
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হামলার জবাবে এবার পাল্টা আঘাত হানল কানাডা। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২৭.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক কার্যকর করবে অটোয়া। বার্তাটি পরিষ্কার, কানাডার ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হলে তার মূল্য যুক্তরাষ্ট্রকেও দিতে হবে। এর মধ্য দিয়ে কানাডা দেখিয়ে দিল, বাণিজ্যযুদ্ধে শুধু আঘাত সহ্য করে যাওয়ার দেশ নয় সে, প্রয়োজন হলে সমান শক্তিতে পাল্টা আঘাত দেওয়ার সামর্থ্যও তার আছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২২ আগস্ট থেকে প্রায় ২৭.৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেছেন। এর জবাবে ৮ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে সমমূল্যের মার্কিন আমদানির ওপর ১৫, ২৫ ও ৫০ শতাংশ হারে পাল্টা শুল্ক বসাতে যাচ্ছে কানাডা। যে পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র যে হারে শুল্ক বসিয়েছে, একই ধরনের পণ্যে সম্ভব হলে একই হারে জবাব দেওয়ার নীতি নিয়েছে অটোয়া। সরকারের ভাষায়, ‘dollar for dollar, rate for rate’, অর্থাৎ ডলারের জবাব ডলারে, হারের জবাব একই হারে।
প্রায় ৯০০ ধরনের মার্কিন পণ্যকে এমনভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে, যাতে একদিকে মার্কিন শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত কানাডীয় শিল্প দেশের বাজারে বাড়তি জায়গা পায়, অন্যদিকে চাপ পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের এমন সব শিল্প ও অঙ্গরাজ্যে, যাদের জন্য কানাডার বাজার গুরুত্বপূর্ণ। ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কৃষিযন্ত্র, পাল্প ও কাগজ, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, সামুদ্রিক খাদ্য, আসবাবপত্র ও পোশাকসহ বিস্তৃত পণ্য রয়েছে তালিকায়।
সবচেয়ে বড় আঘাতটি পড়ছে মার্কিন ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামে। এসব পণ্যের ওপর কানাডার বিদ্যমান ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হচ্ছে। ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি বেশ কিছু পণ্য, আসবাবপত্র ও পোশাকও ৫০ শতাংশ শুল্কের আওতায় পড়বে। গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কিছু দুগ্ধজাত পণ্য, মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য এবং কয়েক ধরনের ধাতব পণ্যে বসবে ২৫ শতাংশ শুল্ক। আগে থেকে কার্যকর থাকা গাড়িসহ অন্যান্য মার্কিন পণ্যের পাল্টা শুল্কও বহাল থাকবে।
তবে অটোয়ার কৌশল বুঝতে শুধু মোট অঙ্কের দিকে তাকালে হবে না। দেখতে হবে শুল্কের তীর কোথায় গিয়ে লাগছে। অর্থমূল্যের হিসাবে নতুন ব্যবস্থায় বড় চাপ পড়বে ওহাইও, ইলিনয়, পেনসিলভানিয়া, ক্যালিফোর্নিয়া ও মিশিগান থেকে আসা পণ্যে। এর কয়েকটি অঙ্গরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প উৎপাদন ও নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। আবার নিজ নিজ অঙ্গরাজ্যের মোট কানাডামুখী রপ্তানির অনুপাতে মেইন, আরকানসাস, আলাস্কা, উইসকনসিন ও ভারমন্টও বড় চাপ অনুভব করবে।
কৌশলটির গুরুত্ব বোঝার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব বাণিজ্য তথ্যই যথেষ্ট। ২০২৫ সালে ওহাইও থেকে ১৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য গেছে কানাডায়, যা অঙ্গরাজ্যটির মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৩১ শতাংশ। ওহাইওর সবচেয়ে বড় বিদেশি বাজার ছিল কানাডা। পেনসিলভানিয়ার মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ২৭ শতাংশের গন্তব্যও ছিল কানাডা। মেইনের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ কানাডা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল পণ্য কেনে না, বহু মার্কিন অঙ্গরাজ্যের কারখানা ও ব্যবসার জন্য কানাডাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি ক্রেতা।
কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের ৩২টি অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে বড় পণ্য রপ্তানি বাজার এবং ৪৫টি অঙ্গরাজ্যের শীর্ষ তিন বাজারের একটি। কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অর্থাৎ এর বড় অংশ মার্কিন কোম্পানিগুলো কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ কিংবা উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে কানাডার বিরুদ্ধে শুল্কের দেয়াল তুলে ওয়াশিংটন যে শুধু সীমান্তের উত্তর পাশেই চাপ সৃষ্টি করছে, বিষয়টি এত সরল নয়। সেই দেয়ালের ধাক্কা শেষ পর্যন্ত ফিরে যায় যুক্তরাষ্ট্রের কারখানা, সরবরাহ ব্যবস্থা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শ্রমবাজারেও।
এই জায়গাটিই কাজে লাগাতে চায় অটোয়া। শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলি প্রকাশ্যেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গরাজ্যে রাজনৈতিক চাপ তৈরির বিষয়টি মাথায় রেখেই পাল্টা শুল্কের আওতায় পণ্য নির্বাচন করা হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্দেশ্য হচ্ছে কানাডার বাজারে মার্কিন পণ্যের প্রতিযোগিতা কমিয়ে মার্কিন শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত কানাডীয় উৎপাদকদের অবস্থান শক্ত করা। অর্থাৎ পাল্টা শুল্ক এখানে শুধু প্রতিশোধের অস্ত্র নয়, দেশের শিল্পকে রক্ষারও একটি কৌশল।
কিন্তু শুধু সীমান্তে শুল্ক বসিয়েই অটোয়া থেমে থাকছে না। একই দিনে দেশের শ্রমিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে রক্ষায় ৭.৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ও সম্প্রসারিত সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। গত ১৮ মাসে মার্কিন শুল্ক ও বাণিজ্য বিঘ্নে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর জন্য প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের যে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, নতুন এই প্যাকেজ তার অতিরিক্ত।
এর মধ্যে আঞ্চলিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ছোট ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তায় রাখা হয়েছে ১.৫ বিলিয়ন ডলার। মার্কিন শুল্কের কারণে নগদ অর্থপ্রবাহের সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য Business Development Bank of Canada-এর ঋণ কর্মসূচিতে যোগ হচ্ছে আরও ৫০০ মিলিয়ন ডলার। ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবে। উদ্দেশ্য একটাই, সাময়িক বাণিজ্যঝড়ে কোনো সক্ষম কানাডীয় প্রতিষ্ঠান যেন অর্থ সংকটে পড়ে পিছিয়ে না যায়।
আরও দুই বিলিয়ন ডলার রাখা হয়েছে Canada Strong Diversification Fund-এর জন্য। শুল্কের আঘাত সামলে যেসব কানাডীয় প্রতিষ্ঠান উৎপাদন ব্যবস্থা বদলাতে, নতুন বাজার ধরতে কিংবা দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত, তাদের পাশে দাঁড়াবে এই তহবিল। বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চালু থাকা ১০ বিলিয়ন ডলারের Large Enterprise Tariff Loan কর্মসূচিতেও ঋণ পাওয়ার শর্ত আরও সহজ করা হচ্ছে।
তবে এই বাণিজ্যযুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ কারখানার মালিক নন, শ্রমিক। সেই কারণে ৭.৫ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্যাকেজের সবচেয়ে বড় একক অংশ, ৩.৫ বিলিয়ন ডলার, রাখা হয়েছে শ্রমিক ও নিয়োগদাতাদের জন্য। Employment Insurance বা EI-এর সাময়িক সুবিধাগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। কাজ কমে যাওয়া শ্রমিকদের দ্রুত আয় সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকছে। Workforce Retention and Retraining Program-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্মী ছাঁটাইয়ের বদলে তাদের ধরে রাখা, কাজ ভাগাভাগি এবং নতুন দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
