
কানাডার অটোমোবাইল শিল্পকে সরাসরি নিশানা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ঘোষণা দিলেন, আগামী ১ জানুয়ারি থেকে কানাডায় তৈরি সব গাড়ি, ট্রাক ও অটো পার্টসের ওপর শুল্ক হবে ৫০ শতাংশ। স্টিলের ক্ষেত্রেও একই হার প্রয়োগের কথা বলেছেন তিনি। কয়েক দিন আগেও যে খাতে শুল্ক কমানোর আলোচনা চলছিল, সেই খাতেই এখন দ্বিগুণ শুল্কের হুমকি দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
সোমবার সকালে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প কানাডাকে বিশ্বের সঙ্গে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে অন্যতম ‘খারাপ’ দেশ হিসেবে আক্রমণ করেন। তাঁর ভাষায়, কানাডা বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠকিয়েছে। এরপর বড় অক্ষরে লিখেছেন, “WE DON’T NEED CANADA, THEY NEED US!” একই সঙ্গে তিনি বলেন, কানাডাকে আর যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘স্টেটের’ মতো সুবিধা দেওয়া হবে না। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে কানাডার গাড়ি, ট্রাক ও অটো পার্টসের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসবে। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন করলে এই শুল্ক দিতে হবে না বলেও কোম্পানিগুলোকে বার্তা দিয়েছেন তিনি।
অটোমোবাইলের ক্ষেত্রে এটি হবে বর্তমান শুল্কের দ্বিগুণ। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে CUSMA-সম্মত কানাডীয় গাড়ির মার্কিন নয় এমন অংশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চলছে।
মাত্র কয়েক দিন আগেও পরিস্থিতি ছিল উল্টো। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছিল, যেখানে কানাডীয় গাড়ির ওপর মার্কিন শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ এবং স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের শুল্ক ৫০ থেকে ২৫ শতাংশে নামানোর আলোচনা চলছিল। কানাডা গাড়ির শুল্ক আরও কমিয়ে ১০ শতাংশে আনার চেষ্টা করছিল।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে সবকিছু পাল্টে যায়। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এমন কয়েকটি নতুন শর্ত সামনে আনে, যা কানাডার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শুক্রবার রাতে কার্নি আলোচনা স্থগিত করে কানাডীয় প্রতিনিধিদলকে দেশে ফিরিয়ে আনেন।
শনিবার প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কানাডীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়। কৃষিপণ্য, খাদ্য, আসবাব, প্রসাধনী, নির্মাণসামগ্রী থেকে শুরু করে হকি স্টিক পর্যন্ত বিস্তৃত পণ্য এর আওতায় পড়ে। কানাডার যুক্তরাষ্ট্রমুখী মোট রপ্তানির প্রায় পাঁচ শতাংশ সরাসরি এই নতুন ব্যবস্থার মুখে পড়েছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যত ডলারের কানাডীয় পণ্যে নতুন শুল্ক বসিয়েছে, কানাডাও ‘dollar for dollar’ একই অঙ্কের মার্কিন পণ্যে পাল্টা শুল্ক বসাবে। ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা এই পাল্টা ব্যবস্থার।
ট্রাম্পের নতুন হুমকির সবচেয়ে বড় লক্ষ্য অন্টারিও। কানাডার অটোমোবাইল শিল্পের মূল কেন্দ্র এই প্রদেশ। প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড পরিস্থিতিকে ‘economic war’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ওয়াশিংটন আরও এগোলে কানাডাকেও নিজের হাতে থাকা শক্তি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ এবং নিকেল, ইউরেনিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ বন্ধ করার কথাও বলেছেন তিনি।
ট্রাম্পের “আমাদের কানাডাকে প্রয়োজন নেই” বক্তব্যের সঙ্গে উত্তর আমেরিকার অটো শিল্পের বাস্তবতার বড় ফারাক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া গাড়ির প্রায় ১৩ শতাংশ কানাডায় তৈরি। আরও গুরুত্বপূর্ণ, কানাডায় তৈরি এসব গাড়ির মূল্যের প্রায় অর্ধেক আসে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি যন্ত্রাংশ থেকে। অর্থাৎ উইন্ডসর বা অশোয়ায় তৈরি গাড়ির ওপর শুল্ক বাড়লে তার প্রভাব শুধু কানাডীয় কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। ওই গাড়িতে ব্যবহৃত মিশিগান, ওহাইওসহ বিভিন্ন মার্কিন অঙ্গরাজ্যে তৈরি যন্ত্রাংশের চাহিদা ও উৎপাদনও এর ধাক্কা খাবে।
একটি গাড়ি তৈরির পথে যন্ত্রাংশ একাধিকবার কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত পার হতে পারে। কয়েক দশকে গড়ে ওঠা এই উৎপাদনব্যবস্থায় দুই দেশের কারখানা ও সরবরাহকারী এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে এক পাশের ওপর শুল্কের চাপ অন্য পাশেও গিয়ে পড়ে। কানাডীয় গাড়ির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক তাই শুধু কানাডার কারখানার হিসাব বদলাবে না, যুক্তরাষ্ট্রের যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক ও গাড়ি নির্মাতাদের খরচও বাড়াতে পারে।
