
একজন অভিবাসী ভিসা আবেদনকারী প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দিলেন, সাক্ষাৎকার দিলেন, কনস্যুলার কর্মকর্তা তাঁর ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্য কোনো অযোগ্যতাও খুঁজে পেলেন না। তারপরও শেষ পর্যন্ত ভিসা দেওয়া হলো না। কারণ একটাই, তিনি এমন একটি দেশের নাগরিক, যে দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ৭৫ দেশের একটি তালিকায় রেখেছে। গত সাত মাস ধরে বাংলাদেশসহ এসব দেশের বহু অভিবাসী ভিসা আবেদনকারীর জন্য বাস্তবতা ছিল এমনই। এবার নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালত সেই ব্যবস্থার আইনি ভিত্তিই বাতিল করে দিয়েছেন।
শুক্রবার, ২১ আগস্ট নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল আদালতের বিচারক জেনেট এ. ভার্গাস (Jeannette A. Vargas) রায় দিয়েছেন, শুধু জাতীয়তার কারণে ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যু বন্ধ রাখার ক্ষমতা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেই। ৬১ পৃষ্ঠার রায়ে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিটিকে “patently unlawful” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এই নীতি আইনের পরিপন্থী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আইনপ্রদত্ত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে। Catholic Legal Immigration Network, Inc. v. Rubio মামলায় এই রায় দেওয়া হয়।
ঘটনার শুরু ১৪ জানুয়ারি। সেদিন পররাষ্ট্র দপ্তর ঘোষণা করে, ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যু পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। সরকারের ভাষ্য ছিল, এসব দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। পররাষ্ট্র দপ্তরের তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও আফগানিস্তান, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, ঘানা, ইরান, ইরাক, জ্যামাইকা, জর্ডান, নেপাল, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, রাশিয়া, সোমালিয়া, থাইল্যান্ড, তিউনিসিয়া ও ইয়েমেনসহ মোট ৭৫টি দেশ রয়েছে।
আদালতের নথিতে এই তালিকা তৈরির পেছনের হিসাবও উঠে এসেছে। Council of Economic Advisers-এর তথ্য ব্যবহার করে কোন দেশের বংশোদ্ভূত অভিবাসী পরিবারের কত শতাংশ কোনো না কোনো সরকারি সহায়তা নেয়, সেটি দেখা হয়েছিল। যেসব দেশের ক্ষেত্রে সেই হার ৩০ শতাংশের বেশি পাওয়া যায়, মূলত সেসব দেশের নাগরিকদের ভিসা স্থগিতের আওতায় আনা হয়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অভিবাসী পরিবারগুলোর সরকারি সহায়তা গ্রহণের হারও ওই সীমার ওপরে থাকায় বাংলাদেশ ৭৫ দেশের তালিকায় স্থান পায়। এর ফলে ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যুও স্থগিত হয়ে যায়।
নীতি কার্যকর হওয়ার পর তালিকাভুক্ত দেশের নাগরিকদের আবেদন গ্রহণ ও সাক্ষাৎকার চলতে থাকে, কিন্তু ভিসা ইস্যু বন্ধ থাকে। কনস্যুলার কর্মকর্তারা বয়স, স্বাস্থ্য, পারিবারিক অবস্থা, সম্পদ, আর্থিক সামর্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতাসহ একজন আবেদনকারীর প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতেন। এমনকি কর্মকর্তা যদি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেন যে ওই ব্যক্তি সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার ঝুঁকিতে নেই এবং ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্য কোনো অযোগ্যতাও নেই, তারপরও তাঁকে ভিসা দেওয়া যেত না। পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্দেশ ছিল, তখনও Immigration and Nationality Act-এর 221(g) ধারায় আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
আদালতের নথিতে আরও দেখা যায়, কোনো আবেদন ইতোমধ্যে অনুমোদিত হলেও ভিসা যদি তখনো ইস্যু না হয়ে থাকে, সেটি পুনরায় খুলে 221(g) ধারায় প্রত্যাখ্যান করার নির্দেশ ছিল। অর্থাৎ ব্যক্তিগত যাচাইয়ে একজন আবেদনকারী যোগ্য বিবেচিত হওয়ার পরও শুধু তাঁর জাতীয়তার কারণে ভিসা আটকে যেতে পারত।
