
কানাডা এখন কারও অপেক্ষায় নেই। নতুন বাজার খুলছে, নতুন বিনিয়োগ টানছে, আর বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে নতুন অংশীদার গড়ে তুলছে। ইউরোপ থেকে এশিয়া, আর্কটিক থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক, জ্বালানি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ থেকে প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রায় সব ক্ষেত্রেই বদলে যাচ্ছে কানাডার বাণিজ্যের মানচিত্র। একই সময়ে দেশের অর্থনীতিও গতি পেয়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকের জিডিপি সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সর্বশেষ বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির অবস্থান অনেক বেশি দৃঢ় হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, যেকোনো মূল্যে চুক্তি করার জন্য কানাডা আলোচনার টেবিলে ফিরবে না। ২২ আগস্ট জাতির উদ্দেশে বক্তব্যে তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের দেওয়া প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয় বলেই কানাডীয় আলোচকদের অটোয়ায় ফিরে আসতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, দেশের অর্থনৈতিক শক্তি বাড়ানো এবং বিদেশে বাণিজ্য সম্পর্ককে বৈচিত্র্যময় করাই এখন কানাডার লক্ষ্য।
সেই লক্ষ্যেই কানাডা এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প খুঁজছে শুধু কথায় নয়, বাস্তব কর্মপরিকল্পনায়। ২৮ আগস্ট ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের সঙ্গে কার্নির আলোচনায় আর্কটিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৈচিত্র্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গুরুত্ব পায়। এর কয়েক দিন আগে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্ৎসের সঙ্গে আলোচনায়ও প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ছিল অগ্রাধিকারে। গত এক বছরে দুই দেশ AI, quantum ও battery technology নিয়ে চুক্তি করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ খাতে ছয়টির বেশি নতুন অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। পাশাপাশি Canada-Germany Strategic Partnership Agreement নিয়েও আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও কানাডার নতুন অর্থনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। গত মার্চে প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রথম কোনো কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিপক্ষীয় সফরে অস্ট্রেলিয়া যান কার্নি। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের সঙ্গে বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে বিস্তৃত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। সফরকালে অস্ট্রেলিয়ার IFM Investors কানাডায় সর্বোচ্চ ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ জানায়।
অস্ট্রেলিয়া একা নয়, বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিকেও কানাডা নতুন অর্থনৈতিক অবস্থান গড়ে তুলছে। একই সফরে ভারত ও জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় অটোয়া। ভারতে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্যিক চুক্তি হয়, যার মধ্যে Cameco-র সঙ্গে ২.৬ বিলিয়ন ডলারের ইউরেনিয়াম সরবরাহ চুক্তিও রয়েছে। জাপানের সঙ্গে জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, উন্নত প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে কানাডা এখন শুধু বিকল্প বাজার খুঁজছে না, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তকে যুক্ত করে নতুন বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক তৈরি করছে।
মধ্যপ্রাচ্যেও নতুন দরজা খুলেছে। আগস্টের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে Comprehensive Economic Partnership Agreement বা বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (CEPA) নিয়ে আলোচনা সফলভাবে শেষ হওয়ার ঘোষণা আসে। ইউএই মধ্যপ্রাচ্যে কানাডার সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার এবং দুই দেশের বাণিজ্য বছরে প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। নতুন চুক্তি কানাডীয় ব্যবসার জন্য ৭০০ বিলিয়ন ডলারের ইউএই অর্থনীতিতে প্রবেশ আরও সহজ করবে। গত এক বছরে কানাডা পাঁচ মহাদেশে ২০টির বেশি বাণিজ্য ও নিরাপত্তা চুক্তি করেছে বলে জানিয়েছেন কার্নি। কানাডীয় ব্যবসা এখন প্রায় দেড় বিলিয়ন ভোক্তার বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। আগামী ছয় মাসে ASEAN থেকে ভারত পর্যন্ত নতুন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে সেই পরিসর আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এই শরতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও আরও গভীর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা।
