সম্পাদকের পাতা

যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্রে লেক অন্টারিওর নাম ‘লেক আমেরিকা’ করলেন ট্রাম্প

নজরুল মিন্টো

শুল্কের লড়াই শেষ পর্যন্ত মানচিত্রে এসে ঠেকল। কানাডার পণ্যে একের পর এক শুল্ক, কানাডার পাল্টা শুল্কের ঘোষণা, তারপর কয়েক দিনের তীব্র বাকযুদ্ধ। বৃহস্পতিবার সেই সংঘাত নতুন এক জায়গায় নিয়ে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে বসে নির্বাহী আদেশে সই করে তিনি ‘Lake Ontario’ জলরাশিটির নাম দিলেন ‘Lake America’। কয়েক দিন আগে যে কথাটি ছিল তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হুমকি, ২৭ আগস্ট সেটিই পরিণত হলো যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সিদ্ধান্তে।

আদেশটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ৩০ দিনের মধ্যে U.S. Board on Geographic Names-এর সঙ্গে সমন্বয় করে কেন্দ্রীয় সরকারের মানচিত্র, নথি, চুক্তিপত্র এবং সরকারি যোগাযোগেও নতুন নাম ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের চোখে লেক অন্টারিও এখন ‘লেক আমেরিকা’।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নথিতে নাম বদলালেও লেকটির আন্তর্জাতিক পরিচয় কিংবা সীমান্ত বদলে যাচ্ছে না। কারণ লেক অন্টারিও যুক্তরাষ্ট্রের একার জলরাশি নয়। এর উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম তীর কানাডার অন্টারিও প্রদেশে, দক্ষিণ ও পূর্ব তীর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে। আন্তর্জাতিক সীমারেখা লেকটির মাঝ দিয়ে চলে গেছে এবং জলপৃষ্ঠের প্রায় ৫২ শতাংশ কানাডার অংশে। ফলে ওয়াশিংটন তার নিজস্ব সরকারি ব্যবস্থায় নতুন নাম ব্যবহার করতে পারলেও অটোয়া সেটি মানতে বাধ্য নয়।

অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড CBS News-কে বলেন, ট্রাম্প চাইলে একে Lake America, এমনকি Lake Trump-ও বলতে পারেন, কিন্তু কানাডায় এটি Lake Ontario-ই থাকবে।

টরন্টোর মেয়র অলিভিয়া চাওয়ের প্রতিক্রিয়া ছিল আরও সরাসরি। লেকটির কানাডীয় তীরের সবচেয়ে বড় শহরের মেয়র হিসেবে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ ‘প্রতিবেশীসুলভ’ নয়।

নাম নিয়ে এত রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হলেও লেক অন্টারিও নিজেই উত্তর আমেরিকার এক বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জলভাণ্ডার। এটি পাঁচটি গ্রেট লেকের মধ্যে জলপৃষ্ঠের আয়তনে সবচেয়ে ছোট, কিন্তু এর বিস্তার প্রায় ১৮ হাজার ৯৬০ বর্গকিলোমিটার। পানির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৬৪০ ঘনকিলোমিটার। গড় গভীরতা ৮৬ মিটার এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ২৪৪ মিটার, যা প্রায় ৮০০ ফুট। কানাডীয় কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, এটি গ্রেট লেকসের তৃতীয় গভীরতম হ্রদ। এর প্রায় ১ হাজার ১৪৬ কিলোমিটার তীররেখার পাশে গড়ে উঠেছে উত্তর আমেরিকার কয়েকটি বড় নগর ও শিল্পাঞ্চল।

লেকটির কানাডীয় তীরে রয়েছে টরন্টো, হ্যামিল্টন, ওশাওয়া, কিংস্টন, বেলভিল, সেন্ট ক্যাথারিনস ও নায়াগ্রা অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ। মার্কিন পাশে রয়েছে রচেস্টার, ওসওয়েগো ও নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন শহর। গ্রেট লেকসের পানি পশ্চিম থেকে একটির পর একটি জলপথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত লেক অন্টারিওতে এসে পৌঁছায়। লেক এরির পানি নায়াগ্রা নদী ও নায়াগ্রা জলপ্রপাত পেরিয়ে এখানে আসে, এরপর লেক অন্টারিও থেকে পানি সেন্ট লরেন্স নদী দিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ এটি শুধু একটি সীমান্তবর্তী লেক নয়, গ্রেট লেকস থেকে আটলান্টিক পর্যন্ত বিস্তৃত উত্তর আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথের শেষ বড় হ্রদ।

