
টরন্টোর বিচেস ইস্ট ইয়র্কে ভোটগণনার রাতটি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল উৎসবের রাতে। ইলেকশনস কানাডার পর্দায় একের পর এক পোলের ফল উঠছিল, আর তার সঙ্গে বাড়ছিল লিবারেল প্রার্থী তানভীর শাহনাওয়াজের ব্যবধান। শুরুতে যে অপেক্ষা ছিল উদ্বেগের, রাত গড়াতে গড়াতে তা রূপ নেয় উচ্ছ্বাসে। শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত হয় তানভীরের। কানাডার হাউস অব কমন্সে দ্বিতীয় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি হিসেবে জায়গা করে নিলেন তিনি।
এই জয় শুধু একটি আসন ধরে রাখার ঘটনা নয়। কানাডার মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের দীর্ঘ পথচলায় এটি একটি নতুন মাইলফলক। বিচেস ইস্ট ইয়র্কের মানুষের আস্থা নিয়ে তিনি এখন যাচ্ছেন দেশের আইনসভায়, যেখানে কানাডার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়, তর্ক হয়, আইন তৈরি হয়।
সর্বশেষ প্রাথমিক ফলাফলে তানভীর শাহনাওয়াজ পেয়েছেন ১৮ হাজার ৩৬১ ভোট, অর্থাৎ ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশ। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনডিপির শ্যানন ডিভাইন পেয়েছেন ৮ হাজার ৫১২ ভোট বা ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ। কনজারভেটিভ প্রার্থী জিম সার্বোস পেয়েছেন ৫ হাজার ১১৬ ভোট বা ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। তানভীরের জয়ের ব্যবধান ৯ হাজার ৮৪৯ ভোট।
গ্রিন পার্টির ব্রুস লাইভসি পেয়েছেন ৫৭৩ ভোট বা ১ দশমিক ৭ শতাংশ। পিপলস পার্টির মিশেল লাশঁস পেয়েছেন ২৪৮ ভোট বা শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ এবং কানাডিয়ান ফিউচার পার্টির ক্যামেরন থমাস পেয়েছেন ১৬৩ ভোট বা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। মোট বৈধ ভোট পড়েছে ৩২ হাজার ৯৭৩টি। নিবন্ধিত ৮১ হাজার ৬৪২ ভোটারের মধ্যে ভোটার উপস্থিতি ৪০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ইলেকশনস কানাডা এখনও একে ‘প্রাথমিক ফলাফল’ হিসেবে দেখাচ্ছে, তবে সব পোলের গণনা সম্পন্ন হয়েছে।
তানভীরের সঙ্গে এই এলাকার সম্পর্ক কেবল নির্বাচনের সময়ের নয়। ক্রিসেন্ট টাউন এলাকায় তাঁর বেড়ে ওঠা। এখানেই তিনি মানুষের ঘনিষ্ঠ জীবন, অভিবাসী পরিবারগুলোর লড়াই এবং স্থানীয় নাগরিক সমস্যাগুলো কাছ থেকে দেখেছেন। সাবেক এমপি নাথানিয়েল আর্সকিন স্মিথের কার্যালয়ে কাজ করার সময় এলাকার মানুষের নানা প্রত্যাশা ও প্রয়োজনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় আরও গভীর হয়। স্থানীয় কমিউনিটির বিভিন্ন উদ্যোগেও তিনি যুক্ত ছিলেন। ফলে নির্বাচনী লড়াইয়ে তিনি শুধু একটি দলের প্রার্থী নন, এলাকার পরিচিত এক মুখ হিসেবেও ভোটারদের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন।
আর্সকিন স্মিথ পদত্যাগ করায় আসনটি শূন্য হলে লিবারেল পার্টি তানভীরকে প্রার্থী করে। গত বছরের সাধারণ নির্বাচনে আর্সকিন স্মিথ ৩৯ হাজার ৮০৪ ভোট পেয়ে ৬৭ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। উপনির্বাচনে সেই শক্ত লিবারেল আসন ধরে রাখার দায়িত্ব এসে পড়ে তানভীরের কাঁধে। তিনি সেই দায়িত্ব পালন করলেন এমন এক সময়ে, যখন কানাডার রাজনীতিতে প্রতিটি উপনির্বাচনের ফল জাতীয় রাজনীতির দিকেও আলাদা নজর কাড়ছে।
এবারের প্রাথমিক ফলাফলে এনডিপির ভোটের হারও বেড়েছে। গত সাধারণ নির্বাচনে দলটি এই আসনে তৃতীয় হয়েছিল ৬ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট নিয়ে। এবার শ্যানন ডিভাইনের প্রাপ্ত ভোট সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। তবু লিবারেলদের জয় নিয়ে কোনো সংশয় থাকেনি। বিচেস ইস্ট ইয়র্কে পুরোনো ভোটভিত্তির ওপর তানভীর নতুন করে আস্থার পরীক্ষা দিয়েছেন।
