সম্পাদকের পাতা

নিউইয়র্কে বাংলাদেশি ইউসুফসহ দুজনকে হত্যার সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার

নজরুল মিন্টো

এক শহর, দুই বরো, দুই রাত এবং প্রায় ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই মৃত্যু। প্রথমে ব্রুকলিনের একটি ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টে ঢুকে গুলি। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলেন ৪৪ বছর বয়সী বাংলাদেশি প্রবাসী মোহাম্মদ ইউসুফ। তাঁর সহকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েও প্রাণে বেঁচে যান। দুদিন পর ব্রঙ্কসের একটি দোকানে আবার একই দৃশ্য। এবার গুলিতে মারা গেলেন ৩৩ বছর বয়সী এক ক্রেতা। দুই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ মিলিয়ে পুলিশ যখন একই ব্যক্তির দিকে আঙুল তুলল, তখন শুরু হলো নিউইয়র্কজুড়ে খোঁজ। সেই খোঁজ শেষ হয়েছে শনিবার সকালে। নিউইয়র্ক পুলিশ জানিয়েছে, দুই হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ৩১ বছর বয়সী জেসুস অ্যাকোস্টাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

কয়েক দিন ধরে তার ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল শহরজুড়ে। পুলিশের পাশাপাশি মাঠে নামে এফবিআই। কোথাও তার সন্ধান মিললে জানাতে বলা হয় সাধারণ মানুষকে। এফবিআই ঘোষণা করে ২৫ হাজার ডলারের পুরস্কার। ইউনাইটেড বোদেগাস অব আমেরিকা আরও ১০ হাজার ডলার যোগ করে। সব মিলিয়ে তার মাথার ওপর পুরস্কার দাঁড়িয়েছিল ৩৫ হাজার ডলার। শেষ পর্যন্ত শনিবার সকালে অ্যাকোস্টাকে হেফাজতে নেয় এনওয়াইপিডি। তবে কোথা থেকে তাকে ধরা হয়েছে এবং গ্রেপ্তারের সময় কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে শনিবার বিকেল পর্যন্ত পুলিশ বিস্তারিত জানায়নি। তার বিরুদ্ধে ঠিক কোন কোন অভিযোগ আনা হয়েছে, সেই পূর্ণ তালিকাও তখন প্রকাশ করা হয়নি।

এই গ্রেপ্তারের সূত্রপাত ব্রুকলিনের ব্রাউনসভিল থেকে। গত ২৩ আগস্ট, রোববার রাত পেরিয়ে মধ্যরাতের কিছু পর। ৮৪২ রকওয়ে অ্যাভিনিউয়ের ‘আমেরিকান বেস্ট উইংস অ্যান্ড পিৎজা’ রেস্টুরেন্টে তখন কাজ করছিলেন মোহাম্মদ ইউসুফ ও তাঁর বন্ধু-সহকর্মী মোহাম্মদ রাসেল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যাকোস্টা রেস্টুরেন্টে ঢুকে প্রথমে রাসেলের পায়ে গুলি করে। এরপর ইউসুফের মাথায় গুলি চালায়। পরে রেস্টুরেন্ট থেকে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় সে। ইউসুফকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি।

গুলিবিদ্ধ রাসেল পরে ABC7 New York-কে সেই রাতের ভয়ংকর মুহূর্তের কথা জানান। তাঁর উরুতে গুলি লেগেছিল এবং প্রতিবেদন প্রকাশের সময়ও গুলিটি তাঁর শরীরে ছিল। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি মেঝেতে পড়ে মৃতের ভান করেন। বন্দুকধারী কাছে এসে তাঁকে পরীক্ষা করেছিল বলেও জানান রাসেল। তাঁর ধারণা, তিনি মারা গেছেন ভেবেই হামলাকারী তাঁকে আর গুলি করেনি। সেই কয়েক মুহূর্তের অভিনয়ই সম্ভবত তাঁর জীবন বাঁচিয়ে দেয়। কিন্তু পাশে পড়ে থাকা বন্ধু ইউসুফ আর উঠতে পারেননি।

স্থানীয় মার্কিন গণমাধ্যমে নিহতের নাম কখনও MD Yousuf, কখনও MD Yousef বা MD Yousof হিসেবে লেখা হয়েছে। পরিবারের তথ্য ও বাংলাদেশি কমিউনিটির সূত্রে তাঁর পূর্ণ নাম মোহাম্মদ ইউসুফ রাজু। তিনি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের কংশনগর এলাকার বাসিন্দা। প্রায় তিন বছর আগে পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলানোর আশায় ৩০ লাখ টাকা খরচ করে মেক্সিকো সীমান্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। দেশে থাকা পরিবারটি তাঁর আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গণমাধ্যম এবং তাঁর পরিবারের জন্য খোলা তহবিল সংগ্রহের পৃষ্ঠায় তাঁকে দুই কন্যাসন্তানের জনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মেয়েদের বয়স ১২ ও ৩ বছর।

ইউসুফ হত্যার তদন্ত তখনও চলছিল। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করছিল, প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলছিল। কিন্তু মাত্র দুদিন পরই নিউইয়র্কের আরেক প্রান্তে একই ধরনের আরেকটি ঘটনা তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

২৫ আগস্ট মঙ্গলবার রাত ১২টা ১৬ মিনিটের দিকে ব্রঙ্কসের ইস্ট ১৪৯তম স্ট্রিট ও ওয়ালটন অ্যাভিনিউয়ের কাছে ‘149 Grill & Deli’-তে ঢোকে এক বন্দুকধারী। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দোকানে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই সে অস্ত্র বের করে এক ক্রেতাকে গুলি করে। গুলিবিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন ৩৩ বছর বয়সী টেভন শুলার। গুলি লাগে তাঁর বুকে। এরপর বন্দুকধারী কাউন্টারের পেছনে গিয়ে ক্যাশ রেজিস্টার থেকে টাকা নেয় এবং পালিয়ে যায়। শুলারকে লিংকন হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরে তাঁর মৃত্যু হয়।

এরপর দুটি ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ মিলিয়ে দেখতে শুরু করে পুলিশ। পোশাক, শারীরিক গঠন, চলাফেরা এবং অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে তদন্তকারীরা ৩১ বছর বয়সী ব্রঙ্কসের বাসিন্দা জেসুস অ্যাকোস্টাকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করেন।

পুলিশের কাছে অ্যাকোস্টা একেবারে অপরিচিত নাম ছিল না। তার পুরোনো অপরাধের রেকর্ডও এবার নতুন করে সামনে আসে।

ABC7-এর তথ্য অনুযায়ী, অ্যাকোস্টা এর আগে ১৩ বার গ্রেপ্তার হয়েছে। তার অপরাধের শুরু কিশোর বয়সেই। মাত্র ১৪ বছর বয়সে সশস্ত্র ডাকাতির ঘটনায় প্রথমবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

এই দুই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ব্রুকলিনের ঘটনাটি নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য আলাদা এক বেদনা হয়ে আছে। ইউসুফ ছিলেন রাতের শিফটে কাজ করা একজন অভিবাসী শ্রমজীবী মানুষ। পরিবারের জন্য আয় করতেন, দেশে টাকা পাঠাতেন, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছিলেন। অথচ কর্মস্থলে কয়েক সেকেন্ডের বন্দুক হামলায় সেই জীবন থেমে যায়।

তথ্যসূত্র:
ABC7 New York
Spectrum News NY1


Back to top button
🌐 Read in Your Language