
টেনেসির পশ্চিম প্রান্তে ক্রকেট কাউন্টির ছোট্ট শহর বেলস। জনসংখ্যা মাত্র আড়াই হাজারের মতো। শহরের দক্ষিণ দিকে হাইওয়ে ৪১২-এর পাশে সাফারি কর্নার মার্ট। গ্যাস স্টেশন, কনভেনিয়েন্স স্টোর আর পাশের ম্যাকডোনাল্ডস মিলিয়ে মহাসড়কের পথিকদের পরিচিত একটি বিরতি। ২২ আগস্ট শনিবার রাত পেরিয়ে ২৩ আগস্ট রবিবারের ভোর। চারপাশ প্রায় নিস্তব্ধ। দোকানের ভেতরে একা ছিলেন ৩৬ বছর বয়সী বাংলাদেশি শাহেদ রানা মহসিন। ক্রেতা ছিল না। কাজের ফাঁকে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন তাহাজ্জুদের নামাজে।
দুই রাকাত নামাজ শেষ করে আরও দুই রাকাতের জন্য দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রানা। এমন সময় দরজায় নক। দোকানের মালিকপক্ষের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে ক্যাশ রেজিস্টারের দিকে এগিয়ে যান। সামনে তখন পিস্তল হাতে এক ব্যক্তি। এরপর যা ঘটল, তার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সময় লেগেছিল মাত্র ৩৯ সেকেন্ড।
সিসিটিভি ফুটেজের সময় অনুযায়ী, ঘটনাটি শুরু হয় ভোর ২টা ২৪ মিনিট ২৩ সেকেন্ডে। ডাকাত রানার দিকে পিস্তল তাক করে ক্যাশ রেজিস্টারের টাকা দাবি করে। রানা বাধা দেননি। রেজিস্টারের টাকা তুলে দেন তার হাতে। টাকা নেওয়ার পর সে সিগারেট চায়। রানা কয়েক প্যাকেট সিগারেট এগিয়ে দেন। দিতে গিয়ে দুটি প্যাকেট নিচে পড়ে যায়, তিনটি প্যাকেট নেয় বন্দুকধারী।
সিগারেট হাতে নিয়েই রানাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় সে। মালিকপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রানার শরীরে চারটি গুলি লাগে। একটি কপালে, দুটি বাম বুকে এবং আরেকটি বাম বাহুতে। গুলিবিদ্ধ হয়ে মেঝেতে পড়ে যান তিনি। দোকানে ঢোকা থেকে টাকা ও সিগারেট নেওয়া, গুলি চালানো এবং বেরিয়ে যাওয়া, সব মিলিয়ে মাত্র ৩৯ সেকেন্ড।
এরপর কয়েক মিনিট দোকানের মেঝেতেই পড়ে ছিলেন রানা। ভোর ২টা ৩২ মিনিটের দিকে একজন ক্রেতা সেখানে আসেন। দুটি পানীয় নিয়ে ক্যাশ রেজিস্টারের কাছে গিয়ে রানাকে পড়ে থাকতে দেখে তিনি চিৎকার করে বাইরে বেরিয়ে যান। পরে জরুরি সেবায় খবর দেওয়া হয়। দোকানটির মালিকদের একজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোর ২টা ৩৮ মিনিটের দিকে পুলিশ ও জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা রানাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
শাহেদ রানার বাড়ি ঢাকার সাভারে। বাংলাদেশে কম্পিউটার সায়েন্সে বিএসসি শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য ২০২২ সালের অক্টোবরে স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে আসেন তিনি। ভর্তি হন আইওয়ার মহারিষি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্স অব সায়েন্স পড়া শুরু করেন। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে টেনেসিতে চলে আসেন এবং একটি গ্যাস স্টেশনে কাজ শুরু করেন।
রানা ছিলেন বিবাহিত। বাংলাদেশে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী এবং ১২ ও ৬ বছর বয়সী দুই ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে রানার বড় ভাই থাকেন ইতালিতে। স্ত্রী-সন্তানকে দেশে রেখে পড়াশোনা ও কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন রানা। কাজের আয় থেকে বাংলাদেশে থাকা পরিবারকে সহায়তা করতেন।
সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য সূত্র ধরে হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তদন্তকারীরা ২৯ বছর বয়সী কোরি উইলিয়াম ডগলাস হাউজকে (Corey Houge) শনাক্ত করেন। ২৩ আগস্ট দুপুর দেড়টার কিছু পর জ্যাকসনের লরেন্স সুইচ রোড ও হাইওয়ে ৭০-এর কাছে একটি গাড়িতে তাঁকে দেখতে পান জ্যাকসন পুলিশ, এফবিআই ও এটিএফের সদস্যরা।
পুলিশ গাড়িটি থামাতে গেলে হাউজ দ্রুতগতিতে পালিয়ে যান। একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাঁর গাড়ি জ্যাকসনের একটি বার্গার কিংয়ের সামনে দুর্ঘটনায় পড়ে। গাড়ি থেকে নেমে রেস্তোরাঁর ভেতর দিয়ে দৌড়ে পেছনের দরজা দিয়ে পালানোর সময় পুলিশ হাউজকে আটক করে। তাঁর গাড়ি থেকে ৯ মিলিমিটার গ্লক পিস্তল, একটি মুখোশ ও কিছু পোশাক উদ্ধার করা হয়।
রানা হত্যা মামলায় ক্রকেট কাউন্টির স্পেশাল গ্র্যান্ড জুরি হাউজের বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ এনেছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিকল্পিত প্রথম-ডিগ্রি হত্যা এবং বিশেষভাবে গুরুতর ডাকাতির অভিযোগ। তাঁকে জামিন ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, রানা হত্যা মামলায় হাউজের মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হবে। ২৬ আগস্ট ক্রকেট কাউন্টি সার্কিট কোর্টে হাউজকে হাজির করা হলে ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি জেনারেল ফ্রেডেরিক এজি আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্ত জানান। এজি বলেন, হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা বিবেচনায় নিয়ে তাঁরা দ্রুত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এদিকে শাহেদ রানার মরদেহ শনিবার সকালে টেনেসি থেকে নিউ ইয়র্কে আনা হয়েছে। পরিবার ও কমিউনিটি সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার ১ সেপ্টেম্বর মাগরিবের নামাজের পর ব্রুকলিনের বাংলাদেশ মুসলিম সেন্টারে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর কথা রয়েছে।
মরদেহ দেশে পাঠানো, জানাজা ও অন্যান্য ব্যয় এবং বাংলাদেশে থাকা স্ত্রী ও দুই নাবালক সন্তানকে সহায়তার জন্য ‘Bring Mohsin Shahed Rana Home’ নামে একটি GoFundMe তহবিল খোলা হয়েছে। তহবিলের আয়োজকেরা জানিয়েছেন, সংগৃহীত অর্থ রানার মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো ও তাঁর পরিবারকে সহায়তায় ব্যয় করা হবে।
মাত্র কয়েক বছর আগে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে আমেরিকার পথে পা বাড়িয়েছিলেন শাহেদ রানা। হাতে ছিল কম্পিউটার সায়েন্সের ডিগ্রি, সামনে ছিল আরও পড়াশোনা করে নিজের ও পরিবারের জন্য নতুন জীবন গড়ার আশা। সেই পথ তাঁকে প্রথমে নিয়ে যায় আইওয়ায়, পরে টেনেসির ছোট্ট শহর বেলসে। মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ পাঠানো হবে বাংলাদেশে। যে মাটি ছেড়ে একদিন নতুন জীবনের খোঁজে আমেরিকায় এসেছিলেন, শেষবারের মতো সেই মাটিতেই ফিরে যাবেন শাহেদ রানা। এবার আর ছাত্র হিসেবে নয়, স্ত্রী-সন্তান আর পরিবারের কাছে ফিরবেন কফিনবন্দী হয়ে।
এনএন/ ৩১ আগস্ট ২০২৬