এই অভিন্ন জলরাশির ব্যবস্থাপনাও শতাব্দীর পুরোনো কানাডা-মার্কিন ব্যবস্থার অংশ। ১৯০৯ সালের Boundary Waters Treaty দুই দেশের সীমান্তবর্তী জলরাশি ব্যবহারের ভিত্তি তৈরি করে এবং এর অধীনেই International Joint Commission কাজ করে। ফলে কোনো দেশের সরকারি মানচিত্রে নাম পরিবর্তন হলেও লেকটির আন্তর্জাতিক সীমা, পানির প্রবাহ, নৌচলাচল কিংবা দুই দেশের অধিকার ও দায়িত্বে এর মাধ্যমে কোনো পরিবর্তন আসে না।

ট্রাম্প অবশ্য তাঁর নির্বাহী আদেশে যৌথ মালিকানার ইতিহাসের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবদানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের দাবি, গ্রেট লেকস অঞ্চলে নৌচলাচল সচল রাখা, নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অনেক বড়। আদেশে বলা হয়েছে, গ্রেট লেকসে চলাচলকারী ১১টি আইসব্রেকারের মধ্যে ৯টিই পরিচালনা করে U.S. Coast Guard। গত এক দশকে গ্রেট লেকসের স্বাদুপানির পরিবেশ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে বলেও দাবি করা হয়েছে। লেক অন্টারিওর গভীরতম অংশ যুক্তরাষ্ট্রের দিকে হওয়ায় লেকটির মোট পানির বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বলে হোয়াইট হাউসের যুক্তি। এসব কারণ দেখিয়েই ট্রাম্প প্রশাসন জলরাশিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস, বাণিজ্য, বসতি ও প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে তুলে ধরেছে।

কিন্তু ‘Ontario’ নামের ইতিহাস বর্তমান দুই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সীমারেখার চেয়েও অনেক পুরোনো। নামটির শিকড় উত্তর আমেরিকার আদিবাসী Iroquoian ভাষাগোষ্ঠীতে। অন্টারিও সরকারের তথ্যে ‘Ontario’ শব্দটির উৎস Iroquois শব্দ ‘kanadario’, যার অর্থ ‘sparkling water’; প্রদেশটির পুরোনো সরকারি নথিতে Mohawk ‘Oniatari’:io’ শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছে ‘beautiful lake’। অর্থাৎ নামটির সঙ্গে শুরু থেকেই জলরাশির সৌন্দর্য ও পানির সম্পর্ক রয়েছে।

নামের ইতিহাস আরও পেছনে নিয়ে যায় পুরোনো মানচিত্র। গ্রেট লেকসের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা ইতিহাসবিদ মেরি ব্যাক্সটারের তথ্য অনুযায়ী, ১৬৫৬ সালের একটি মানচিত্রে ‘Lake Ontario’ নাম ব্যবহারের সবচেয়ে পুরোনো পরিচিত নজির পাওয়া যায়। ফরাসি শাসনের বিভিন্ন সময়ে লেকটিকে Lac St-Louis ও Lac Frontenac-সহ আরও কয়েকটি নামেও ডাকা হয়েছে, কিন্তু আঠারো শতকের মাঝামাঝি নাগাদ Lake Ontario নামটিই স্থায়ী হয়ে যায়। তখনো যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা হয়নি, কানাডাও আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠেনি। পরে এই লেকের নাম থেকেই অন্টারিও প্রদেশের নাম হয়, প্রদেশের নাম থেকে লেকটির নয়।

ভৌগোলিক নাম বদলের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এটি প্রথম পদক্ষেপ নয়। দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিন, ২০ জানুয়ারি ২০২৫, তিনি Gulf of Mexico-কে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যবহারে ‘Gulf of America’ নাম দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে U.S. Board on Geographic Names সেই নাম কেন্দ্রীয় সরকারের ডেটাবেসে অন্তর্ভুক্ত করে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীদের জন্য Google Maps-এও নতুন নাম দেখা যেতে শুরু করে, কিন্তু মেক্সিকো এবং বিশ্বের অধিকাংশ জায়গায় Gulf of Mexico নামই বহাল থাকে। Lake Ontario-র ক্ষেত্রেও একই ধরনের দ্বৈত নামের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

শুল্ক নিয়ে শুরু হওয়া কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বিরোধ তাই এবার মানচিত্রের নামেও পৌঁছাল। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দুই দেশের ইতিহাস, বাণিজ্য ও মানুষের জীবনকে যুক্ত করে রাখা এই জলরাশির বাস্তব ভূগোল বদলায়নি। তার মাঝ দিয়ে এখনও আন্তর্জাতিক সীমারেখা চলে গেছে, তার পানি এখনও নায়াগ্রা থেকে এসে সেন্ট লরেন্সের দিকে যায়, আর তার উত্তর-পশ্চিম তীরে এখনও দাঁড়িয়ে আছে টরন্টো।

ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নথিতে নাম বদলে দিতে পারেন। কিন্তু টরন্টোর তীর থেকে বিস্তৃত সেই নীল জলরাশি এখনও লেক অন্টারিও।

তথ্যসূত্র:
Reuters, Associated Press, Toronto Star


Back to top button
🌐 Read in Your Language