সম্পাদকের পাতা

অস্ট্রেলিয়ার ক্যাম্পবেলটাউনের ডেপুটি মেয়র হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মাসুদ চৌধুরী

নজরুল মিন্টো

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মাসুদ চৌধুরী

সিডনির দক্ষিণ-পশ্চিমের ক্যাম্পবেলটাউন সিটি কাউন্সিলের সভাকক্ষ সেদিন অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি জমজমাট। দর্শক গ্যালারিতে জায়গা নিয়েছিলেন বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি। সামনে ১৫ সদস্যের কাউন্সিলের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। প্রথমে মেয়র নির্বাচন। ডারসি লাউন্ডের বিপরীতে কেউ দাঁড়ালেন না। এরপর ডেপুটি মেয়র নির্বাচনের পালা। প্রার্থী দুজন, লেবার পার্টির মাসুদ চৌধুরী এবং কমিউনিটি ফার্স্ট টোটালি ইন্ডিপেনডেন্ট পার্টির সেতা বেরবারি। ভোট নেওয়া হলো হাত তুলে। উপস্থিত ১৪ কাউন্সিলরের মধ্যে নয়জনের হাত উঠল মাসুদ চৌধুরীর পক্ষে। মুহূর্তের মধ্যেই বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এক অভিবাসীর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় যুক্ত হলো নতুন অধ্যায়। তিনি নির্বাচিত হলেন ক্যাম্পবেলটাউন সিটির ডেপুটি মেয়র।

ঘটনাটি ১ সেপ্টেম্বরের। কাউন্সিলের বিশেষ সভায় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লিন্ডি ডিৎজ রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। মাসুদ চৌধুরীর পক্ষে ভোট দেন ছয় লেবার কাউন্সিলর, দুই গ্রিন কাউন্সিলর জেডেন রিভেরা ও তাও ট্রিবেলস এবং কমিউনিটি ভয়েস অব অস্ট্রেলিয়ার মাসুদ খলিল। এক বছরের জন্য ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হন মাসুদ চৌধুরী। একই সভায় ডারসি লাউন্ড বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আরও দুই বছরের জন্য মেয়র নির্বাচিত হন। তিনি দায়িত্বে থাকবেন ২০২৮ সালের পরবর্তী স্থানীয় সরকার নির্বাচন পর্যন্ত।

মাসুদ চৌধুরীর জন্য এ অর্জন হঠাৎ পাওয়া কোনো রাজনৈতিক পদ নয়। এর পেছনে রয়েছে প্রায় চার দশকের অস্ট্রেলিয়া জীবন এবং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার গল্প। ২০১৬ সালে প্রথমবার ক্যাম্পবেলটাউন সিটি কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে টানা কাউন্সিলে রয়েছেন তিনি। ২০২১ সালে পুনর্নির্বাচিত হন, আবার ২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে জয় পান। কাউন্সিলের সরকারি তথ্যেও তাঁর প্রথম নির্বাচনের বছর হিসেবে ২০১৬ উল্লেখ রয়েছে। এবারের ডেপুটি মেয়র পদটি তাঁর জন্য প্রথম। তবে তাঁর অস্ট্রেলিয়ার গল্প শুরু হয়েছিল কাউন্সিল চেম্বার কিংবা রাজনীতির মঞ্চে নয়, রেস্তোরাঁর কিচেনে।

অস্ট্রেলিয়ায় আসার পর সিডনির সারি হিলসে থাকতেন মাসুদ চৌধুরী। কাজ শুরু করেছিলেন রেস্তোরাঁয় কিচেন হ্যান্ড হিসেবে। পরে ওয়েটারের কাজও করেছেন। তখন বয়স মাত্র ২৩। বাংলাদেশে থাকতেই রাজনীতির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তাঁর। ১৯৮৯ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ান লেবার পার্টির সদস্য হন। সম্প্রতি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম South West Voice-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই শুরুর দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, শ্রমজীবী মানুষ ও অভিবাসীদের জীবনকে ভালো করার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক আছে বলেই লেবার পার্টির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কিচেন হ্যান্ড থেকে কাউন্সিলর, আর সেখান থেকে ডেপুটি মেয়র, এই পথ পেরোতে সময় লেগেছে প্রায় চার দশক।

গত ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে ক্যাম্পবেলটাউনই তাঁর আবাস। আর কাউন্সিলর হিসেবে ১০ বছর পূর্ণ করার সময় স্থানীয় সংবাদমাধ্যম তাঁকে বর্তমান কাউন্সিলের অন্যতম অভিজ্ঞ সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। মেয়র ডারসি লাউন্ড ও কাউন্সিলর মেগ ওটস তাঁর চেয়ে বেশি সময় কাউন্সিলে আছেন, আর কারেন হান্ট তাঁরই সঙ্গে ২০১৬ সালে প্রথম নির্বাচিত হয়েছিলেন।

