সম্পাদকের পাতা

ট্রাম্পকে মোকাবিলায় এক মঞ্চে কার্নি ও কানাডার প্রিমিয়াররা

নজরুল মিন্টো

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশের ১০টি প্রদেশ ও তিনটি টেরিটোরির ১৩ জন প্রিমিয়ারকে নিয়ে ভার্চুয়াল First Ministers’ Meeting-এ বসলেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। শনিবার দুপুর দেড়টায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের মূল বিষয় ছিল একটাই: ওয়াশিংটনের নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক এবং ব্যর্থ বাণিজ্য আলোচনার পর কানাডা এখন কোন পথে এগোবে। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের বার্তাও ছিল পরিষ্কার। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মোকাবিলায় কেন্দ্র, প্রদেশ ও টেরিটোরিগুলো আলাদা পথে নয়, Team Canada হিসেবেই কাজ করবে এবং একই সঙ্গে দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক শক্তি বাড়ানোর কাজ এগিয়ে নেবে।

বৈঠকটি ছিল সকালেই কার্নির দেওয়া কঠোর ঘোষণার পরবর্তী পদক্ষেপ। সকাল ১১টায় পার্লামেন্ট হিলের West Block Foyer-এ সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের জবাব কানাডা দেবে “dollar for dollar”। এরপর মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষ করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রিমিয়ারদের সঙ্গে বসেন তিনি। আলোচনায় উঠে আসে পাল্টা শুল্কের পাশাপাশি কেন্দ্র-প্রদেশ ঐক্য, নতুন আন্তর্জাতিক বাজার, বড় জাতীয় প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং প্রাদেশিক বাণিজ্য বাধা সরিয়ে শক্তিশালী একটি One Canadian Economy গড়ে তোলার কৌশল। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ভাষায়, কানাডা সবচেয়ে শক্তিশালী তখনই, যখন দেশের সরকারগুলো একসঙ্গে দাঁড়ায়।

বৈঠকে কার্নি প্রিমিয়ারদের সামনে কানাডার তাৎক্ষণিক পরবর্তী পদক্ষেপ তুলে ধরেন। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের বিপরীতে সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক Labour Day-এর পরের মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। স্টিল, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কৃষি সরঞ্জাম, পাল্প ও কাগজ এবং ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন মার্কিন পণ্য এর আওতায় আসবে। একই সঙ্গে মার্কিন শুল্কের মুখে থাকা কানাডীয় শ্রমিক ও ব্যবসার জন্য আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব পদক্ষেপের বিস্তারিত আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রকাশ করার কথা জানিয়েছে সরকার।

তবে শনিবারের বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা ছিল জাতীয় ঐক্য। অটোয়ার বক্তব্য, বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক বাণিজ্যচাপ মোকাবিলায় Team Canada পদ্ধতিই কেন্দ্র ও প্রদেশগুলোকে একই অবস্থানে ধরে রেখেছে। এখন আলোচনা ভেঙে গিয়ে সরাসরি পাল্টা শুল্কের পর্যায়ে পৌঁছানোর পর সেই ঐক্যকে আরও শক্ত রাখা হবে। একই সংকটের মুখে দেশের প্রাদেশিক ও টেরিটোরিয়াল সরকারপ্রধানদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে নিয়ে আসা তাই শুধু একটি নিয়মিত সরকারি আয়োজন নয়, ওয়াশিংটনের কাছেও এটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা।

এই ঐক্যের পক্ষে সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠগুলোর একটি অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড। তিনি বলেছেন, এখন কোনো প্রদেশের আলাদা হয়ে দাঁড়ানোর সময় নয়। তাঁর ভাষায়, “We can’t have an outlier.” সব প্রিমিয়ারকে একসঙ্গে থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। কার্নি মার্কিন প্রস্তাবে সই না করায় সন্তোষ প্রকাশ করে ফোর্ড বলেছেন, সেটি কানাডা, অন্টারিও, গাড়ি, স্টিল কিংবা উৎপাদন শিল্পের জন্য ভালো চুক্তি ছিল না। ট্রাম্প সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য আরও কঠিন। ফোর্ডের ভাষায়, তাঁকে “কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যায় না”।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড ইবির বক্তব্যেও একই দৃঢ়তা। তাঁর ভাষায়, কানাডীয়দের ভদ্রতাকে দুর্বলতা মনে করা উচিত নয়। কানাডা এই লড়াই চায়নি, কিন্তু যত দিন প্রয়োজন নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় লড়বে। নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডরের প্রিমিয়ার টনি ওয়েকহ্যাম কার্নির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে তাঁর প্রদেশ Team Canada-র অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালনে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ডের প্রিমিয়ার রব ল্যান্টজও বলেছেন, এতদিন Team Canada যে ঐক্য ধরে রেখেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ঐক্য আরও বেশি প্রয়োজন। নিউ ব্রান্সউইকের প্রিমিয়ার সুসান হল্ট স্থানীয় পণ্য ও ব্যবসার প্রতি সমর্থন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

ম্যানিটোবার প্রিমিয়ার ওয়াব কিনিউও গত কয়েক দিন ধরেই একই সুরে কথা বলছেন। তাঁর বক্তব্য, কানাডার এমন কোনো চুক্তিতে তাড়াহুড়া করা উচিত নয়, যার ওপর ভবিষ্যতে নির্ভর করা যাবে কি না সেটিই নিশ্চিত নয়। ট্রাম্পকে তিনি সরাসরি “বিশ্বাসযোগ্য নন” বলে মন্তব্য করেছেন এবং কানাডার স্বার্থে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

