ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সংঘাত চলতে পারে, সতর্ক করলেন উপদেষ্টারা

ওয়াশিংটন, ১০ সেপ্টেম্বর- ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুরো মেয়াদজুড়ে চলতে পারে—এমন আশঙ্কা তাকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কয়েকজন উপদেষ্টা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বুধবার মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা ওভাল অফিস ও সিচুয়েশন রুমে অনুষ্ঠিত ব্যক্তিগত বৈঠকে ট্রাম্পকে সতর্ক করেন যে, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হতে পারে।
এমনকি পরিস্থিতি ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন প্রেসিডেন্টের অভিষেকের দিন পর্যন্তও গড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্স হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে উপদেষ্টাদের আশঙ্কার পার্থক্য
হোয়াইট হাউসের শীর্ষ উপদেষ্টাদের এই সতর্কবার্তা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক।
বুধবার ট্রাম্প দাবি করেন, নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ‘পরপরই’ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হয়ে যেতে পারে। তার অভিযোগ, ইরান মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের পক্ষে আর বেশিদিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলা করে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। ফলে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার বিষয়ে তিনি প্রকাশ্যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
তবে তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন আরও সতর্ক। তাদের আশঙ্কা, ইরান দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিরোধ চালিয়ে গেলে সামরিক সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার পরিবর্তে তা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
কূটনীতির দরজা এখনও খোলা
ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি ট্রাম্প। বুধবার তিনি স্বীকার করেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এখনও সম্ভব।
তবে আলোচনাকে তিনি নিজের পছন্দের পথ হিসেবে দেখছেন না। অর্থাৎ, সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও খোলা রাখছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এ অবস্থায় ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে দ্রুত সমঝোতায় আনা যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
২০২৯ পর্যন্ত যুদ্ধ চলার আশঙ্কা
হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টাদের আশঙ্কার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংঘাতের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি চরিত্র। তাদের মতে, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখে, তাহলে যুদ্ধ কয়েক মাস বা এক-দুই বছরের মধ্যে শেষ নাও হতে পারে।
এমনকি বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদ শেষ হওয়ার সময়ও সংঘাত চলমান থাকতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কারণ, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা ও ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ, তেলের দাম এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে ট্রাম্পের বক্তব্য
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, ইরান মার্কিন ভোটারদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে এবং নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে চাইছে।
তবে ট্রাম্পের মতে, ইরানের সেই সক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তিনি আশা করছেন, নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধের অবসান ঘটবে।
অন্যদিকে উপদেষ্টাদের গোপন মূল্যায়ন যদি সঠিক হয়, তাহলে সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্পের প্রকাশ্য আশাবাদ বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় অনেক বেশি ইতিবাচক হতে পারে।
ফলে একদিকে প্রেসিডেন্টের দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রত্যাশা, অন্যদিকে তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা—এই দুই ভিন্ন মূল্যায়ন ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এস এম/ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬







