খুব সাধারণ হলেও হাঁটাটা আর সাধারণ থাকেনি।

প্রথম কয়েক কিলোমিটার হয়তো তাঁর কাছে স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল। রাগের সময় হাঁটলে অনেকেরই মন হালকা হয়। কিন্তু তিনি বাড়ির দিকে ফিরলেন না। সামনে রাস্তা ছিল, তিনি সেই রাস্তা ধরেই এগোতে থাকলেন। তারপর আরও রাস্তা, আরও শহর। ইতালীয় সংবাদমাধ্যমের বিবরণ অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এগোতে এগোতে শেষ পর্যন্ত তাঁর যাত্রা গিয়ে ঠেকে ফানোতে।

সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় ছিল হাঁটার গতি। প্রায় সাত দিনে ৪৫০ কিলোমিটার, অর্থাৎ গড়ে দিনে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার। এতটা পথ হাঁটার জন্য সাধারণত দীর্ঘ প্রস্তুতি লাগে। অথচ তিনি বেরিয়েছিলেন শুধু মাথা ঠান্ডা করতে। গাড়ি বা অন্য কোনো যানবাহন ব্যবহার করেননি বলে পরে পুলিশকে জানান। পথে অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে খাবার ও পানি পেয়েছেন। সেই সাহায্যেই দিনের পর দিন চলেছে তাঁর এই অদ্ভুত পদযাত্রা।

এদিকে কোমোতে তাঁর স্ত্রী কাটাচ্ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন সময়। স্বামী বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফিরছেন না। কোথায় গেছেন, কী অবস্থায় আছেন, কোনো খবর নেই। উদ্বেগ বাড়তে থাকায় একসময় তিনি পুলিশের কাছে স্বামী নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ করেন। প্রায় এক সপ্তাহ পরও সেই অভিযোগ পুলিশের নথিতে ছিল, অথচ যাঁকে খোঁজা হচ্ছে তিনি তখন শত শত কিলোমিটার দূরে হাঁটছেন।

আর সেই মানুষটি কতটা দূরে চলে এসেছেন, সেটিও নাকি ঠিক বুঝতে পারেননি। পরে তিনি পুলিশকে এমনটাই জানিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই দীর্ঘ হাঁটা থামালেন স্ত্রী নন, ক্লান্তিও নয়। থামাল ইতালির কোভিড কারফিউ।

রাত তখন প্রায় দুইটা। ফানো শহরের গিমাররা এলাকায় জাতীয় সড়কের পাশে এক ব্যক্তিকে একা হাঁটতে দেখেন টহলরত পুলিশ সদস্যরা। রাত ১০টার পর বাইরে থাকার নিষেধাজ্ঞা তখন কার্যকর। পুলিশ তাঁকে থামিয়ে পরিচয় জানতে চায়। লোকটির চেহারায় দীর্ঘ পথ হাঁটার ক্লান্তি তখন স্পষ্ট।

পরিচয় ও বাড়ির ঠিকানা জানার পর পুলিশের সামনে দেখা দিল নতুন প্রশ্ন। কোমোর বাসিন্দা একজন মানুষ এত রাতে ফানোতে এলেন কী করে? দুই শহরের মধ্যে দূরত্ব প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার। উত্তর শুনে পুলিশও প্রথমে অবাক হয়ে যায়। তিনি হেঁটেই এসেছেন। কোনো গাড়ি নয়, বাস নয়, ট্রেন নয়। পুরো পথ পায়ে হেঁটে।

এত দূর হেঁটে আসার কথা প্রথমে পুলিশের বিশ্বাস হয়নি। কর্মকর্তারা তাঁর পরিচয় তথ্যভান্ডারে পরীক্ষা করেন। তখনই সামনে আসে কোমোতে তাঁর স্ত্রীর করা নিখোঁজের অভিযোগ। নাম, বয়স, ঠিকানা এবং নিখোঁজ হওয়ার সময় মিলিয়ে দেখা হয়। এরপর আর সন্দেহ থাকে না। তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লান্ত মানুষটিই সেই নিখোঁজ স্বামী।

প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার হাঁটার পর তাঁর শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল, সেটিও স্বাভাবিকভাবেই পুলিশের নজরে আসে। ইতালীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তিনি প্রচণ্ড ক্লান্ত ছিলেন, ঠান্ডায় কাবু হয়ে পড়েছিলেন, তবে পুরোপুরি সচেতন ছিলেন এবং স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন। পুলিশকে তিনি জানান, পথে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে খাবার ও পানি পেয়েছেন। তাঁর নিজের ভাষায়, তিনি ভালোই আছেন, শুধু একটু ক্লান্ত।