কেন্দ্র-প্রদেশের এই অবস্থানের পাশে দাঁড়িয়েছে ফেডারেল বিরোধী রাজনীতির বড় অংশও। কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পলিয়েভ বলেছেন, কানাডার চাকরি ও ব্যবসার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের “অন্যায্য আক্রমণের” বিরুদ্ধে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তাঁর বক্তব্য, কানাডা একতরফা শুল্ক মেনে নিতে পারে না, আবার একটি খারাপ চুক্তিও গ্রহণ করতে পারে না। কনজারভেটিভরা মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে কানাডীয় শিল্পকে রক্ষার পদক্ষেপ সমর্থন করবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। ফেডারেল NDP নেতা অ্যাভি লুইসও কার্নির আলোচনা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেছেন, মার্কিন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে প্রধানমন্ত্রী সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন চাপের মুখে কেন্দ্র-প্রদেশের পাশাপাশি ফেডারেল রাজনীতিতেও একটি বৃহত্তর জাতীয় অবস্থানের ছবি তৈরি হয়েছে।

কিন্তু শনিবারের First Ministers’ Meeting শুধু পাল্টা শুল্কের বৈঠক ছিল না। কার্নি ও প্রিমিয়াররা বড় nation-building projects দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি এবং প্রদেশগুলোর মধ্যকার বাণিজ্য বাধা সরিয়ে একটি শক্তিশালী One Canadian Economy গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ কানাডার পরিকল্পনা এখন দুই পথে এগোচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের সমপরিমাণ জবাব দেওয়া, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এমনভাবে শক্ত করা যাতে ওয়াশিংটনের বাজারকে ভবিষ্যতে একই মাত্রায় চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এই জায়গায় প্রিমিয়ারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদ, সরকারি ক্রয়নীতি, অ্যালকোহল বিক্রির ব্যবস্থা এবং বড় অবকাঠামোর বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাদেশিক সরকারের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। ফোর্ড ইতোমধ্যেই অটোয়াকে বলেছেন, প্রয়োজন হলে কানাডার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও critical minerals-কে আলোচনায় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোর পণ্যের ওপর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তাঁর প্রস্তাবে রয়েছে।

শনিবার সকালে কার্নি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার ও ক্রেতা। গত বছর মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো কানাডায় প্রায় ৬০০ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের পণ্য ও সেবা বিক্রি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি করা প্রাকৃতিক গ্যাসের ৯৯ শতাংশ, বিদ্যুতের ৮৫ শতাংশ এবং অপরিশোধিত তেলের ৬০ শতাংশও আসে কানাডা থেকে। এই বাস্তবতায় কেন্দ্র ও প্রদেশ একসঙ্গে দাঁড়ালে বাণিজ্যযুদ্ধের চাপ কাকে বলে, ওয়াশিংটন তা হাড়ে হাড়ে টের পাবে।

একই সঙ্গে কানাডা বিকল্প বাজার তৈরির কাজও দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। জুলাইয়ের First Ministers’ Meeting-এ কার্নি জানিয়েছিলেন, প্রিমিয়াররা জানুয়ারি থেকে ৫০টির বেশি এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ১৩০টির বেশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মিশনে ভূমিকা রেখেছেন। ফেডারেল সরকারও গত এক বছরে পাঁচ মহাদেশে ২০টির বেশি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদারত্ব করেছে। শনিবারের বৈঠকের সরকারি বিবৃতিতে আবারও রপ্তানি বাজার বহুমুখী করার অঙ্গীকার এসেছে। অর্থাৎ শুধু ওয়াশিংটনের সঙ্গে দরকষাকষি নয়, প্রদেশগুলোকেও সামনে রেখে ইউরোপ, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য বাজারে কানাডার অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়ানোর কাজ চলবে।

কারণ পরিস্থিতিও এখন সম্পূর্ণ আলাদা। শুক্রবার রাত পর্যন্ত কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়েছিল। শেষ মুহূর্তে ওয়াশিংটন এমন কিছু নতুন শর্ত সামনে আনে, যা ছিল অন্যায্য, অর্থনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং কানাডার সার্বভৌম সিদ্ধান্তের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শনিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল অনেক, কিন্তু বিনিময়ে ছাড়ের প্রস্তাব ছিল সামান্য। এরপরই কানাডা আলোচনা স্থগিত করে এবং আলোচক দলকে ওয়াশিংটন থেকে ফিরিয়ে আনে।

শনিবার কানাডার সব প্রিমিয়ারকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক থেকে দেশের পরবর্তী কৌশলের তিনটি দিক স্পষ্ট হয়েছে: পাল্টা জবাব, জাতীয় ঐক্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নতুন অর্থনৈতিক পথ তৈরি। একই সঙ্গে পরিষ্কার হয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভবিষ্যতের দরকষাকষিতে অটোয়া একা নয়; দেশের ১০টি প্রদেশ ও তিনটি টেরিটোরিও সেই সমীকরণের অংশ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, আঞ্চলিক স্বার্থও থাকবে, কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নে একসঙ্গে দাঁড়ানোর যে ছবি শনিবারের বৈঠকে তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন ওয়াশিংটনের প্রতি কানাডার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা।

তথ্যসূত্র:
The Canadian Press
Prime Minister of Canada
Reuters


Back to top button
🌐 Read in Your Language