মধ্যপ্রাচ্য

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল দিয়ে চীনা পণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম নিচ্ছে ইরান

চীনা পণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম

তেহরান,১০ সেপ্টেম্বর- যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মধ্যেও নিজেদের জ্বালানি ও আমদানির ব্যবস্থা সচল রাখতে নতুন ধরনের বাণিজ্য কৌশল নিয়েছে ইরান ও চীন। মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেহরান থেকে কম দামে অপরিশোধিত খনিজ তেল কিনছে বেইজিং। এর বিনিময়ে কোনো সরাসরি ব্যাংক লেনদেন ছাড়াই সামরিক সরঞ্জাম থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাচ্ছে ইরান। বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অত্যন্ত গোপনীয় এই বিনিময় ব্যবস্থায় ইরান তেল বিক্রির অর্থ সরাসরি কোনো ব্যাংকে না নিয়ে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্রেডিট বা পয়েন্ট হিসেবে জমা রাখে। পরে সেই ক্রেডিট ব্যবহার করেই চীনা পণ্য আমদানি করা হয়। সংশ্লিষ্ট পাঁচটি সূত্র জানিয়েছে, এই বিশেষ অর্থনৈতিক পদ্ধতির মাধ্যমে গত এক বছরে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ লেনদেন হয়েছে।

এই লেনদেনের প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত হয়। গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে জানানো হয়েছে, চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ‘ঝুহাই ঝেনরং’-এর হয়ে কাজ করা একটি মধ্যস্থতাকারী পক্ষ ‘ছুশিন’ নামের একটি অস্পষ্ট ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে কোটি কোটি ডলার জমা করে। জমা হওয়া অর্থের প্রায় ৭০ শতাংশ ইরানের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়। বাকি অর্থ জমা হয় একটি বিশেষ ট্রাস্ট বা ‘স্পেশাল পারপাস ভেহিক্যাল’ (এসপিভি) সংক্রান্ত অ্যাকাউন্টে। মূলত এই এসপিভি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে চীন সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত দুটি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনে ইরানি আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হয়। হংকংয়ের রেজিস্ট্রি নথিতে কিছু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া গেলেও বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান কোনো অস্তিত্ব বা বাণিজ্যিক রেকর্ড পাওয়া যায়নি।

এই গোপন বাণিজ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান চীন থেকে ওষুধ, কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন, গণপরিবহন, যোগাযোগ প্রযুক্তির সরঞ্জাম এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে। এমনকি গত এক বছরে অন্তত একবার কোটি কোটি ডলারের এয়ার ডিফেন্স বা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের চুক্তিতেও এই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে বলে সূত্রগুলো দাবি করেছে। এ ধরনের নির্দিষ্ট লেনদেনের মাধ্যমে চীন তার প্রধান ব্যাংক ও সরবরাহকারীদের আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে সুরক্ষিত রাখার সুযোগ পায়। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বেইজিং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৌশলগতভাবে অস্বীকার করার সুযোগও পাচ্ছে।

তবে চীন সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ধরনের বাণিজ্য ব্যবস্থা বা এর বিস্তারিত সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই বলে জানিয়েছে। তবে বেইজিং স্পষ্ট করে বলেছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া কোনো একতরফা নিষেধাজ্ঞাকে তারা সমর্থন করে না। অন্যদিকে তেহরানের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একই সময়ে ওয়াশিংটনের এক জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নস্যাৎ করতে এবং তাদের সম্পদ জোগানের উৎস বন্ধ করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র আবার জাতিসংঘকে ব্যবহার করে ইরানের ওপর কঠোর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ও স্ন্যাপব্যাক নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নিলে চীন ও ইরান যৌথভাবে এর বিরোধিতা করে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে থাকা ২৫ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বকে কাজে লাগিয়ে এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক ও অনথিভুক্ত বাণিজ্য কাঠামো আরও জোরদার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ-অবরোধের মধ্যেও এই ব্যবস্থা ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এস এম/ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button