এরপর গল্পে আসে আরেকটি মজার মোড়। পুলিশ তাঁকে বিশ্রামের জন্য ফানোর Hotel Augustus-এ থাকার ব্যবস্থা করে। তখন জানা যায়, ফানো তাঁর কাছে একেবারে অচেনা শহর নয়। কয়েক বছর আগে পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে এসে এই হোটেলেই থেকেছিলেন তিনি। ফলে প্রশ্ন জাগে, হাঁটতে হাঁটতে অজান্তেই কি তিনি পরিচিত কোনো গন্তব্যের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন? এর উত্তর অবশ্য জানা যায়নি। তবে ঘটনাটির অদ্ভুত চরিত্রে এই তথ্যটি নতুন মাত্রা যোগ করে।

পুলিশ এরপর কোমোতে তাঁর স্ত্রীকে খবর দেয়। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে যাঁকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করছিলেন, সেই মানুষটি বেঁচে আছেন, মোটামুটি সুস্থও আছেন। সমস্যা একটাই, তিনি বাড়ি থেকে ৪৫০ কিলোমিটার দূরে।

পরদিন সকালে স্ত্রী গাড়ি নিয়ে কোমো থেকে ফানোর উদ্দেশে রওনা হন। স্বামীকে বাড়ি নিয়ে ফিরতে হবে। তবে ফেরার সময় সঙ্গে শুধু স্বামীই ছিলেন না। যোগ হয়েছিল একটি হোটেলের বিল এবং ৪০০ ইউরোর জরিমানা।

জরিমানাটি অবশ্য স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করার জন্য নয়। ৪৫০ কিলোমিটার হাঁটার জন্যও নয়। রাত দুইটার সময় রাস্তায় বেরিয়ে ইতালির কোভিড কারফিউ ভাঙার কারণেই তাঁকে ৪০০ ইউরো জরিমানা করেছিল পুলিশ।

স্বামীকে ফিরে পাওয়ার পর স্ত্রী তাঁকে কী বলেছিলেন, সে কথা সংবাদমাধ্যমে আসেনি। এই গল্পের সম্ভবত সবচেয়ে আকর্ষণীয় সংলাপটিই তাই অজানা থেকে গেছে।

ঘটনাটি ইতালির সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৪৮ বছর বয়সী ওই ব্যক্তিকে অনেকে বলতে শুরু করেন ইতালির বাস্তব জীবনের ‘Forrest Gump’। ১৯৯৪ সালের বিখ্যাত চলচ্চিত্রে ফরেস্ট গাম্প একসময় কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ছাড়াই দীর্ঘ পথ দৌড়াতে শুরু করে। ইতালির এই ব্যক্তির সঙ্গে সিনেমার চরিত্রটির মিল ছিল সেই অপ্রত্যাশিত দীর্ঘ যাত্রায়।

স্ত্রীর সঙ্গে ছোট্ট একটি ঝগড়া দিয়ে শুরু হয়েছিল ঘটনাটি। উদ্দেশ্য ছিল মাথা ঠান্ডা করা। শেষ পর্যন্ত মাথা কতটা ঠান্ডা হয়েছিল, তা জানা যায়নি। তবে হাঁটতে হাঁটতে তিনি যে ৪৫০ কিলোমিটার দূরে চলে গিয়েছিলেন, সেটাই তাঁকে জায়গা করে দিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত দাম্পত্য ঝগড়ার গল্পগুলোর একটিতে।

তথ্যসূত্র:
The Independent




FAQ

১. ইতালির ওই ব্যক্তি কেন ৪৫০ কিলোমিটার হেঁটেছিলেন?

স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার পর রাগ কমাতে এবং মাথা ঠান্ডা করতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন বলে তিনি পুলিশকে জানান।

২. তিনি কোথা থেকে কোথায় হেঁটেছিলেন?

তিনি কোমো প্রদেশ থেকে হেঁটে ফানো শহরে পৌঁছেছিলেন। দূরত্ব ছিল প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার।

৩. তিনি কত দিন হেঁটেছিলেন?

প্রায় সাত দিন ধরে হাঁটার পর তাঁকে ফানোতে পাওয়া যায়।

৪. পুলিশ কীভাবে তাঁকে খুঁজে পেল?

ফানোতে রাত ২টার দিকে কারফিউ চলাকালীন রাস্তায় তাঁকে দেখে পুলিশ থামায়। পরিচয় যাচাই করার পর জানা যায়, তাঁর স্ত্রী কোমোতে নিখোঁজের অভিযোগ করেছিলেন।

৫. কেন তাঁকে ৪০০ ইউরো জরিমানা করা হয়েছিল?

২০২০ সালে কোভিড পরিস্থিতিতে রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত কারফিউ কার্যকর ছিল। রাত ২টায় রাস্তায় থাকার কারণে তাঁকে জরিমানা করা হয়।

৬. তিনি কি কোনও যানবাহন ব্যবহার করেছিলেন?

পুলিশকে তিনি জানিয়েছিলেন, পুরো পথ তিনি হেঁটেছেন এবং কোনও যানবাহন ব্যবহার করেননি।

Back to top button
🌐 Read in Your Language