সম্পাদকের পাতা

এক টিকিটে বিমানবন্দরের লাউঞ্জে এক বছরে ৩০০ বার ফ্রি খেয়েছিলেন যে যাত্রী

নজরুল মিন্টো

বিমানবন্দরের ব্যস্ততা আর কোলাহলের মধ্যেও ফার্স্ট-ক্লাস যাত্রীদের জন্য থাকে এক আলাদা জগৎ। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চেক-ইন করার ঝামেলা কম, অনেক বিমানবন্দরে থাকে অগ্রাধিকারভিত্তিক নিরাপত্তা পরীক্ষা, আর বিমানে ওঠার আগে অপেক্ষার সময়টুকু কাটে আরামদায়ক লাউঞ্জে। সেখানে থাকে সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন, কাজ করার জায়গা, খাবারের বুফে, পানীয়, কখনো গোসল বা বিশ্রামের ব্যবস্থাও থাকে। দীর্ঘ যাত্রার আগে একজন ফার্স্ট-ক্লাস যাত্রী সেখানে বসে খান, বিশ্রাম নেন, তারপর সময় হলে উঠে গিয়ে বিমানে চড়েন। এমনটাই নিয়ম।

চীনের শানসি প্রদেশের শি’আন বিমানবন্দরে এক যাত্রী সেই নিয়মের শেষ অংশটুকুই যেন বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর হাতে ছিল China Eastern Airlines-এর ফার্স্ট-ক্লাস টিকিট। ফলে অন্য ফার্স্ট-ক্লাস যাত্রীদের মতো তিনিও বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে প্রবেশ করতে পারতেন, সেখানে বসে খাবার ও পানীয় নিতে পারতেন এবং বিমানে ওঠার আগের সময়টুকু আরামে কাটাতে পারতেন। সবকিছুই ছিল নিয়মমাফিক। শুধু সমস্যা হলো, তাঁর বিমানে ওঠার যেন কোনো তাড়াই ছিল না।

প্রথমবার তাঁকে দেখে কারও আলাদা করে নজর দেওয়ার কারণ ছিল না। তিনি বিমানবন্দরে আসেন, ফার্স্ট-ক্লাস যাত্রীর মতো লাউঞ্জে ঢোকেন, খাবার খান, কিছুক্ষণ সময় কাটান। তারপর নির্ধারিত ফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে এলে অন্য যাত্রীরা যখন গেটের দিকে এগিয়ে যান, তখন তিনি উল্টো নিজের যাত্রার তারিখ বদলে দেন। সেদিন আর বিমানে ওঠেন না। ফ্লাইটটি পরের দিনের জন্য সরিয়ে দিয়ে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যান।

পরদিন তিনি আবার আসেন। হাতে সেই টিকিট, শুধু তারিখটি নতুন। আবার লাউঞ্জে ঢুকেন, আবার খাবার খান, আবার আরাম করে সময় কাটান। তারপর বিমানে ওঠার সময় এলে আবারও যাত্রার তারিখ পিছিয়ে দিয়ে তিনি চলে যান।

এরপর ব্যাপারটি আর একটি বা দুটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। একই দৃশ্য বারবার ঘটতে থাকল। তিনি বিমানবন্দরে আসতেন, লাউঞ্জে ঢুকতেন, খাবার খেতেন, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেন, তারপর যাত্রার তারিখ বদলে চলে যেতেন। পরদিন কিংবা পরবর্তী নির্ধারিত দিনে আবার ফিরে আসতেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, একজন ফার্স্ট-ক্লাস যাত্রী বারবার তাঁর সফরের পরিকল্পনা বদলাচ্ছেন। কিন্তু ভেতরের গল্পটি ছিল একেবারেই অন্য রকম।

২০১৪ সালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি একই টিকিটের যাত্রার তারিখ এভাবে তিনশোরও বেশি বার পরিবর্তন করেছিলেন। অর্থাৎ, যে টিকিটটি কেনা হয়েছিল একবার বিমানে উঠে একটি গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য, সেটিকেই তিনি প্রায় এক বছর ধরে ব্যবহার করছিলেন বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে প্রবেশের চাবি হিসেবে।

