সম্পাদকের পাতা

বাঘের বাচ্চা অন্টারিও প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড

নজরুল মিন্টো

কানাডার সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ডকে নিয়ে বহু সমালোচনা আছে। তাঁর রাজনীতি ও সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েও অনেকের আপত্তি আছে। কিন্তু সোমবার তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যে ভাষায় জবাব দিয়েছেন, তারপর থেকে দেশজুড়ে কানাডীয়রা তাঁকে সাবাসি দিচ্ছেন। এমন জবাব ট্রাম্প হয়তো কল্পনাও করেননি। ফোর্ডের কঠোর পাল্টা আঘাতে ট্রাম্প এখন রীতিমতো বিচলিত।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বলে কি যা খুশি তাই বলা যায়? একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশকে দিনের পর দিন অপমান করা যায়? কখনো কানাডাকে আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর কথা বলা, কখনো কানাডার নেতৃত্বকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, কখনো শুল্কের ভয় দেখানো, আবার কখনো এমনভাবে কথা বলা যেন কানাডার অস্তিত্বই যুক্তরাষ্ট্রের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। এতদিন অনেকেই কূটনৈতিক ভাষায় এর উত্তর দিয়েছেন। ডাগ ফোর্ড এবার সেই অভিধানটাই বন্ধ করে দিয়েছেন।

ট্রাম্প যখন কানাডায় তৈরি গাড়ির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নতুন হুমকি দিলেন, ফোর্ড আর রাখঢাক করেননি। তাঁর জবাব, “Well, he can kiss my ass.” বাংলায় এর ভদ্র অনুবাদ করার কোনো প্রয়োজন আমি দেখি না। ফোর্ড ভদ্র ভাষায় কথাটা বলেননি। যে ভাষায় বলেছেন, সেই ভাষাতেই এর রাজনৈতিক গুরুত্ব। তিনি এরপর বলেছেন, “We need to throw everything in the kitchen sink at him. He’s arrogant. He’s cocky.” অর্থাৎ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে হাতে যা আছে, সবকিছু ব্যবহার করতে হবে। লোকটি উদ্ধত, অহংকারী।

ট্রাম্পও Truth Social-এ পাল্টা ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কানাডার নেতৃত্বকে আক্রমণ করে তিনি লিখলেন, বর্তমানে দেশটির রয়েছে “খারাপ নেতৃত্ব”। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে ব্যঙ্গ করে তিনি “Governor Carney” বলে সম্বোধন করেন এবং ডাগ ফোর্ডকে কার্নির “Flunky” বা “চামচা” বলে কটাক্ষ করেন। অর্থাৎ, কানাডার প্রধানমন্ত্রীকে একটি প্রদেশের গভর্নরের পর্যায়ে নামিয়ে এনে এবং অন্টারিওর প্রিমিয়ারকে তাঁর অনুগত চামচা হিসেবে তুলে ধরে ট্রাম্প কার্যত দুজনকেই অপমান করেছেন, যা নিঃসন্দেহে ভদ্রতার সীমা লঙ্ঘন করেছে।

ট্রাম্পের দাবি, “America has been carrying Canada for decades, but no longer.” অর্থাৎ, “দশকের পর দশক আমেরিকা কানাডাকে টেনে নিয়ে গেছে, কিন্তু আর নয়।” এখানেই থামেননি ট্রাম্প। তিনি আরও হুমকি দিয়ে বলেন, কানাডা যে বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাস পায়, তার বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই এই “clowns” বা “ভাঁড়দের” এখন “fall in line” বা লাইনে আসতে হবে, নইলে কানাডার জন্য পরিণতি হবে আরও ভয়াবহ।

এরপর ফোর্ডের পাল্টা জবাবটি আমার আরও পছন্দ হয়েছে। “I’m not going to take the bait. This guy’s a loser. I have more courage, more brains in my baby toe than he has in his whole body.” বাংলায় বললে, “আমি তার ফাঁদে পা দেব না। লোকটা একটা লুজার। আমার পায়ের কনিষ্ঠ আঙুলে তার পুরো শরীরের চেয়ে বেশি সাহস আর বেশি বুদ্ধি আছে।”

ব্যস! কখনো কখনো কূটনীতির উত্তর কূটনীতি দিয়ে দিতে হয়। আবার কখনো কখনো হুংকারের উত্তর হুংকার দিয়েই দিতে হয়। আমার মনে হয়, ট্রাম্প যে ভাষা সবচেয়ে ভালো বোঝেন, ফোর্ড এবার ঠিক সেই ভাষাতেই তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন।

ফোর্ড শুধু মুখেই হুংকার দেননি। তাঁর হুঁশিয়ারিও রীতিমতো ভয়ংকর। তিনি বলেছেন, অন্টারিও থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো বিদ্যুতের ওপর ২৫ শতাংশ সারচার্জ আবার আরোপের বিষয়টিও টেবিলে আছে। Critical minerals-এর প্রসঙ্গে তাঁর ভাষা আরও কঠিন, “I’ll cut them off. You won’t get a grain of sand out of Ontario.” অর্থাৎ প্রয়োজন হলে সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হবে। অন্টারিও থেকে এক দানা বালুও পাবে না যুক্তরাষ্ট্র।

তিনি আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথকে সঙ্গে নেওয়ার কথাও বলেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, আমেরিকা গাড়ি বানাবে, কিন্তু সেই গাড়ি চালানোর জ্বালানি কোথা থেকে পাবে? কানাডা তেল, গ্যাস, পটাশ, ইউরেনিয়াম, rare earth minerals নিয়ে বসে থাকবে আর ওয়াশিংটন কানাডার মাথায় শুল্কের হাতুড়ি মারতে থাকবে, এমনটা কেন হবে?