এই আন্তর্জাতিক তৎপরতার মধ্যেই দেশের অর্থনীতি থেকেও এসেছে শক্তিশালী বার্তা। Statistics Canada-এর ২৮ আগস্ট প্রকাশিত হিসাবে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কানাডার প্রকৃত জিডিপি আগের প্রান্তিকের তুলনায় ০.৮ শতাংশ বেড়েছে। বার্ষিক হিসাবে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৩.৩ শতাংশ, যা ২০২৩ সালের পর সবচেয়ে দ্রুত প্রান্তিক প্রবৃদ্ধি। একই সঙ্গে প্রথম প্রান্তিকের হিসাবও ঊর্ধ্বমুখী সংশোধন করা হয়েছে। ফলে বছরের প্রথমার্ধজুড়েই কানাডার অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির ধারায় থেকেছে।
অর্থনীতির ভেতরের চিত্রও ইতিবাচক। দ্বিতীয় প্রান্তিকে রপ্তানি বেড়েছে ৩.৬ শতাংশ, যা তিন বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে পারিবারিক ভোগব্যয় বেড়েছে, ব্যবসায়িক মূলধনী বিনিয়োগও দীর্ঘ সময়ের দুর্বলতা কাটিয়ে ২.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মাথাপিছু প্রকৃত জিডিপি বেড়েছে ১ শতাংশ। অর্থাৎ রপ্তানি, ভোগব্যয় ও বিনিয়োগ, অর্থনীতির প্রধান কয়েকটি ক্ষেত্রেই একই সঙ্গে গতি ফিরেছে।
শুধু বৈদেশিক সম্পর্কেই নয়, দেশের ভেতরেও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। কার্নির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, নতুন বৃহৎ প্রকল্প দপ্তরে ইতোমধ্যে জাতীয় গুরুত্বের ২৭টি প্রকল্প ও উদ্যোগ পাঠানো হয়েছে, যেগুলো মিলিয়ে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন বেসরকারি বিনিয়োগের প্রতিনিধিত্ব করছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন বন্দর, খনি ও জ্বালানি পরিবহন করিডর। একই সঙ্গে ফেডারেল পর্যায়ের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বাধা সরিয়ে একক কানাডীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার কাজও চলছে।
দেশের শিল্প ও অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগও আসছে। কুইবেকের Lévis-এ Chantier Davie-কে ছয়টি নতুন icebreaker নির্মাণে ১১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের চুক্তি দেওয়া হয়েছে, যা কুইবেকের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাহাজ নির্মাণ চুক্তি। সরকারের হিসাবে নির্মাণপর্বেই প্রায় পাঁচ হাজার কর্মসংস্থান হবে। সবগুলো জাহাজ কানাডাতেই তৈরি হবে এবং এতে কানাডীয় ইস্পাত ও অন্যান্য দেশীয় উপকরণ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বড় মাপের বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টা। আগামী ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর টরন্টোয় বসছে প্রথম Canada Investment Summit। সরকারি হিসাবে এই সম্মেলনে এমন সব বিনিয়োগকারী অংশ নেবেন, যাঁদের সম্মিলিত ব্যবস্থাপনায় রয়েছে ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ। সরকার আগামী পাঁচ বছরে কানাডায় মোট ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সক্রিয় করার লক্ষ্য নিয়েছে। গত ১২ মাসেই ৯৭ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে।
মাত্র কয়েক মাস আগেও প্রশ্ন ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বড় বাধা এলে কানাডা কোন পথে এগোবে। এখন সেই পথ সামনে দেখা যাচ্ছে। ডেনমার্ক, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারত, ইউএই এবং আরও বহু দেশের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক, দেশের ভেতরে বড় প্রকল্প, রপ্তানির পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগের গতি এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি মিলিয়ে কানাডা নতুন অর্থনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। দেশটি বাজার বাড়াচ্ছে, বিনিয়োগ টানছে, উৎপাদন শক্তিশালী করছে এবং নিজের অর্থনীতিকে আরও স্বাধীন করে তুলছে। দীর্ঘদিনের যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর বাণিজ্যব্যবস্থার বাইরে এখন বিশ্বের আরও বড় অংশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। আমেরিকার দরজা যতই কঠিন হোক, কানাডার সামনে বিশ্বের আরও অনেক দরজা খুলছে। কানাডা থেমে নেই। কানাডা এগিয়ে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: Statistics Canada









