
ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকার সঙ্গে কানাডার বাণিজ্য আলোচনা শুক্রবার রাতে ভেস্তে গেছে। মধ্যরাতের মাত্র কয়েক মিনিট আগে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সিদ্ধান্ত নিলেন, যথেষ্ট হয়েছে। তিনি আলোচনা স্থগিত করে কানাডার আলোচকদের ওয়াশিংটন থেকে অটোয়ায় ফিরে আসতে বললেন। কার্নি জানিয়ে দিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যতটা শুল্ক চাপাবে, কানাডাও তার জবাব দেবে “dollar for dollar”। অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি জেনেও একটি অসম চুক্তির সামনে মাথা না নোয়ানোর এই সিদ্ধান্তটি ছিল সাহসী।
শনিবার রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২৮ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্যের ওপর। এটি যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার মোট বার্ষিক রপ্তানির প্রায় ৫ শতাংশ। পাল্টা জবাবে কানাডাও সমমূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।
মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কানাডার বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লেব্ল্যাঙ্ক এবং প্রধান আলোচক জেনিস শ্যারেটের নেতৃত্বে কানাডীয় দল ওয়াশিংটনে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গে টানা আলোচনা করছিল। প্রধানমন্ত্রী কার্নির চিফ অব স্টাফ মার্ক-আন্দ্রে ব্ল্যানচার্ডও আলোচনায় যোগ দেন। এমনকি শুক্রবার সময়সীমার কয়েক ঘণ্টা আগেও ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “কানাডার সঙ্গে চুক্তি এগিয়ে চলছে। কানাডার সঙ্গে আমাদের একটি চুক্তি হওয়া উচিত।” প্রধানমন্ত্রী কার্নির সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক রয়েছে বলেও জানান তিনি। অথচ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সেই আশাবাদ উধাও হয়ে যায়।
কার্নির ভাষায়, শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত শর্তে এমন পরিবর্তন আনে, যা ছিল অন্যায্য, অর্থনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং যেকোনো চুক্তির নির্ভরযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। ওয়াশিংটনের বক্তব্য ঠিক উল্টো। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার দাবি করেছেন, সপ্তাহের শুরুতে যে শর্তগুলো নিয়ে সমঝোতা হয়েছিল, কানাডাই শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে সরে এসেছে। অর্থাৎ কে শেষ মুহূর্তে শর্ত বদলেছে, তা নিয়ে দুই দেশের বক্তব্য সরাসরি পরস্পরবিরোধী।
কানাডা কী প্রত্যাখ্যান করেছে, সেটি বোঝা আরও গুরুত্বপূর্ণ। এক বছরের বেশি সময় ধরে ট্রাম্প প্রশাসন কানাডীয় ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ৫০ শতাংশ, গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ এবং বিভিন্ন বনজ পণ্যের ওপর ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপিয়ে রেখেছে। কানাডা চাইছিল এসব শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হোক এবং ইলেকট্রনিকস, অ্যালকোহল, দুগ্ধপণ্যসহ নতুন খাতে আর কোনো শুল্ক না আসুক। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল কানাডা মার্কিন গাড়ির ওপর পাল্টা শুল্ক তুলে নিক, দুগ্ধবাজারে মার্কিন প্রবেশাধিকার বাড়াক, প্রদেশগুলো মার্কিন মদের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করুক এবং সরকারি ক্রয়ে “Buy Canadian” নীতি শিথিল করুক। অর্থাৎ কানাডা একের পর এক ছাড় দেবে, আর বিনিময়ে ট্রাম্প আগে চাপিয়ে দেওয়া শুল্কের মাত্রা নামমাত্র কিছুটা কমাবেন।