এখানেই কানাডার পাল্টা কৌশলের পার্থক্য। ওয়াশিংটন যখন সীমান্তে শুল্কের দেয়াল তুলছে, অটোয়া তখন একই সঙ্গে তিনটি কাজ করছে। পাল্টা শুল্ক বসাচ্ছে, দেশের ব্যবসা ও কারখানাকে অর্থের জোগান দিচ্ছে এবং শ্রমিকের আয় ও চাকরির চারপাশে সুরক্ষার বলয় তৈরি করছে। কারণ একটি বাণিজ্যযুদ্ধ শুধু শুল্ক দিয়ে মোকাবিলা করা যায় না, দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতাও তৈরি করতে হয়।
আর কানাডার সেই সক্ষমতার ভিত্তি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজার নয়। বিশ্বের আরও বহু বড় বাজারের দরজা দেশটির জন্য খোলা রয়েছে। বর্তমানে কানাডার ১৫টি কার্যকর মুক্তবাণিজ্য চুক্তি ৫১টি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ভোক্তা এবং বিশ্বের মোট অর্থনীতির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বাজারে কানাডীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পায়। G7-এর অন্য সব দেশের সঙ্গে বিস্তৃত মুক্তবাণিজ্য সম্পর্ক থাকা একমাত্র G7 দেশও কানাডা।
এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নেটওয়ার্ক এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র কানাডার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার এবং সেই সম্পর্কের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে থাকার ঝুঁকিও কানাডা বুঝতে পারছে। তাই আগামী এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বাজারে পণ্য ও সেবা রপ্তানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। ইউরোপ, এশিয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে নতুন ক্রেতা, নতুন অংশীদার ও নতুন বাজার খোঁজার কাজ ইতিমধ্যেই জোরদার হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর যে বার্তা দিয়েছেন, তার মূল কথাও সেটিই। পুরোনো কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক হুবহু আগের জায়গায় ফিরে আসবে, এমন ধারণার ওপর দেশ তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে না। কানাডাকে নিজের শক্তি দেশের ভেতরে বাড়াতে হবে, বিদেশে অংশীদার বাড়াতে হবে এবং নিজের জাতীয় স্বার্থের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে।
এই লড়াইয়ের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, ‘Buy Canadian’ এখন কেবল ক্ষমতাসীন লিবারেল সরকারের আহ্বান হয়ে থাকছে না। বিরোধী কনজারভেটিভ নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভও নাগরিকদের পণ্যের লেবেল দেখে যত বেশি সম্ভব কানাডীয় উপাদানযুক্ত পণ্য কিনতে বলেছেন। রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হলেও অন্তত এই প্রশ্নে উভয় পক্ষের আহ্বান এক, কানাডীয়দের দেশীয় পণ্যের পাশে দাঁড়াতে হবে।
এই আহ্বানের বাস্তব শক্তি তৈরি হয় নাগরিকদের দৈনন্দিন পছন্দের মধ্য দিয়ে। একজন ক্রেতা যখন কানাডার তৈরি পণ্য বেছে নেন, স্থানীয় কোনো ব্যবসা থেকে কেনাকাটা করেন কিংবা দেশের কোনো উৎপাদককে অগ্রাধিকার দেন, সেই সিদ্ধান্তের অর্থ শুধু একটি পণ্য কেনা নয়, সেই অর্থের একটি অংশ ফিরে যায় কানাডার কারখানা, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে।
কানাডা এই বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেনি। কিন্তু লড়াই যখন তার দরজায় এসেছে, তখন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। এখন কানাডার সবচেয়ে বড় শক্তি হবে তার ঐক্য। অটোয়া তার কাজ করবে, প্রদেশগুলো তাদের কাজ করবে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নতুন বাজার খুঁজবে। আর নাগরিকদের হাতেও রয়েছে প্রতিদিন ব্যবহার করার মতো একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভোট, কানাডীয় পণ্য বেছে নেওয়া। বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তর শুধু সীমান্তে দেওয়া হয় না, কখনো কখনো উত্তর লেখা হয় দোকানের শেলফে, কারখানার অর্ডার বইয়ে এবং নাগরিকের কেনাকাটার সিদ্ধান্তে।
তথ্যসূত্র:
Department of Finance Canada
The Globe and Mail
Toronto Star