বিচেস ইস্ট ইয়র্কের পাশাপাশি কুইবেকের শিকুতিমি লে ফিয়র্ড এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার নর্থ ভ্যাঙ্কুভার ক্যাপিলানো আসনেও লিবারেল প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। শিকুতিমি লে ফিয়র্ডে ২০২৫ সালে অল্প ব্যবধানে কনজারভেটিভদের হাতে যাওয়া আসনটি এবার লিবারেলদের দখলে ফিরেছে। তিনটি উপনির্বাচনেই জয়ের ফলে হাউস অব কমন্সে লিবারেলদের আসন বেড়ে দাঁড়াল ১৭৩টিতে, যা ৩৪৩ সদস্যের কক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমার চেয়ে এক বেশি। ফলে মার্ক কার্নির সরকার আরও শক্তিশালী অবস্থানে গেল।
রাত সাড়ে ১০টা থেকে তানভীরের সেলিব্রেশন পার্টিতে দলীয় সমর্থক এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষ দলে দলে আসতে থাকেন। অল্প সময়ের মধ্যেই অডিটোরিয়ামসহ আশপাশের পুরো এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। করতালি, উল্লাস আর অভিনন্দনের ভিড়ে সেখানে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। একটি নির্বাচনী রাত তখন যেন বাংলাদেশি কমিউনিটিরও আনন্দের রাতে পরিণত হয়।
বিজয় ভাষণে তানভীর শাহনাওয়াজ বলেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান নিয়ে তিনি বিচেস ইস্ট ইয়র্কের প্রতিনিধিত্ব করতে পার্লামেন্টে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় নেতা মার্ক কার্নি, লিবারেল পার্টির নেতা-কর্মী, ভোটার এবং তাঁর সব শুভানুধ্যায়ীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। প্রচারণার দিনগুলোতে যাঁরা ঘরে ঘরে গেছেন, ফোন করেছেন, সভা করেছেন কিংবা নীরবে পাশে থেকেছেন, তাঁদেরও ধন্যবাদ জানিয়ে বিচেস ইস্ট ইয়র্কের প্রতিটি মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার অঙ্গীকার করেন তানভীর।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী ও লিবারেল পার্টির নেতা মার্ক কার্নি তানভীর শাহনাওয়াজকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “Congratulations, Tanveer Shahnawaz. The next Member of Parliament for Beaches—East York.” তানভীর তাঁর কমিউনিটিকে জানেন, তাদের জন্য লড়েন এবং কাজ করে ফল আনেন বলেও মন্তব্য করেন কার্নি। তাঁর ভাষায়, তানভীরকে সঙ্গে নিয়ে অন্টারিও ও কানাডাকে সবার জন্য আরও শক্তিশালী করে গড়া হবে।
তাঁর বিজয়ের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে টরন্টোর বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। ফেসবুক অভিনন্দনের বার্তায় ভরে যায়। কানাডার বিভিন্ন প্রান্তের বাংলাদেশিরা ছবি, ভিডিও ও শুভেচ্ছাবার্তা পোস্ট করে তাঁকে অভিনন্দন জানান। বহু মানুষের কাছে এটি শুধু একজন প্রার্থীর জয় নয়, দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, শিক্ষা, সমাজসেবা এবং নতুন প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসের স্বীকৃতি। কানাডার মতো বহুজাতিক দেশে নিজের পরিচয় নিয়ে মূলধারার রাজনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার পথ যে আরও উন্মুক্ত হচ্ছে, তানভীরের জয় সেই বিশ্বাসকে শক্ত করল।
এই আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস। গত ১৩ এপ্রিল স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসনের উপনির্বাচনে লিবারেল প্রার্থী হিসেবে ২০ হাজার ১২১ ভোট পেয়ে জয়ী হন ডলি বেগম। তাঁর কয়েক মাসের মাথায় বিচেস ইস্ট ইয়র্ক থেকে নির্বাচিত হলেন তানভীর শাহনাওয়াজ। কানাডার হাউস অব কমন্সে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপির সংখ্যা দাঁড়াল দু’জনে।
তানভীর শাহনাওয়াজের এই জয় শুধু আজকের আনন্দের খবর নয়, আগামী দিনের জন্যও এক শক্তিশালী অনুপ্রেরণা। এই পথ ধরে আরও বাংলাদেশি তরুণ-তরুণী কানাডার মূলধারার রাজনীতিতে অংশ নেবেন এবং বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে আরও উজ্জ্বল করে তুলবেন। তানভীরের এই বিজয় তাই একটি আসন জয়ের চেয়েও বেশি, নতুন প্রজন্মের সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এনএন/ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬







