সম্পাদকের পাতা

যুক্তরাষ্ট্রে কানাডিয়ান কোম্পানি Bombardier-এর পণ্য বিক্রি বন্ধের হুমকি ট্রাম্পের

নজরুল মিন্টো

পণ্য বিক্রি বন্ধের হুমকি ট্রাম্পের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার কানাডাকে দেওয়া তাঁর সর্বশেষ হুমকিতে ঘোষণা করেছেন, “NO MORE SELLING BOMBARDIER IN THE UNITED STATES!” তাঁর শর্ত, মার্কিন বাজারে থাকতে হলে Bombardier-কে বিমান যুক্তরাষ্ট্রেই তৈরি করতে হবে। কিন্তু কানাডার এই বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করার উদ্যোগের অভিঘাত শেষ পর্যন্ত উল্টো গিয়ে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রেরই কয়েক হাজার কর্মী, হাজারো সরবরাহকারী এবং Bombardier-নির্ভর বিশাল বিমান-সেবা ও যন্ত্রাংশ বাজারের ওপর।

Bombardier কোনো ছোটখাটো বিদেশি ব্র্যান্ড নয়। মন্ট্রিয়লভিত্তিক এই কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান এখন বিশ্বের অন্যতম বড় বিজনেস জেট নির্মাতা। বিশ্বের বহু দেশে বিস্তৃত রয়েছে কোম্পানিটির বাজার, গ্রাহক ও সেবা নেটওয়ার্ক। এ কোম্পানির Challenger 3500 ও Challenger 650 মাঝারি আকারের ব্যবসায়িক জেট, আর Global সিরিজে রয়েছে একাধিক দীর্ঘপাল্লার মডেল। একই প্ল্যাটফর্মের বিমান সরকার ও সামরিক বাহিনীর বিশেষ মিশনের উপযোগী করেও তৈরি করে Bombardier Defense। পাশাপাশি বিমান রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বিক্রয়োত্তর সেবাও কোম্পানিটির বড় ব্যবসার অংশ।

কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কযুদ্ধ যখন নতুন আরেকটি ধাপে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই Bombardier-কে নিশানা করলেন ট্রাম্প। আজ মধ্যরাত পেরিয়ে ৮ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে ২৭.৬ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্যের ওপর ১৫, ২৫ ও ৫০ শতাংশ হারে পাল্টা শুল্ক কার্যকর করতে যাচ্ছে কানাডা। যুক্তরাষ্ট্র ২২ আগস্ট কানাডার একই অঙ্কের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পর অটোয়া dollar-for-dollar জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই প্রেক্ষাপটে Bombardier নিয়ে ট্রাম্পের আকস্মিক আক্রমণকে নিছক জেদ ও অপরিণামদর্শী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে আরও বলেছেন, Bombardier-এর বিমান ‘ভালো নয়’। কিন্তু সেই বক্তব্যের পরই প্রশ্ন উঠেছে, Bombardier-এর বিমান যদি সত্যিই মানসম্মত না হয়, তাহলে সেগুলো এত বছর ধরে মার্কিন আকাশে উড়ছে কীভাবে? বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, Bombardier-এর জেটগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা FAA-এর অনুমোদিত এবং USMCA-এর নিয়মও মেনে চলে। মার্কিন বিমানশিল্প বিশ্লেষক রিচার্ড আবুলাফিয়া বলেছেন, ট্রাম্প কীভাবে Bombardier-এর বিমান বিক্রি বন্ধ করবেন, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তাঁর ধারণা, এই হুমকির কারণে Bombardier-এর গ্রাহকেরা অর্ডার বাতিল করবেন না।

এর আগেও, গত জানুয়ারিতে, ট্রাম্প Bombardier-কে লক্ষ্য করেছিলেন। তখন তিনি Global Express সিরিজের বিমানের অনুমোদন বাতিলের কথা বলেন এবং কানাডায় তৈরি সব বিমানের ওপর ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, কানাডা মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বী Gulfstream-এর কয়েকটি বিমানকে অনুমোদন দিচ্ছে না। তবে শেষ পর্যন্ত Bombardier-এর বিমানের অনুমোদন বাতিল করা হয়নি, ৫০ শতাংশ শুল্কও কার্যকর হয়নি। পরের মাসে কানাডা Gulfstream-এর কয়েকটি বিমানকে অনুমোদন দেয়।

Bombardier-এর সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র, এতে সন্দেহ নেই। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির মোট আয় ছিল প্রায় ৯.৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং তারা ১৫৭টি বিমান সরবরাহ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এর আয়ের অংশ অর্ধেকের বেশি। কিন্তু এখানেই ট্রাম্পের হুমকির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। Bombardier যুক্তরাষ্ট্রে শুধু বিমান বিক্রি করে না, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ভেতরেও বড় আকারে বসবাস করে।

