সম্পাদকের পাতা

লন্ডনের রাজপথে স্টিয়ারিং হাতে সিলেটের মেয়ে সুলতানার অন্যরকম গল্প

নজরুল মিন্টো

সুলতানা খাতুন

লন্ডনের সকাল কখনো কুয়াশায় ঢাকা, কখনো টিপটিপ বৃষ্টি, আবার কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট। হিথ্রো থেকে সেন্ট্রাল লন্ডন, স্কুলের সামনে থেকে হাসপাতাল, রেলস্টেশন থেকে অচেনা কোনো আবাসিক এলাকা, প্রতিদিন হাজারো গাড়ি ছুটে চলে এই বিশাল নগরীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। সেই ব্যস্ত শহরে ২০১৮ সাল থেকে স্টিয়ারিং হাতে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের সিলেটের মেয়ে সুলতানা খাতুন, যিনি জোবায়রা নামেও পরিচিত। তবে তাঁর গল্প এখন আর শুধু একজন নারী মিনিক্যাব চালকের গল্প নয়। দীর্ঘদিন যাত্রী বহনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি নিজেই গড়ে তুলেছেন পরিবহন প্রতিষ্ঠান SheDriveUK Ltd। তাঁর লক্ষ্য, নারীদের জন্য নারী চালকের মাধ্যমে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যের একটি যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

সুলতানা যখন এই পেশায় আসেন, তখন পরিবারের সবাই বিষয়টি সহজভাবে নেননি। তাঁর নিজের ভাষায়, প্রশ্ন উঠেছিল, ‘তুই মেয়ে হইয়া এইটা করতে কেনে?’ আপত্তির বড় কারণ ছিল নিরাপত্তা নিয়ে ভয় এবং নারীদের এই পেশায় আসা নিয়ে প্রচলিত সামাজিক ধারণা। কিন্তু সুলতানার ভাবনাটা ছিল অন্যরকম। একজন নারী যদি পুরুষ চালকের গাড়িতে যাত্রী হয়ে যেতে পারেন, তাহলে একজন নারী চালক এলে তিনি বরং আরও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেন। এই কাজ বেছে নেওয়ার আরেকটি বড় কারণ ছিল, সংসার ও সন্তানদের সময় দিয়েও নিজের সুবিধামতো গাড়ি চালানো যায়। বাড়ির কাজ বেশি থাকলে তিনি বের হন না, সময় থাকলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।

সুলতানা যে পেশায় পা রেখেছিলেন, সেখানে নারীর সংখ্যা এখনও খুবই কম। Transport for London বা TfL-এর ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির হিসাবে লন্ডনে লাইসেন্সধারী প্রাইভেট হায়ার চালক ছিলেন ১ লাখ ৪ হাজার ৭৭৬ জন। তাঁদের মধ্যে নারী মাত্র ২ হাজার ১৩০ জন, প্রায় দুই শতাংশ। একই হিসাবে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চালকের সংখ্যা ১২ হাজার ৪৫৭। হাজার হাজার পুরুষের ভিড়ে নারী চালকের এই সামান্য উপস্থিতিই বলে দেয়, সুলতানার পথচলা কতটা ব্যতিক্রমী।

ব্রিটেনে মিনিক্যাব আর রাস্তায় হাত তুলে থামানো সাধারণ ট্যাক্সি এক জিনিস নয়। মিনিক্যাবকে বলা হয় প্রাইভেট হায়ার গাড়ি (Private Hire Vehicle বা PHV)। এগুলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলতে পারে না। কোনো লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আগে থেকেই যাত্রা বুক করতে হয়। এ ধরনের গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পেতেও কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। রুট ও মানচিত্র বোঝার দক্ষতা, ইংরেজিতে যোগাযোগের সক্ষমতা এবং নিরাপত্তা, সমতা ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান সম্পর্কে জ্ঞান যাচাই করা হয়। এর সঙ্গে থাকে স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা, কাজ করার বৈধ অধিকার এবং অপরাধমূলক অতীত যাচাইয়ের প্রক্রিয়া। ফলে এটি শুধু গাড়ি চালানোর কাজ নয়, এর সঙ্গে যাত্রী নিরাপত্তা ও পেশাগত দায়িত্বও জড়িয়ে রয়েছে।