ফোর্ড বলেছেন, প্রয়োজনে পটাশ, ইউরেনিয়াম ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের জন্য আমেরিকাকে তিনগুণ দাম দিতে হবে। তাঁর বক্তব্য পরিষ্কার, “Nothing should be off the table.” কোনো কিছুই আলোচনার বাইরে থাকবে না। কথায় আছে, যেমন কুকুর তেমন মুগুর।

ট্রাম্প সম্ভবত ভুলে গেছেন, উত্তর আমেরিকার অর্থনীতি একমুখী রাস্তা নয়। কানাডা শুধু আমেরিকার বাজারের ওপর নির্ভর করে না, আমেরিকার শিল্প, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, কৃষি এবং উৎপাদন ব্যবস্থার বহু অংশও কানাডার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। দুই দেশের সরবরাহব্যবস্থা এতটাই আন্তঃসংযুক্ত যে সীমান্তের এক পাশে আঘাত করলে তার কম্পন অন্য পাশেও পৌঁছাবে।

আর তাই “America has been carrying Canada for decades” ধরনের কথাবার্তা রাজনৈতিক মঞ্চে হাততালি পেতে পারে, কিন্তু অর্থনীতির হিসাবের খাতায় বিষয়টি এত সরল নয়। তার চেয়েও মজার ব্যাপার, কানাডাকে “fall in line” করার কথা বলা হচ্ছে। অর্থাৎ লাইনে দাঁড়াও, নইলে পরিণতি খারাপ হবে! কানাডা কি কোনো স্কুলের অবাধ্য ছাত্র? আর ওয়াশিংটন কি তার প্রিন্সিপাল?

এই ঔদ্ধত্যের জবাব দেওয়ার সময় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে একটি অসম চুক্তিতে সই করেননি। কানাডাও পাল্টা শুল্কের প্রস্তুতি নিয়েছে। আর দেশের সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশের প্রিমিয়ার এখন বলছেন, প্রয়োজনে বিদ্যুৎ থেকে critical minerals পর্যন্ত সব অস্ত্রই টেবিলে থাকবে। একই সময়ে Angus Reid Institute-এর জরিপে ৭৬ শতাংশ কানাডীয় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা থেকে সরে আসা কানাডার সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। অর্থাৎ ফোর্ড কিংবা কার্নি একা নন, তাঁদের পেছনে দেশের একটি বড় জনমতও দাঁড়িয়ে আছে।

এটাই সম্ভবত ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে খারাপ খবর। কারণ তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, শুল্কের ভয় দেখালে কানাডা ভেঙে পড়বে। প্রদেশগুলো নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করবে। ব্যবসায়ীরা চাপ সৃষ্টি করবে। অটোয়া নতজানু হয়ে একটি অসম চুক্তিতে সই করবে। কিন্তু ঘটেছে উল্টোটা।

ট্রাম্প কানাডাকে ভয় দেখাতে গিয়ে কানাডার জাতীয় ঐক্যকে আরও শক্ত করে তুলছেন। একজন লিবারেল প্রধানমন্ত্রী এবং একজন কনজারভেটিভ প্রিমিয়ার এখন দেশের স্বার্থের প্রশ্নে একই সুরে কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন।

ট্রাম্প হয়তো আজ নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ ভাবছেন। তাঁর হাতে শুল্ক আছে, বিশাল বাজার আছে, সামরিক শক্তি আছে। কিন্তু রাজনীতিতে ক্ষমতার সঙ্গে প্রজ্ঞাও লাগে। প্রতিবেশী, বন্ধু ও দীর্ঘদিনের মিত্রকে অপমান করে, প্রতিদিন হুমকি দিয়ে এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ককে অস্ত্র বানিয়ে কতদিন নেতৃত্ব দেওয়া যায়, সেই পরীক্ষাও এখন শুরু হয়েছে।

ফোর্ড বলেছেন, “This guy’s a loser.” ট্রাম্প সত্যিই কত বড় রাজনৈতিক লুজার, সেটা হয়তো জানতে আমাদের বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। আগামী কয়েক মাসেই তাঁর নিজের দেশের মানুষ এই বাণিজ্যযুদ্ধের মূল্য কতটা দিচ্ছে, তার হিসাব আরও পরিষ্কার হতে শুরু করবে। শুল্ক যখন আমেরিকান কারখানার কাঁচামালের দাম বাড়াবে, ব্যবসার খরচ বাড়াবে, তখন শুধু Truth Social-এর বড় হাতের অক্ষর দিয়ে সেই হিসাব ঢেকে রাখা সহজ হবে না।

এই লড়াই শুধু কার্নি বনাম ট্রাম্প কিংবা ফোর্ড বনাম ট্রাম্পের লড়াই নয়। এটি কানাডার মর্যাদার প্রশ্ন। কানাডা কারও অধীন রাষ্ট্র নয়, কারও অনুমতি নিয়ে পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার দেশও নয়। ডাগ ফোর্ড অন্তত সেই কথাটাই এবার ট্রাম্পের ভাষায় ট্রাম্পকে শুনিয়ে দিয়েছেন।

সবশেষে একটি কথাই বলা যায়, এই বাণিজ্যযুদ্ধে শুধু কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারকে লড়তে বললে হবে না, নাগরিকদেরও লড়তে হবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির কূটকৌশল আর অর্থনৈতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে সাধারণ মানুষ। নাগরিকদের হাতে যে শক্তিশালী অস্ত্রটি আছে, সেটিও এবার ব্যবহার করতে হবে। আমেরিকান পণ্য বর্জন করে ট্রাম্পের দাম্ভিকতার উচিত জবাব দেওয়ার সময় এসেছে।

এনএন/ ২৫ আগস্ট ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language