রয়টার্সের হিসাবে, Bombardier যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩,৫০০ মানুষকে সরাসরি চাকরি দিয়েছে এবং প্রায় ২,৮০০ মার্কিন সরবরাহকারীর সঙ্গে কাজ করে। দেশটিতে কোম্পানিটির কারখানা ও সেবাকেন্দ্র রয়েছে, নতুন করে আরও সেবাকেন্দ্রও যোগ করা হচ্ছে। টেক্সাসে Global 8000-এর ডানা তৈরি হয়। কানসাসে Bombardier Defense-এর কারখানায় কানাডায় তৈরি বিমানকে বিশেষ সামরিক ও সরকারি মিশনের উপযোগী করে তোলা হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, বিশ্বজুড়ে Bombardier-এর গ্রাহকদের ব্যবহৃত প্রায় ৫,১০০ বিমানের প্রায় অর্ধেকই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।

অর্থাৎ Bombardier-কে মার্কিন বাজার থেকে বের করে দেওয়ার অর্থ শুধু কানাডা থেকে নতুন বিমান আমদানি বন্ধ করা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মার্কিন প্রকৌশলী, মেকানিক, কারিগরি সেবাকর্মী, যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এবং অসংখ্য ছোট ও মাঝারি ব্যবসা। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা প্রায় আড়াই হাজার Bombardier বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজনও হঠাৎ করেই শেষ হয়ে যাবে না।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, Bombardier-এর অনেক বিমানে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি ইঞ্জিন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়। ফলে Bombardier-এর নতুন বিমান বিক্রি কমলে মার্কিন ইঞ্জিন নির্মাতা ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও অর্ডার হারাতে পারে।

এই কারণেই সিদ্ধান্তটিকে অর্থনৈতিকভাবে অদূরদর্শী বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা খাত ২০২৫ সালে ১০৯.২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত তৈরি করেছে এবং আগের বছরের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে ২৫ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের এই শিল্পে কানাডা দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। গাড়িশিল্পের মতো বিমানশিল্পেও ‘কানাডিয়ান’ বা ‘আমেরিকান’ পণ্যকে একটি জাতীয় সীমানার মধ্যে আলাদা করে দেখা কঠিন।

মার্কিন বাজার হারালেই Bombardier বড় ধাক্কা খাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং এ ধরনের সিদ্ধান্তের অভিঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই গুরুতরভাবে পড়বে। বিশ্বজুড়ে কানাডিয়ান কোম্পানি Bombardier-এর তৈরি হাজার হাজার বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ, সেবা ও যন্ত্রাংশের প্রয়োজন অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে ইউরোপ, এশিয়া-প্যাসিফিক, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় কোম্পানিটির বিস্তৃত বাজার রয়েছে। Bombardier-এর ২০২৪ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে জার্মানি, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, মাল্টা, পর্তুগাল, অস্ট্রিয়া, ভারত, সিঙ্গাপুর, চীন, অস্ট্রেলিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন বাজার থেকে উল্লেখযোগ্য আয়ের তথ্য রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব নথিতেও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপ, এশিয়া-প্যাসিফিক ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ৫,১০০-এর বেশি Bombardier বিমানকে সেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটি সম্ভবত ট্রাম্পের একটি বাক্যেই: “Their products aren’t good enough.” কোনো বিমানের নিরাপত্তা বা মান রাজনৈতিক পোস্টে নির্ধারিত হয় না, তা নির্ধারিত হয় সার্টিফিকেশন, প্রকৌশলগত মান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরীক্ষার মাধ্যমে। Bombardier-এর বিমান যদি FAA-এর অনুমোদন নিয়ে মার্কিন আকাশে উড়ে, আর একই সঙ্গে হাজার হাজার মার্কিন কর্মী ও কোম্পানি সেই বিমান তৈরি ও সচল রাখার কাজে যুক্ত থাকে, তাহলে হঠাৎ পুরো ব্র্যান্ডকে ‘যথেষ্ট ভালো নয়’ বলার পেছনে বাণিজ্যনীতির চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই বেশি প্রতীয়মান হয়। ফলে ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে বাস্তবতার চেয়ে চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছেন বিমানশিল্পের বিশ্লেষকেরা।

৮ সেপ্টেম্বর কানাডার পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার ঠিক আগে Bombardier-কে লক্ষ্য করে ট্রাম্পের এই হুমকি নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। তবে Bombardier-এর বৈশ্বিক বাজার ও প্রতিষ্ঠিত অবস্থান বিবেচনায় এই হুমকি কোম্পানিটির জন্য নির্ণায়ক হয়ে উঠবে না। বরং এমন পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব বিমানশিল্প ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসাই বেশি চাপে পড়তে পারে। বিমানশিল্পের বিশ্লেষকেরা এর বাস্তবায়ন নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন। ফলে এবারের ঘোষণাও কতটা ধোপে টিকবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে এই অবস্থান থেকে সরে আসতে হলে সেটি মোটেই বিস্ময়ের হবে না।

তথ্যসূত্র:
Reuters
Bombardier

ঘোষণা: আগামীকাল সকালে প্রকাশিত হবে আমার নতুন লেখা, “যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত পণ্যের ওপর কানাডার নতুন শুল্ক”। কোন কোন পণ্যে কত শতাংশ শুল্ক বসছে, কোনগুলো এর বাইরে, আর জিনিসপত্রের দাম বাড়বে কি না, এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর থাকবে লেখাটিতে।
Be Canadian. Buy Canadian.

Back to top button
🌐 Read in Your Language