সম্পাদকের পাতা

Return of Luca: যে নাটকে কাঁদলেন দর্শকেরা

নজরুল মিন্টো

শনিবার সন্ধ্যায় টরন্টোর ফেয়ারভিউ লাইব্রেরির মঞ্চে ‘Return of Luca’ নামে এক ঘণ্টার একটি নাটক মঞ্চস্থ হলো। সাধারণত নাটক শেষে দর্শকেরা উঠে পড়েন, কেউ বেরোনোর পথ ধরেন, কেউ পরিচিতজনের সঙ্গে দু-চার কথা বলে বাড়ির দিকে রওনা হন। কিন্তু এদিন দৃশ্যটি ছিল একেবারেই অন্যরকম। সবাই ঠায় যার যার আসনে বসে রইলেন। কেন তাঁরা আসন ছেড়ে উঠছিলেন না, সে কথায় পরে আসছি।

ইমামুল হক রচিত Toronto Theatre Folks-এর প্রযোজনায় মঞ্চস্থ ‘Return of Luca’ নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন নায়লা আজাদ। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এক কিশোর এবং তাকে ঘিরে একটি পরিবারের ভালোবাসা, ক্লান্তি, ভয়, ত্যাগ, অসহায়ত্ব আর আশার গল্প এটি। কিন্তু একে শুধু একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোরের গল্প বললে এর পরিধি অনেক ছোট হয়ে যায়। এটি আসলে আমাদের পাশের ঘরের, পাশের বাড়ির কিংবা পরিচিত কোনো পরিবারের গল্প।

আমরা একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুকে দেখি, কিন্তু অনেক সময় তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারটিকে দেখি না। দেখি না সেই মা-বাবার দিনরাত, যাঁদের প্রতিটি সিদ্ধান্তে সন্তানের কথা সবার আগে ভাবতে হয়। একটি সাধারণ পরিবারের কাছে যে কাজটি নিতান্ত স্বাভাবিক, তাঁদের কাছে সেটিই কখনো হয়ে ওঠে বড় আয়োজন। কোথাও বেড়াতে যাওয়া, কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া, স্কুলে পাঠানো কিংবা ঘরের বাইরে কয়েক ঘণ্টা কাটানোও অনেক হিসাবের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সন্তানের একটি হাসি তাঁদের পৃথিবী আলোয় ভরিয়ে দেয়, আবার সামান্য একটি অনিশ্চয়তা পুরো পরিবারকে ঠেলে দিতে পারে গভীর দুশ্চিন্তায়। নিজের ঘুম, কাজ, সামাজিক জীবন কিংবা ব্যক্তিগত ইচ্ছাও অনেক সময় বাদ পড়ে যায় সন্তানের প্রয়োজনের পেছনে।

নাট্যকার ইমামুল হক সেই অদেখা জীবনটির দিকেই আলো ফেলেছেন। নাটক শেষে দর্শকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, কিছু কিছু গল্প নীরবে আমাদের জীবনে আসে এবং থেকে যায়। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের বড় করে তোলা পরিবারগুলোর জীবন, তাঁদের চ্যালেঞ্জ, ত্যাগ, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার শক্তি এবং অবিচল ভালোবাসা থেকেই ‘Return of Luca’ লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তিনি।

ইমামুল হক আরও বলেন, বিষয়টি তাঁর কাছে শুধু পর্যবেক্ষণের ছিল না, ছিল ব্যক্তিগত অনুভবেরও। তাঁর নিজের পরিবারও এমন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে গল্পটির আবেগ কোথাও আরোপিত মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে, বহুদিন বুকের মধ্যে জমিয়ে রাখা কিছু কথা একসময় নাটকের ভাষা পেয়েছে।

গল্পটিকে মঞ্চে প্রাণ দিয়েছেন পরিচালক নায়লা আজাদ। তিনি বলেন, নাটকটি প্রথম পড়েই এর সততা, উষ্ণতা ও মানবিকতা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। লুকার ব্যক্তিগত গল্পের বাইরেও তিনি এতে দেখেছেন ভালোবাসা, ভয়, আশা, আপন হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই। তিনি চেয়েছিলেন, নাটকটি মানুষকে আরেক মানুষের জীবন একটু গভীরভাবে বুঝতে শেখাক।

