মধ্যপ্রাচ্য

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে বাড়ছে তেল দূষণ ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি

হরমুজ প্রণালি

তেহরান,১০ সেপ্টেম্বর- হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত ধীরে ধীরে সমুদ্রপথেও ছড়িয়ে পড়ছে। তেলবাহী ট্যাংকারসহ বিভিন্ন জাহাজে একের পর এক হামলার ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ এখন শুধু জ্বালানি সরবরাহের জন্য নয়, সম্ভাব্য বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কাতেও উদ্বেগের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

গত ৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়। এর জবাবে জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। এর মাত্র তিন দিন আগে আরও তিনটি ইরানি ট্যাংকারে হামলা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, এর আগে হরমুজ প্রণালির কাছে একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও নৌবাহিনীর একটি ডেস্ট্রয়ারকে লক্ষ্য করে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল।

পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে হরমুজ প্রণালি এখন সম্ভাব্য পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। কারণ, এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। কোনো তেলবাহী জাহাজে বড় ধরনের হামলা হলে আগুন লাগা, জাহাজ ডুবে যাওয়া কিংবা বিপুল পরিমাণ তেল সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার পর্যন্ত ৪২টি তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। এর মধ্যে ১৮টি ট্যাংকারে তেল ছিল। এসব জাহাজে মোট কত পরিমাণ তেল রয়েছে, তা নিশ্চিত না হলেও তাদের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা প্রায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার ঘনমিটার।

কোনো বড় ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে সেটি ডুবে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কয়েক লাখ লিটার তেল উপসাগরের পানিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে উপকূল, মৎস্যসম্পদ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে তেল

হামলার কারণে পারস্য উপসাগরে পরিবেশগত ক্ষতির কিছু ঘটনা এরই মধ্যে ঘটেছে। জুনের শুরুতে ওমানের উপকূল থেকে প্রায় ৪১ কিলোমিটার দূরে ‘ক্যারোলিন বেজেঙ্গি’ নামের একটি ট্যাংকারে বিস্ফোরণের আশঙ্কা দেখা দেওয়ার পর সেটি পানিতে আটকে যায়। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, জাহাজটিতে প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল তেল থাকতে পারে।

ওমানের পরিবেশ কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, এই তেল ছড়িয়ে পড়লে রাস মাদরাকা এলাকার প্রায় ৪০ কিলোমিটার উপকূল এবং মাসিরাহ দ্বীপ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ ছাড়া গত ৩ আগস্ট ওমানের উপকূলের কাছে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘মিনোয়ান পাইওনিয়ার’ নামের একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালানো হয়। পরে স্যাটেলাইটের ছবিতে কেশম ও সিরি দ্বীপের কাছে পানিতে তেলের আস্তরণ দেখা যায়।

সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বড় ঝুঁকিতে

কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান কেন্দ্রের গবেষকদের মতে, ১৯৮০-এর দশক থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল দূষণ বড় ধরনের পরিবেশগত সমস্যা। শিল্পায়ন, উপকূলীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং তেল ও গ্যাসভিত্তিক কর্মকাণ্ডের কারণে এই অঞ্চলের সামুদ্রিক পরিবেশ আগে থেকেই ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে।

তেল পানির ওপর ভেসে থেকে সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করে। এতে মাছ, প্রবাল, প্ল্যাঙ্কটনসহ বিভিন্ন প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে মাছের ডিম ও লার্ভা তেল দূষণের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।

প্রবালপ্রাচীর, ম্যানগ্রোভ বন, সামুদ্রিক ঘাসের ক্ষেত ও উপকূলীয় পলিমাটিতে দূষণ দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকতে পারে। এর ফলে মাছের বিচরণ, খাদ্যশৃঙ্খল, প্রজনন ও অভিবাসনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও মৎস্য অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পানির সংকটের আশঙ্কা

পরিবেশগত ক্ষতির পাশাপাশি তেল দূষণ উপসাগরীয় দেশগুলোর পানির নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষ প্রধানত সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করে বা ডিস্যালিনেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পানীয় জলের চাহিদা পূরণ করে। ইরানের দক্ষিণ উপকূলেও বেশ কয়েকটি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট রয়েছে।

সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়লে এসব প্ল্যান্টে ব্যবহৃত কাঁচা পানির মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দূষিত পানি শোধন প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং গুরুতর পরিস্থিতিতে কিছু প্ল্যান্টের কার্যক্রম সাময়িকভাবে সীমিত বা বন্ধ করতে হতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করবে তেল ছড়িয়ে পড়ার স্থান, সমুদ্রস্রোত, পানির গভীরতা এবং ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের অবস্থানের ওপর। আধুনিক নজরদারি ও উন্নত শোধন প্রযুক্তি ঝুঁকি অনেকটা কমাতে পারে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত দূষণ শনাক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

পুরোনো ক্ষত আবারও উন্মুক্ত

উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল দূষণের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা অবশ্য নতুন নয়। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকি বাহিনী কুয়েত থেকে পিছু হটার সময় দেশটির বহু তেলকূপে আগুন ধরিয়ে দেয়। কয়েক মাস ধরে জ্বলতে থাকা এসব তেলকূপ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল উপসাগরে ছড়িয়ে পড়ে।

কুয়েত থেকে সৌদি আরবের আবু আলি দ্বীপ পর্যন্ত ৭৭০ কিলোমিটারের বেশি উপকূল তেল ও আলকাতরায় আক্রান্ত হয়েছিল। এতে স্থানীয় সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এর প্রভাব বহু বছর ধরে টিকে ছিল।

বর্তমান সংঘাত সেই পুরোনো পরিবেশগত ক্ষতকে আবারও গভীর করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা যদি বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারকে আরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে, তাহলে হরমুজ প্রণালি শুধু বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য নয়, গোটা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক পরিবেশ ও পানির নিরাপত্তার জন্যও বড় সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এস এম/ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

Back to top button