গাড়ি ও ইস্পাতের প্রস্তাবেই সেই বৈষম্য সবচেয়ে স্পষ্ট। গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামাতে প্রস্তুত ছিল যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু আমেরিকান যন্ত্রাংশকে বেশি সুবিধা দিতে চাইছিল। কানাডা চাইছিল উত্তর আমেরিকায় তৈরি সব যন্ত্রাংশকে সমভাবে বিবেচনা করা হোক। ইস্পাতের ক্ষেত্রেও বছরে প্রায় ৪০ লাখ টন কানাডীয় পণ্য ২৫ শতাংশ শুল্কে ঢোকার সুযোগ দেওয়ার কথা হচ্ছিল; এর বেশি হলেই আবার ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ যেটিকে “ছাড়” বলা হচ্ছিল, বাস্তবে সেটি ছিল আগে থেকে আরোপিত অত্যন্ত উচ্চ শুল্কের হার কিছুটা কমিয়ে আনার প্রস্তাব মাত্র।
কার্নির সিদ্ধান্তের আসল গুরুত্ব এখানেই। একটি অসম চুক্তিতে সই করলেই যে ট্রাম্পের নতুন দাবি ও শুল্কের হুমকি থেমে যেত, তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। বরং গত দেড় বছরে তাঁর প্রশাসনের আচরণ বারবার দেখিয়েছে, তাঁদের কথা ও অবস্থানের স্থিরতা নেই। বুধবার যে শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, তার দুই ঘণ্টারও কম সময় আগে ট্রাম্প বলেছিলেন চুক্তি হয়েছে এবং তিন দিনের জন্য শুল্ক স্থগিত করেন। শুক্রবার সেই সম্ভাব্য চুক্তিই ভেঙে গেল। এই ধারাবাহিকতার পর শুধু ট্রাম্পের আশ্বাসের ওপর কানাডার ভবিষ্যৎ বাণিজ্যনীতি দাঁড় করানো বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। তাই কার্নির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি শুল্কের হার নিয়ে নয়, “reliability of any deal” নিয়ে। যার কথা ও শর্ত শেষ মুহূর্তেও বদলে যেতে পারে, তার সঙ্গে করা চুক্তির ওপর কতটা ভরসা করা যায়?
এবার আসা যাক কার্নির “dollar for dollar” কথাটিতে। বাংলায় আক্ষরিক অর্থ “ডলারের বিপরীতে ডলার”। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যত মূল্যের কানাডীয় পণ্যকে নতুন শুল্কের আওতায় আনবে, কানাডাও সমপরিমাণ মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। সহজ বাংলায়, ইটের জবাব পাটকেল।
অবশ্য কানাডার জন্য এই লড়াই সহজ নয়। নতুন শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৫ শতাংশকে প্রভাবিত করবে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব তুলনামূলক সীমিত হলেও নির্দিষ্ট কিছু শিল্পে আঘাত হবে অনেক বেশি। ইলেকট্রনিকস, প্লাস্টিক, কাগজজাত পণ্য, আসবাব ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে। RBC-এর হিসাবে কানাডার ইলেকট্রনিকস ও পোশাকশিল্পে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ২০ শতাংশেরও বেশি নতুন মার্কিন শুল্কের প্রভাবে পড়তে পারে। আঞ্চলিকভাবে অন্টারিও, কুইবেক ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ওপর চাপ পড়বে সবচেয়ে বেশি। ফলে কার্নির সিদ্ধান্ত সাহসী হলেও এর অর্থনৈতিক মূল্য যে কানাডাকে দিতে হবে, তা নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতির ভয় দেখিয়ে একটি সার্বভৌম দেশকে বারবার ছাড় দিতে বাধ্য করা গেলে তার শেষ কোথায়? ট্রাম্প শুল্ককে শুধু অর্থনৈতিক নীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন না, ক্রমেই এটিকে রাজনৈতিক চাপের অস্ত্রে পরিণত করেছেন। কানাডা, মেক্সিকো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনসহ একের পর এক দেশের ওপর শুল্কের হুমকি দিয়ে নতুন শর্ত চাপানোর চেষ্টা করেছেন। কানাডার ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও অপমানজনক ভাষা। বারবার দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের “৫১তম অঙ্গরাজ্য” করার কথা বলেছেন তিনি। এর প্রতিক্রিয়ায় কানাডায় “Elbows Up” মনোভাব, মার্কিন পণ্য বর্জন এবং যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ কমানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কানাডীয়দের বড় একটি অংশ এখন ট্রাম্পকে বিশ্বাস করে না। তাঁর একের পর এক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড তাঁর প্রতি গভীর বিরূপতা ও ক্ষোভ তৈরি করেছে।