তাঁর নির্দেশনার বড় সাফল্য হলো, নাটকটি কোথাও দর্শকের ওপর আবেগ চাপিয়ে দেয়নি। মঞ্চে বাড়তি আয়োজনের বাহুল্য ছিল না। নাটকের শক্তি রাখা হয়েছে মানুষে, সম্পর্কে ও অনুভূতিতে। দৃশ্যগুলো এগিয়েছে সহজ গতিতে। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই সাজানো মঞ্চের কথা ভুলে গিয়ে মনে হয়, কোনো একটি পরিবারের ঘরের দরজা খুলে গেছে এবং আমরা তাদের জীবনের কিছু মুহূর্ত খুব কাছ থেকে দেখছি। নাটকটি ছিল ইংরেজিতে, তবে মাঝেমধ্যে বাংলা কিছু কথা ও সংলাপ এসে সেই ঘরের পরিবেশটিকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। টরন্টোর বাঙালি অভিবাসী জীবনে যেমন একই ঘরে ইংরেজি ও বাংলা পাশাপাশি চলে, মঞ্চেও সেই স্বাভাবিক মিশ্রণটি আলাদা এক পরিচিতি এনে দিয়েছে। শনিবারের দর্শকদের প্রতিক্রিয়া বলে দিয়েছে, তাঁর সেই চেষ্টা বৃথা যায়নি।

‘Return of Luca’র সবচেয়ে বড় বিস্ময় নোহা সাঈদা। লুকা চরিত্রে তাঁর অভিনয় অসাধারণ। একজন কিশোরী হয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোর লুকার চরিত্রে তিনি যে স্বাভাবিকতা, সংযম ও শরীরী ভাষা দেখিয়েছেন, বহু মুহূর্তে তা অভিনয়কে ছাপিয়ে বাস্তব বলে মনে হয়েছে। এ ধরনের চরিত্রে সামান্য অতিরঞ্জনও বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে দিতে পারে। নোহা সেখানে ছিলেন আশ্চর্য রকম সংযত। তাঁর চোখের দৃষ্টি, মুখের অভিব্যক্তি, হাতের নড়াচড়া, হাঁটার ভঙ্গি, হঠাৎ অস্থিরতা কিংবা দীর্ঘ নীরবতা, সবকিছু মিলিয়ে কখনো কখনো মনে হয়েছে, তিনি লুকার চরিত্রে অভিনয় করছেন না, লুকা নিজেই মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছে।

লুকা হয়তো শব্দ দিয়ে নিজের কথা বলতে পারে না, কিন্তু তারও একটি গল্প আছে। সমাজ অনেক সময় তার সম্ভাবনা দেখার আগেই তার সীমাবদ্ধতা দেখে। নীরবতা দেখে ধরে নেয়, বলার মতো কিছু নেই। অথচ সেই নীরবতার পেছনেও থাকে অনুভূতি, স্বপ্ন, ভয়, আশা ও ভালোবাসায় ভরা একটি পৃথিবী। এই জায়গাতেই ‘Return of Luca’ শুধু একটি নাটক থাকে না, আমাদের নিজেদের দিকে তাকানোর একটি আয়না হয়ে ওঠে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানকে ঘিরে একটি পরিবারের উদ্বেগ শুধু আজকের দিনটি নিয়ে নয়, আগামীকাল নিয়েও। মা-বাবা আছেন, সন্তানকে আগলে রাখছেন। কিন্তু তাঁরা না থাকলে? পৃথিবী কি তাকে গ্রহণ করবে? কোনো অপরিচিত মানুষ কি বিরক্ত হওয়ার আগে একবার বোঝার চেষ্টা করবে, ছেলেটি বা মেয়েটি কেন এমন আচরণ করছে? সমাজে তার জন্য কি যথেষ্ট জায়গা থাকবে? এগুলো কোনো নাট্যকারের তৈরি প্রশ্ন নয়। পৃথিবীর অসংখ্য পরিবারের প্রতিদিনের প্রশ্ন।

