
কানাডার মানুষের মানিব্যাগে সবচেয়ে পরিচিত নোটগুলোর একটি ২০ ডলারের নোট। সবুজ রঙের সেই নোট বহু বছর ধরে আড়াআড়ি দেখতেই অভ্যস্ত কানাডিয়ানরা। এবার সেই পরিচিত নোটই যেন উঠে দাঁড়াচ্ছে। নোটটি হবে খাড়া, মাঝখানে থাকবেন রাজা তৃতীয় চার্লস। কিন্তু পরিবর্তন শুধু রানির জায়গায় রাজার ছবি বসানোয় থেমে থাকেনি। নতুন ২০ ডলারের ছোট্ট পরিসরের মধ্যে কানাডার রাজতান্ত্রিক ইতিহাস, প্রকৃতি, আদিবাসী সংস্কৃতি, যুদ্ধস্মৃতি এবং জালনোট ঠেকানোর নতুন প্রযুক্তি একসঙ্গে জায়গা পেয়েছে।
বৃহস্পতিবার ৩ সেপ্টেম্বর অটোয়ায় নতুন নোটটির নকশা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে ব্যাংক অব কানাডা। কানাডার কোনো ব্যাংক নোটে এই প্রথম রাজা তৃতীয় চার্লসের প্রতিকৃতি দেখা যাচ্ছে। নতুন নোটটি ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে ধীরে ধীরে বাজারে ছাড়া হবে।
রাজা চার্লসকে ঘিরে নোটের সামনের অংশ সাজানো হয়েছে গাছপালা, পাতা ও ফুলের নকশায়। এর সঙ্গে রাজার পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ে দীর্ঘদিনের আগ্রহকে যুক্ত করেছে ব্যাংক অব কানাডা। তাঁর প্রতিকৃতিতে ব্যবহার করা হয়েছে উঁচু কালি বা রেইজড ইঙ্ক। আঙুল চালালে ছবির ওপর সেই উঁচু ছাপ অনুভব করা যাবে। একই ধরনের ছাপ রয়েছে বড় করে লেখা সংখ্যায় এবং ‘CANADA’ শব্দেও।
নোটের সামনের অংশে রয়েছে কানাডার ১০টি প্রদেশ ও তিনটি টেরিটরির নিজস্ব ফুল। মোট ১৩টি ফুলকে লতা ও পাতার মাধ্যমে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সেই লতা ও পাতার নকশার অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে পার্লামেন্ট হিলে সংরক্ষিত Books of Remembrance থেকে। এসব বইয়ে কানাডার হয়ে বিভিন্ন যুদ্ধে প্রাণ দেওয়া মানুষের নাম লেখা রয়েছে। ফলে দেখতে ফুলের অলংকরণ মনে হলেও এর সঙ্গে জুড়ে আছে কানাডার ইতিহাস ও স্মৃতি।
নোটটির স্বচ্ছ গোলাকার একটি অংশে রাখা হয়েছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ চারটি উদ্ভিদ। ব্যাংকের ব্যাখ্যায় এই উদ্ভিদগুলোর সঙ্গে খাদ্য ও জীবনধারণ, কৃতজ্ঞতা এবং আরোগ্যের ধারণা জড়িয়ে আছে।
নোটটি উল্টালে আবার ফিরে আসে কানাডার যুদ্ধের ইতিহাস। বর্তমান ২০ ডলারের মতো নতুন নোটেও থাকবে ফ্রান্সে অবস্থিত Canadian National Vimy Memorial। ১৯১৭ সালের Vimy Ridge যুদ্ধের স্থানে নির্মিত এই স্মৃতিসৌধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কানাডার ভূমিকা ও আত্মত্যাগের অন্যতম প্রতীক। নোটে এর পাশে দেখা যাবে পপি ফুল। ব্যাংক অব কানাডার গভর্নরের ভাষায়, Vimy শুধু একটি যুদ্ধস্মারক নয়, এটি কানাডার আত্মত্যাগ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির নিজস্ব পরিচয় গড়ে ওঠার ইতিহাসেরও অংশ। Vimy Ridge-এর যুদ্ধে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কানাডিয়ান নিহত হন।
তবে নতুন ২০ ডলারের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি চোখে নয়, নোটটি নড়াচড়া করলেই বোঝা যাবে। জালনোট তৈরি কঠিন করতে এতে এমন কয়েকটি নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা এর আগে কানাডার কোনো ব্যাংক নোটে ছিল না।
নোটের ওপর দিয়ে নেমে যাওয়া বেগুনি রঙের বিশেষ নিরাপত্তা অংশটি একটু কাত করলেই ভেতরের ছবিগুলো বদলাতে শুরু করবে। সেখানে একটি ত্রিমাত্রিক বুদবুদের মতো অংশে ‘20’ সংখ্যাগুলো বড় হয়ে দেখা যাবে। একটি ম্যাপল পাতার ভেতর আলো যেন স্পন্দিত হচ্ছে এমন অনুভূতি তৈরি হবে। পপি ফুলের পাপড়ির ভেতরের রেখাগুলো ঘুরতে দেখা যাবে। পেছনের নকশায় থাকা ‘20’ সংখ্যাও নোট নড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ম্যাপল পাতায় বদলে যাবে। সোনালি ম্যাপল পাতার ভেতরেও একই ধরনের চলমান প্রভাব রাখা হয়েছে।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও কম দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন মানুষের কথা মাথায় রেখেও নতুন নোটে কয়েকটি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্পর্শ করে নোট চেনার ব্যবস্থা, বড় ও তীব্র বৈপরীত্যের সংখ্যা এবং ২০ ডলারের পরিচিত সবুজ রং রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বেগুনি নিরাপত্তা অংশটি অন্য মূল্যমানের নোট থেকে একে সহজে আলাদা করতে সাহায্য করবে।
আকার অবশ্য বদলাচ্ছে না। বদলে যাচ্ছে মূলত নোট দেখার অভ্যাস। এটি কানাডার নতুন Vertical series-এর দ্বিতীয় নোট। এই সিরিজের প্রথম খাড়া নোট ছিল ১০ ডলারের নোট, যাতে কানাডার নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত ভায়োলা ডেসমন্ডের ছবি রয়েছে।
২০ ডলারের সঙ্গে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। বরং এই নোটের ইতিহাস ঘাঁটলে পাওয়া যায় একটি অদ্ভুত যোগসূত্র। ব্যাংক অব কানাডা যেদিন ১৯৩৫ সালের ১১ মার্চ প্রথমবার নিজস্ব ব্যাংক নোট চালু করেছিল, সেই প্রথম সিরিজের ২০ ডলারে জায়গা পেয়েছিলেন মাত্র আট বছর বয়সী প্রিন্সেস এলিজাবেথ। তখন তিনি রানিও হননি, সিংহাসনের উত্তরাধিকারের তালিকায় ছিলেন তৃতীয় স্থানে। তাঁর একটি ১৯৩৪ সালের আলোকচিত্র থেকে সেই প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়েছিল।
নতুন নোট বাজারে আসার পরও রানির ছবিসংবলিত বর্তমান ২০ ডলার প্রচলনে থাকবে। পুরোনো নোটগুলো ধীরে ধীরে নতুন নোটের সঙ্গে পাশাপাশি ব্যবহৃত হবে।
তথ্যসূত্র: Bank of Canada