ওয়াশিংটনের চাপ আবার শুধু বাণিজ্যেই থেমে থাকেনি। আলোচনায় কানাডার F-35 যুদ্ধবিমান কেনা সম্পন্ন করা, ট্রাম্পের Golden Dome ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া, মার্কিন রাডার প্রযুক্তি কেনা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদে যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো বিষয়ও তোলা হয়েছে। ভবিষ্যতে কানাডার তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিয়েও নিশ্চয়তা চাইছিল ওয়াশিংটন। অর্থাৎ শুল্ক কমানোর বিনিময়ে কানাডার বাজারব্যবস্থার পাশাপাশি তার প্রতিরক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদ ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সিদ্ধান্তেও ছাড় আদায়ের চেষ্টা চলছিল। একটি বাণিজ্য বিরোধের পরিধি এভাবে রাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হলে কানাডার আপত্তির কারণ বুঝতে অসুবিধা হয় না।
কার্নির সামনে শুক্রবার রাতে তাই দুটি কঠিন পথ ছিল। একটি, অসম চুক্তি মেনে সাময়িক স্থিতিশীলতা আনা। অন্যটি, চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে ৫০ শতাংশ শুল্কের ঝুঁকি নেওয়া। ব্যবসার একটি অংশ প্রথম পথটি চাইছিল, কিন্তু জনমত ছিল ভিন্ন। সাম্প্রতিক Leger জরিপে ৫৬ শতাংশ কানাডীয় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে আর কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। কুইবেকে কঠোর অবস্থানের সমর্থন আরও বেশি, ৬১ শতাংশ। ম্যানিটোবার প্রিমিয়ার ওয়াব কিনিউও প্রশ্ন তুলেছেন, সামনে আরও বড় দরকষাকষি যখন বাকি, তখন এখনই ছাড় দিয়ে কানাডা কেন নিজের শক্তি কমাবে? আর অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড আরও সরাসরি কার্নির পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর ভাষায়, এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে “Team Canada”-কে বেশি ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কার্নির শক্ত জবাবের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেছেন, “tariff for tariff, dollar for dollar”। একই সঙ্গে কানাডার সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনায় রাখার কথাও বলেছেন তিনি। অর্থাৎ কার্নি যে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, তার পেছনে কানাডার জনমত ও প্রাদেশিক রাজনীতিতেও ব্যাপক সমর্থন রয়েছে।
এখন অবশ্য সাহসী ঘোষণা দিয়েই দায়িত্ব শেষ নয়। কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে, ইউরোপ ও এশিয়ায় রপ্তানি বাড়াতে হবে, প্রদেশগুলোর মধ্যকার বাণিজ্য বাধা সরাতে হবে এবং নিজস্ব ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, গাড়ি, জ্বালানি ও প্রযুক্তিশিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। ট্রাম্পের চাপের সবচেয়ে কার্যকর জবাব শুধু পাল্টা শুল্ক নয়; এমন একটি কানাডা গড়ে তোলা, যাকে বাজারের ভয় দেখিয়ে সহজে নত করা যাবে না।
কখনো কখনো একটি দেশের সামনে এমন মুহূর্ত আসে, যখন লাভ-ক্ষতির হিসাবের পাশাপাশি আত্মমর্যাদার হিসাবও করতে হয়। শুক্রবার মার্ক কার্নি সেই হিসাবটিই করেছেন। তাঁর বার্তা সোজা: “dollar for dollar”। ট্রাম্পের আমেরিকা যদি বন্ধুত্বের বদলে চাপের ভাষায় কথা বলে, কানাডাও জানিয়ে দিয়েছে, আলোচনা হবে, সমঝোতা হবে, পারস্পরিক স্বার্থে ছাড়ও হবে; কিন্তু হুমকির মুখে মাথা নত করে কোনো চুক্তি হবে না।
তথ্যসূত্র:
The Globe and Mail
Reuters