এ কারণেই নাটকটির নামের ‘Return’ শব্দটিও যেন শুধু কারও ফিরে আসাকে বোঝায় না। এটি মানুষের কাছে মানুষের ফিরে আসা, বোঝাপড়ার কাছে ফিরে আসা, সহমর্মিতার কাছে ফিরে আসা। এমন একটি সমাজের দিকে ফিরে তাকানো, যেখানে কাউকে তার সীমাবদ্ধতার কারণে বাইরে রেখে দেওয়া হবে না।

নাটক শেষ হওয়ার পর এর প্রভাবটা আরও ভালোভাবে বোঝা গেল। অভিনেতারা একে একে মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন। দর্শকেরা তখনও আসনে। প্রথমে দর্শকসারি থেকে কথা বলার আহ্বান জানানো হলো। একে একে অনেকে উঠে নাটকের কথা বললেন, অভিনয়ের প্রশংসা করলেন, নিজেদের অনুভূতি জানালেন। কেউ ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে কণ্ঠ সামলাতে পারলেন না, কেউ হাউহাউ করে কেঁদে ফেললেন। কারও চোখে পানি, কেউ রুমাল দিয়ে চোখ মুছছেন। এরপর নাট্যকার ইমামুল হক, পরিচালক নায়লা আজাদ এবং প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত অন্যরা কথা বললেন। এক ঘণ্টা আগে যাঁরা নাটক দেখতে এসেছিলেন, ততক্ষণে তাঁরা যেন লুকার পরিবারের সুখ-দুঃখেরও অংশ হয়ে গেছেন।

এই কান্না শুধু একটি দুঃখের গল্প দেখে কেঁদে ফেলা নয়। এর মধ্যে ছিল চেনার ব্যথা। হয়তো কেউ নিজের পরিবারের কাউকে মনে করেছেন। কেউ কোনো বন্ধুর সন্তানকে। কেউ হয়তো প্রতিবেশীর সেই ছেলেটিকে, যাকে এতদিন শুধু ‘অন্যরকম’ বলে পাশ কাটিয়ে গেছেন। আবার কেউ হয়তো প্রথমবার উপলব্ধি করেছেন, একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষকে ঘিরে কতগুলো মানুষের জীবন একসঙ্গে বদলে যায়। মাত্র এক ঘণ্টার একটি নাটক। কিন্তু দর্শকেরা ফিরেছেন অনেক বড় একটি বার্তা নিয়ে।

এই নাটকের আরও প্রদর্শনী হওয়া প্রয়োজন। শুধু টরন্টোতে নয়, সুযোগ থাকলে কানাডার অন্য শহরেও। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, কমিউনিটি সেন্টার এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সামনে নাটকটি নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ এবং তাঁদের পরিবারের জীবন বুঝতে যারা কাজ করছেন, তাঁদের জন্যও এটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। কারণ সহমর্মিতা শেখানো যায় না শুধু বক্তৃতায়। কখনো কখনো একটি মঞ্চ, কয়েকজন অভিনেতা এবং এক ঘণ্টার একটি গল্প মানুষের ভেতরে যে দরজা খুলে দেয়, অনেক দীর্ঘ আলোচনা তা পারে না।

শনিবার রাতে ফেয়ারভিউ লাইব্রেরির মঞ্চে তাই শুধু ‘Return of Luca’ শেষ হয়নি। পর্দা নামার পরও লুকা যেন দর্শকদের সঙ্গে থেকে গেছে। হয়তো এটাই একটি ভালো নাটকের সবচেয়ে বড় সাফল্য। দর্শক ঘরে ফিরে যান, কিন্তু গল্পটিও ঘরে ফেরে তাঁদের সঙ্গে।

এনএন/ ৩১ আগস্ট ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language