সম্পাদকের পাতা

পর্তুগালে ‘বোরকা আইন’ মুখ ঢাকলে জরিমানা সর্বোচ্চ তিন হাজার ইউরো

নজরুল মিন্টো

ইউরোপে প্রকাশ্য স্থানে মুখ ঢাকার পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞার তালিকায় এবার যুক্ত হলো পর্তুগাল। দেশটির প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও জোসে সেগুরো গত ১৮ আগস্ট একটি সংসদীয় ডিক্রি অনুমোদন করেছেন, যাতে প্রকাশ্য স্থানে এমনভাবে মুখ ঢেকে রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা একজন ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তে বাধা সৃষ্টি করে। পর্তুগিজ গণমাধ্যমে আইনটি ইতোমধ্যে ‘বোরকা আইন’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। তবে আইনের ভাষায় কোনো ধর্ম বা নির্দিষ্ট ধর্মীয় পোশাকের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

চূড়ান্ত বিধান অনুযায়ী, আইনটি সরকারি গেজেট ‘Diário da República’-তে প্রকাশের ৩০ দিন পর কার্যকর হবে। ফলে প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের পর এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সরকারি গেজেটে প্রকাশের তারিখ। সেই তারিখ থেকেই আইন কার্যকরের ৩০ দিনের হিসাব শুরু হবে।

আইনটির শুরু কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দল Chega-র প্রস্তাব থেকে। দলটি ২০২৫ সালের জুনে বিলটি উত্থাপন করে। অক্টোবরে প্রাথমিক অনুমোদনের পর সেটি সংসদীয় কমিটিতে যায়। সাংবিধানিক বৈধতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে আপত্তির মুখে পরে মূল প্রস্তাবে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের ১৭ জুলাই ডান ও মধ্য-ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থনে বিলটি চূড়ান্তভাবে পাস হয়। বামপন্থী দলগুলো এর বিরোধিতা করে এবং একটি দল ভোটদানে বিরত থাকে।

Chega-র মূল প্রস্তাবে ধর্মীয় মুখাবরণের বিষয়টি অনেক বেশি সরাসরি ছিল। কিন্তু সংসদীয় আলোচনার পর আইনটিকে ধর্মীয় পোশাকের পরিবর্তে নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা ও নাগরিকের পরিচয় শনাক্তকরণের প্রশ্নে সাজানো হয়। ফলে চূড়ান্ত আইনের ভাষায় কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি।

আইনের মূল কথা সরল। প্রকাশ্য স্থানে এমন পোশাক পরা যাবে না, যা মুখ আড়াল করে বা একজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে বোরকা ও নিকাব এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে। তবে হিজাব এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে না, কারণ হিজাবে মুখ দৃশ্যমান থাকে। বোরকা সাধারণত মাথা থেকে পা পর্যন্ত শরীর ও মুখ ঢেকে দেয়, চোখের সামনে থাকে জালের মতো আবরণ। নিকাবে মুখ ঢাকা থাকলেও চোখ খোলা থাকে। হিজাব মূলত চুল, কান ও ঘাড় ঢাকে।

‘প্রকাশ্য স্থান’ বলতে শুধু রাস্তাঘাট বোঝানো হয়নি। আইনের আওতায় রয়েছে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থান, সরকারি সেবা গ্রহণের জায়গা, সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ক্রীড়া অনুষ্ঠান এবং বিক্ষোভ-সমাবেশও।

তবে সব ধরনের মুখ ঢাকাই নিষিদ্ধ নয়। স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন, পেশাগত দায়িত্ব, শিল্পকলা, বিনোদন, নিরাপত্তা কিংবা আবহাওয়াজনিত কারণে মুখ ঢাকার অনুমতি থাকবে। উপাসনালয় ও অন্যান্য পবিত্র স্থান, কূটনৈতিক ও কনস্যুলার স্থাপনা এবং বিমানের ভেতরেও এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না।

আইন ভাঙলে জরিমানার অঙ্কও কম নয়। অবহেলাজনিত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ১৫০ থেকে ৭৫০ ইউরো এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আইন ভাঙলে ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩,০০০ ইউরো জরিমানা হতে পারে। আইন প্রয়োগ এবং লঙ্ঘনের নথি তৈরির দায়িত্ব থাকবে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর।