বিচারক ভার্গাসের রায়ের মূল বিষয় ছিল, অভিবাসী ভিসার সিদ্ধান্ত কীভাবে এবং কার হাতে নেওয়া হবে। Immigration and Nationality Act (INA)-এর 1152(a)(1)(A) ধারায় অভিবাসী ভিসা ইস্যুর ক্ষেত্রে জাতি, লিঙ্গ, জাতীয়তা, জন্মস্থান বা বসবাসের স্থানের কারণে বৈষম্য না করার বিধান রয়েছে। অন্যদিকে INA-এর 1104(a) ধারায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিবাসন আইন পরিচালনার বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হলেও ভিসা মঞ্জুর বা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কনস্যুলার কর্মকর্তাদের হাতে রাখা হয়েছে। আদালতের মতে, ৭৫ দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে আগে থেকেই ভিসা না দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেই সীমা অতিক্রম করেছেন।
শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক কার্যপ্রণালি আইন অনুযায়ী বিচারক ৭৫ দেশের ওপর আরোপ করা নীতিটি বাতিল করার নির্দেশ দেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যেসব আবেদনকারীর অভিবাসী ভিসা শুধু এই নীতির কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, সেই প্রত্যাখ্যানও বাতিল করে আবেদনগুলো আবার কনস্যুলার কর্মকর্তাদের কাছে পাঠাতে বলেছেন তিনি। এবার প্রচলিত অভিবাসন আইন অনুযায়ী প্রত্যেক আবেদনকারীর পরিস্থিতি আলাদাভাবে (“case-by-case”) বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ৭৫ দেশের সব আবেদনকারী এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা পেয়ে যাবেন। কোনো আবেদন অপরাধ, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, আর্থিক সামর্থ্য, ভুল তথ্য, নথির ঘাটতি বা আইনে থাকা অন্য কোনো কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাকলে শুক্রবারের রায় সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করেনি। আদালত শুধু সেই প্রত্যাখ্যানগুলো বাতিল করেছেন, যেগুলোর ভিত্তি ছিল ৭৫ দেশের এই নীতি। কে ভিসা পাবেন আর কে পাবেন না, সেই সিদ্ধান্ত আগের মতোই কনস্যুলার কর্মকর্তারা প্রত্যেকের আবেদন পৃথকভাবে যাচাই করে নেবেন।
বাংলাদেশিদের জন্য এখানেই রায়টির বড় গুরুত্ব। ২১ জানুয়ারি থেকে পারিবারিক ও কর্মসংস্থানভিত্তিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির অভিবাসী ভিসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি আবেদনকারীরা সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ করেও শুধু এই স্থগিত নীতির কারণে চূড়ান্ত ভিসা পাচ্ছিলেন না। শুক্রবারের আদেশ কার্যকর হলে শুধু বাংলাদেশি নাগরিক হওয়ার কারণে তাঁদের আবেদন আর আটকে রাখতে পারবে না পররাষ্ট্র দপ্তর। যেসব আবেদন কেবল এই নীতির কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, সেগুলোও পুনরায় বিবেচনার সুযোগ পাবে।
রায়ে আদালত সরাসরি ৭৫ দেশের নীতিটিই বাতিল করেছেন এবং শুধু এই নীতির কারণে দেওয়া ভিসা প্রত্যাখ্যানগুলোও বাতিল করেছেন। তবে মামলাটি এখানেই পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না। বিচারক ভার্গাস উভয় পক্ষকে অবশিষ্ট দাবিগুলো নিয়ে কীভাবে এগোনো হবে, সে বিষয়ে আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যৌথ চিঠি দিতে বলেছেন। ট্রাম্প প্রশাসন রায়ের বিরুদ্ধে সেকেন্ড সার্কিট কোর্ট অব আপিলসে যেতে পারে এবং আপিল চলাকালে আদেশটি স্থগিত রাখার আবেদনও করতে পারে।
শনিবার সকালে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে ২ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ হালনাগাদ করা আগের নোটিশটিই দেখা যাচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যু স্থগিত থাকার কথা রয়েছে। ফলে এখন নজর থাকবে, পররাষ্ট্র দপ্তর কত দ্রুত মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোকে নতুন নির্দেশনা দেয়, এই নীতির কারণে আটকে থাকা আবেদনগুলো কীভাবে আবার চালু করে এবং ট্রাম্প প্রশাসন রায়ের বিরুদ্ধে আপিলে যায় কি না।
তথ্যসূত্র:
U.S. District Court, Southern District of New York
U.S. Department of State
National Immigration Law Center
Reuters, August 22, 2026