কানাডার অটো খাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাঁচ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান ধরে রেখেছে এবং বছরে ১৬ বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের বেশি জিডিপিতে যোগ করে। ২০২৫ সালে কানাডায় ১২ লাখের বেশি যাত্রীবাহী গাড়ি তৈরি হয়েছে, যার ৯০ শতাংশের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে যায়।
তবে এই নির্ভরতাই ওয়াশিংটনের জন্য বিরাট সমস্যার জায়গা। কানাডা থেকে যন্ত্রাংশের দাম বাড়লে ডেট্রয়েটের কারখানার উৎপাদন খরচও বাড়তে পারে। শুল্ক ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই উদ্বেগের আভাস দেখা গেছে শেয়ারবাজারে। ফোর্ডের শেয়ার প্রায় ৩ শতাংশ এবং জেনারেল মোটরসের শেয়ার প্রায় ১.২ শতাংশ নেমে যায়। অন্যদিকে মার্কিন স্টিল কোম্পানিগুলোর শেয়ার বেড়েছে।
স্টিলের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক একইভাবে জটিল। ২০২৫ সালে অন্টারিও থেকে যুক্তরাষ্ট্রে স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার, যা এই দুই পণ্যে প্রদেশটির মোট রপ্তানির ৯৪ শতাংশ। আবার যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পও কানাডীয় ধাতু ও খনিজের বড় ক্রেতা। ২০২৫ সালে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭৬.৪ বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের খনিজজাত পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে শুধু আয়রন ও স্টিল ছিল ১৪.৪ বিলিয়ন এবং অ্যালুমিনিয়াম ১৩.৮ বিলিয়ন ডলার। ইউরেনিয়ামসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রেও কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী।
ট্রাম্প সোমবার দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি অন্তত ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে উল্লেখ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব হিসাব অবশ্য ভিন্ন। U.S. Trade Representative-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৪৮.৩ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে সেবা বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বৃত্ত ছিল ২৭.৭ বিলিয়ন ডলার।
চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কানাডাও পুরোনো নির্ভরতার কাঠামো বদলাতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার পণ্য রপ্তানি ৫.৩ শতাংশ কমলেও ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় রপ্তানি ৩০ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্যান্য বাজারে কানাডার মোট পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ১৭ শতাংশের বেশি। একই সঙ্গে অটো শিল্পে উৎপাদন ধরে রাখা, নতুন বিনিয়োগ আনা এবং বিকল্প বাজার তৈরির জন্য ৬.৯ বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের বেশি সহায়তা ঘোষণা করেছে অটোয়া।
এখানেই কানাডার পাল্টা কৌশলের বড় অংশ। দেশটি এখন ১৬টি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ৫১টি দেশের প্রায় দেড় বিলিয়ন ভোক্তার বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পেয়েছে। কার্নি সরকার এই আন্তর্জাতিক বাজার আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি বন্দর, জ্বালানি করিডর, খনিজ, বিদ্যুৎ ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য অবকাঠামোয় দ্রুত বিনিয়োগের পথে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, মার্কিন বাজারের শক্তিই শেষ পর্যন্ত কানাডাকে পিছু হটাবে। কানাডার জবাব হচ্ছে, বাজার বড় হলেও সার্বভৌমত্বের মূল্য তার চেয়ে বড়। ১ জানুয়ারি আসতে এখনও সময় আছে। কিন্তু এই চার মাসে সমঝোতা না হলে নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেই উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ দুই অর্থনীতির সম্পর্ক প্রবেশ করবে আরও কঠিন সংঘাতে। তখন ৫০ শতাংশ শুল্কের বোঝা শুধু কানাডার কারখানায় আটকে থাকবে না। সীমান্তজুড়ে ছড়িয়ে থাকা একই উৎপাদনব্যবস্থার কারণে এর ধাক্কা গিয়ে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি নির্মাতা, যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী, ডিলারশিপ এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন ক্রেতার ওপরও। কানাডাকে চাপে ফেলতে গিয়ে ওয়াশিংটন তখন নিজের শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়াবে, সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি করবে এবং মার্কিন বাজারেই গাড়ির দাম বাড়ার ঝুঁকি ডেকে আনবে।
তথ্যসূত্র:
Reuters, August 24, 2026
Financial Times, August 24, 2026