নতুন আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কাউকে তাঁর লিঙ্গ, ধর্ম, বয়স বা জাতিগত কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে জোর করে মুখ ঢাকতে বাধ্য করাও নিষিদ্ধ। অর্থাৎ আইনটি শুধু কে কী পরছেন, তা নিয়েই নয়; কারও ওপর সেই পোশাক চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও এর বিবেচনায় রয়েছে।

রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে একটি কারণে। আইনটির সূত্রপাত কট্টর ডানপন্থী Chega-র হাতে হলেও এতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন মধ্য-বাম রাজনৈতিক পটভূমির প্রেসিডেন্ট সেগুরো। তাঁর দপ্তরের ব্যাখ্যা, মানুষের মুখ পরিচয় ও পারস্পরিক যোগাযোগের একটি মৌলিক উপাদান। একজন আরেকজনকে চিনতে পারা এবং সরাসরি যোগাযোগ করতে পারা পর্তুগিজ সমাজে পারস্পরিক আস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

প্রেসিডেন্টের মতে, শুধু নারীদের মুখ ঢেকে রাখার বাধ্যবাধকতাও নারী-পুরুষের সমমর্যাদার ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, বিষয়টি সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এখানে অধিকার ও দায়িত্বের সীমা নির্ধারণ করে ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে সামাজিক নিয়মের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন।

অবশ্য নতুন আইন নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্নও রয়েছে। পর্তুগালের সংবিধানের ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্মসহ বিভিন্ন পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ৪১ নম্বর অনুচ্ছেদে বিবেক, ধর্ম ও উপাসনার স্বাধীনতাকে অলঙ্ঘনীয় অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

এই সাংবিধানিক প্রশ্ন থেকেই পর্তুগালের আইনজীবী সমিতি, সরকারি কৌঁসুলিদের উচ্চ পরিষদ এবং নারী আইনজীবীদের সংগঠনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আইনটির বৈধতা নিয়ে আপত্তি তুলেছিল। বামপন্থী দলগুলোর আশঙ্কা, আইনের চূড়ান্ত ভাষায় ধর্মের নাম না থাকলেও বাস্তবে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে মুসলিম নারীদের ওপর এবং এটি ইসলামবিদ্বেষকে উসকে দিতে পারে।

তবে যে জনগোষ্ঠীকে ঘিরে এত বড় রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক, পর্তুগালে তাদের সংখ্যা অত্যন্ত কম। লিসবনের কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম শেখ ডেভিড মুনির ২০২৫ সালে EFE-কে বলেছিলেন, খুব উদার হিসাবেও দেশটিতে বোরকা বা নিকাব পরেন এমন নারীর সংখ্যা প্রায় একশর বেশি নয়।

পর্তুগাল অবশ্য এই পথে হাঁটা প্রথম ইউরোপীয় দেশ নয়। ফ্রান্স ২০১০ সালে আইন পাস করে এবং ২০১১ সালের এপ্রিলে প্রকাশ্য স্থানে পূর্ণ মুখাবরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে। ইউরোপে জাতীয় পর্যায়ে এমন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা প্রথম দেশ ছিল ফ্রান্স। একই বছর বেলজিয়ামও একই পথে যায়। পরে বুলগেরিয়া ২০১৬ সালে, অস্ট্রিয়া ২০১৭ সালে এবং ডেনমার্ক ২০১৮ সালে একই ধরনের বিস্তৃত বিধিনিষেধ চালু করে। সুইজারল্যান্ডে জাতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।

সব দেশের আইন অবশ্য এক নয়। নেদারল্যান্ডসে নিষেধাজ্ঞা মূলত সরকারি ভবন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান এবং গণপরিবহনের মতো নির্দিষ্ট স্থানে সীমিত। রাস্তায় সাধারণভাবে পূর্ণ মুখাবরণ নিষিদ্ধ নয়। ফলে ইউরোপে একক কোনো ‘বোরকা নীতি’ নেই; দেশভেদে নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমা ভিন্নভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

আইনটি কার্যকর হলে পর্তুগালে বসবাসকারী ব্যক্তিদের পাশাপাশি দেশটিতে যাওয়া পর্যটক ও অন্যান্য ভ্রমণকারীর ক্ষেত্রেও নিয়মটি প্রযোজ্য হবে। হিজাবের ক্ষেত্রে মুখ দৃশ্যমান থাকায় এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না।

তথ্যসূত্র:
Presidency of the Portuguese Republic
Euronews
The Telegraph


Back to top button
🌐 Read in Your Language