এখানেই ঘটনাটির মজাটা আরও বাড়ে। তিনি কোনো নকল টিকিট ব্যবহার করছিলেন না, কারও পরিচয়ও ধার করেননি, নিরাপত্তা ফাঁকি দিয়ে লাউঞ্জে ঢোকারও প্রয়োজন হয়নি। তাঁর হাতে ছিল বৈধ ফার্স্ট-ক্লাস টিকিট, আর সেই টিকিটের কারণেই তিনি লাউঞ্জ ব্যবহারের অধিকার পাচ্ছিলেন। একই সঙ্গে টিকিটে যাত্রার তারিখ পরিবর্তনের সুযোগ ছিল। তিনি শুধু এই দুটি সুবিধাকে এমনভাবে একসঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন, যেভাবে ব্যবস্থাটি তৈরি করার সময় সম্ভবত কেউ কল্পনাও করেনি।

একটি নিয়ম বলছে, ফার্স্ট-ক্লাস যাত্রী লাউঞ্জে ঢুকতে পারবেন। আরেকটি নিয়ম বলছে, নির্দিষ্ট শর্তে যাত্রার তারিখ পরিবর্তন করা যাবে। লোকটি বুঝে গিয়েছিলেন, বিমানে না উঠেও যদি পরের দিনের জন্য টিকিটটি বৈধ রাখা যায়, তাহলে লাউঞ্জের দরজাও আবার খুলে যাবে। ফলে তাঁর কাছে ফার্স্ট-ক্লাস টিকিটটি ধীরে ধীরে আকাশে ওড়ার কাগজের চেয়ে বিনামূল্যে খাবারের এক অদ্ভুত পাসে পরিণত হয়েছিল।

এভাবে দিনের পর দিন কেটে যেতে লাগল। একই বিমান সংস্থা, একই টিকিট, একই যাত্রী, শুধু যাত্রার তারিখটি বারবার বদলে যাচ্ছে। প্রথম কয়েকবার বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে না-ও হতে পারে। মানুষের পরিকল্পনা বদলায়, সফর পিছিয়ে যায়, জরুরি কাজ পড়ে। কিন্তু যখন পরিবর্তনের সংখ্যা কয়েক ডজন পেরিয়ে শতকের ঘরে পৌঁছায়, তখন একটি প্রশ্ন অবধারিত হয়ে ওঠে, এই মানুষটি আসলে কোথায় যেতে চাইছেন?

শেষ পর্যন্ত China Eastern Airlines-এর একজন কর্মীর নজরে পড়ে বিষয়টি। একই টিকিটের যাত্রার তারিখ অস্বাভাবিক সংখ্যকবার পরিবর্তিত হয়েছে। খোঁজ নিতে গিয়ে ধীরে ধীরে সামনে আসে পুরো কাহিনি। ওই যাত্রী বারবার বিমানবন্দরে আসছেন, ফার্স্ট-ক্লাস লাউঞ্জের সুবিধা নিচ্ছেন, কিন্তু ফ্লাইটের সময় এলেই যাত্রা পিছিয়ে দিচ্ছেন।

বিমান সংস্থা যখন তাঁর কৌশলটি বুঝতে পারল, তত দিনে তিনি প্রায় এক বছর ধরে তাদের অতিথি হয়ে লাউঞ্জের সুবিধা নিয়েছেন। গল্পটি এখানেই শেষ হলেও যথেষ্ট বিস্ময়কর হতো। একটি ফার্স্ট-ক্লাস টিকিট কিনে একজন মানুষ শত শতবার বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে খাবার খেলেন, অথচ কোনোদিন সেই ফ্লাইটে উঠলেন না। কিন্তু শেষ চমকটি তখনো বাকি ছিল।

টিকিটটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তিনি সেটি বাতিল করে দিলেন এবং টিকিটের অর্থও ফেরত পেলেন। অর্থাৎ এত দিনের এই অদ্ভুত যাত্রায় তিনি কোথাও উড়ে যাননি। কোনো দূর শহরে নামেননি, কোনো আকাশপথ পাড়ি দেননি। তাঁর দীর্ঘ সফরটি সীমাবদ্ধ ছিল বাড়ি থেকে বিমানবন্দর, বিমানবন্দর থেকে ভিআইপি লাউঞ্জ এবং সেখান থেকে আবার বাড়ি ফেরার মধ্যে। অথচ এই যাতায়াতের মাঝেই তিনি তিনশোরও বেশি বার ফার্স্ট-ক্লাস যাত্রীর আতিথেয়তা নিয়ে গেছেন।

আর সব শেষে যে টিকিটটি প্রায় এক বছর ধরে তাঁর জন্য লাউঞ্জের দরজা খুলে দিয়েছিল, সেটিও বাতিল করে পুরো টাকাটা ফেরত নিয়ে চলে গেছেন।

তথ্যসূত্র:
The Star, Yangzi Evening News
নোট: ছবিটি AI দিয়ে তৈরি প্রতীকী চিত্র।

Back to top button