এই পেশায় দীর্ঘ সময় কাজ করেও বড় ধরনের কোনো সমস্যায় পড়েননি বলে জানিয়েছেন সুলতানা। তাঁর মতে, অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রীর অবস্থান, গন্তব্য, দূরত্ব ও রেটিং আগে থেকেই দেখা যায়। গভীর রাতের বা নিজের কাছে অনিরাপদ মনে হওয়া কোনো যাত্রা তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন। ফলে নিজের সময় ও যাত্রা বেছে নেওয়ার সুযোগটিকেও তিনি নারীদের জন্য এই পেশার বড় সুবিধা হিসেবে দেখেন।

বছরের পর বছর গাড়ি চালাতে চালাতে সুলতানার মনে একটি ভাবনা আরও শক্ত হয়েছে। তিনি নিজে যে বাধা পেরিয়ে এই পেশায় এসেছেন, অন্য নারীরা যেন সেই বাধার সামনে একা না পড়েন। সেই চিন্তা থেকেই ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত করেন SheDriveUK Ltd। ব্রিটিশ সরকারের Companies House নথিতে সুলতানা খাতুনকে প্রতিষ্ঠানটির একমাত্র পরিচালক হিসেবে দেখানো হয়েছে। কোম্পানির প্রধান নিয়ন্ত্রণও তাঁর হাতে।

SheDrive-এর পরিকল্পনা শুধু নারী যাত্রী বহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটি এমন নারীদেরও এই পেশায় আনতে চায়, যাঁরা হয়তো এখনো গাড়ি চালাতেই জানেন না। একেবারে শুরু থেকে নারী প্রশিক্ষকের মাধ্যমে গাড়ি চালানো শেখানো, প্রাইভেট হায়ার লাইসেন্সের পরীক্ষার প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা এবং কাজ শুরু করার সহযোগিতা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যাঁদের লাইসেন্স আছে কিন্তু গাড়ি নেই, তাঁদের জন্য বীমাসহ গাড়ির ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। আবার নিজের গাড়ি ও লাইসেন্স আছে এমন নারী সরাসরি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করতে পারবেন।

নারী যাত্রীদের জন্যও আলাদা করে সেবার ক্ষেত্র ঠিক করা হয়েছে। বিমানবন্দরে যাতায়াত, সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া ও নিয়ে আসা, নিয়মিত কর্মস্থলে যাওয়া, রাতে বাইরে থেকে বাড়ি ফেরা কিংবা দৈনন্দিন অন্য যাত্রায় নারী চালক বুক করার সুযোগ দিতে চায় SheDrive। বর্তমানে Greater London ও আশপাশের এলাকায় সেবা দেওয়ার কথা বলা হলেও সুলতানার লক্ষ্য ভবিষ্যতে কার্যক্রম পুরো যুক্তরাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়া।

সুলতানার কাছে এই উদ্যোগ কেবল একটি ব্যবসা নয়। সমাজের একটি অংশে এখনো নারীদের পেশাদার গাড়িচালক হিসেবে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে যে অনীহা রয়েছে, সেটিও বদলাতে চান তিনি। তাঁর বিশ্বাস, নিরাপদ ও শালীন পরিবেশে একজন নারী সংসার ও সন্তানদের দায়িত্ব সামলিয়েও এই পেশায় কাজ করতে পারেন, নিজের আয় করতে পারেন এবং পরিবারকেও আর্থিকভাবে সহায়তা করতে পারেন। তাই SheDrive-এর মাধ্যমে তিনি শুধু নারী যাত্রীদের জন্য সেবা গড়ে তুলছেন না, নতুন নারী চালক তৈরিরও চেষ্টা করছেন।

লন্ডনের রাস্তায় সুলতানার যাত্রা শুরু হয়েছিল এক ধরনের নতুন অভিজ্ঞতার টানে। বছরের পর বছর স্টিয়ারিং হাতে তিনি শুধু শহরের রাস্তা চিনেননি, চিনেছেন এই পেশার সম্ভাবনাও। সেই অভিজ্ঞতাই আজ তাঁকে উদ্যোক্তা করেছে। এখন তিনি চান, তাঁর শেখা ও অর্জনের পথ ধরে আরও নারী আত্মবিশ্বাস নিয়ে এই পেশায় আসুক, দক্ষতা অর্জন করুক এবং নিজের মতো করে এগিয়ে যাক। একা শুরু করা সেই যাত্রা তাই আজ আর শুধু সুলতানার নয়, আরও অনেক নারীর সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার গল্প।

এনএন/ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button