মাসুদ চৌধুরী এমন একটি শহরের ডেপুটি মেয়র হয়েছেন, যেখানে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি এখন আর ছোট কোনো সংখ্যা নয়। ২০২১ সালের অস্ট্রেলিয়ান আদমশুমারি অনুযায়ী ক্যাম্পবেলটাউন লোকাল গভর্নমেন্ট এলাকায় বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৫০৪, যা মোট জনসংখ্যার ৩ দশমিক ১ শতাংশ। ভারতের পর বাংলাদেশই ছিল এখানকার বিদেশে জন্ম নেওয়া বাসিন্দাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসদেশ। তবে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের প্রকৃত উপস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে ভাষার হিসাবটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাড়িতে বাংলা ভাষায় কথা বলেন। আদমশুমারিতে এমন মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে সাত হাজার, আর ইংরেজির পাশাপাশি বিভিন্ন মাতৃভাষা ব্যবহার করেন এলাকার ৪০ শতাংশেরও বেশি বাসিন্দা। অর্থাৎ যে কাউন্সিলের নেতৃত্বে মাসুদ চৌধুরী জায়গা পেলেন, সেটি নিজেই আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক চরিত্রের এক শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি।

সেই বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে বাংলাদেশি কমিউনিটির সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। কাউন্সিলের নথিতে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ক্যাম্পবেলটাউন সিভিক সেন্টারে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন থেকে শুরু করে বাংলা শিল্প প্রদর্শনী, বাংলাদেশি কমিউনিটির অনুষ্ঠান এবং নানা বহুসাংস্কৃতিক আয়োজনে মাসুদ চৌধুরী নিয়মিত যুক্ত ছিলেন। ২০১৯ সালের একটি কাউন্সিল নথিতে উল্লেখ রয়েছে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া অস্ট্রেলিয়ার প্রথম কাউন্সিল ছিল ক্যাম্পবেলটাউন। ২০২৪ সালে মাসুদ চৌধুরী ও কাউন্সিলর মাসুদ খলিলের প্রস্তাবের পর ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের আয়োজন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তও নেয় কাউন্সিল।

ডেপুটি মেয়রের পদটি শুধু আনুষ্ঠানিক সম্মানেরও নয়। নিউ সাউথ ওয়েলসের Local Government Act 1993 অনুযায়ী কাউন্সিলররাই নিজেদের মধ্য থেকে ডেপুটি মেয়র নির্বাচন করেন। মেয়র অনুপস্থিত থাকলে, অসুস্থ হলে, দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে কিংবা মেয়রের পদ সাময়িকভাবে শূন্য হলে ডেপুটি মেয়র মেয়রের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ক্যাম্পবেলটাউন সিটি কাউন্সিলে ১৫ জন নির্বাচিত কাউন্সিলর রয়েছেন এবং তাঁদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এক হাজারের বেশি কর্মী কাজ করেন। রাস্তা, পার্ক, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা, কমিউনিটি সুবিধা, সংস্কৃতি ও স্থানীয় উন্নয়নসহ নাগরিক জীবনের বহু ক্ষেত্রেই এই স্থানীয় সরকারের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ক্যাম্পবেলটাউনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল। ১৫ সদস্যের কাউন্সিলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তিনজন নির্বাচিত হন, মাসুদ চৌধুরী, মাসুদ খলিল এবং আশিকুর ‘অ্যাশ’ রহমান। নতুন কাউন্সিলের প্রথম সভায় তাঁদের অভিনন্দন জানাতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি উপস্থিত হয়েছিলেন। দুই বছর পর সেই একই কাউন্সিলের নেতৃত্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসনে বসলেন তাঁদেরই একজন।

১ সেপ্টেম্বর রাতে ভোট শেষ হওয়ার পর দর্শক গ্যালারিতে উপস্থিত বাংলাদেশিদের আনন্দ তাই শুধু একজন পরিচিত মানুষের নতুন পদ পাওয়ার আনন্দ ছিল না। তাঁদের অনেকের কাছে এটি ছিল অভিবাসী জীবনের একটি পরিচিত গল্পের আরেকটি পরিণতি। যে মানুষটি তরুণ বয়সে নতুন দেশে এসে রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে কাজ দিয়ে জীবন শুরু করেছিলেন, তিনিই কয়েক দশক পর সেই শহরের নাগরিক নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান আসনে বসেছেন।

তথ্যসূত্র: Campbelltown City Council

Back to top button