প্রেমের টানে সর্বস্ব বিক্রি করে ২ হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে জানলেন প্রেমিকা এআই সুন্দরী!
নজরুল মিন্টো

মানুষ প্রেমে পড়লে কত কিছুই না করে! কেউ প্রেমিকার জন্য ফুল কেনেন, কেউ দামি উপহার পাঠান, কেউ আবার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে হাজির হন প্রেমিকার বাড়িতে। কিন্তু ব্রাজিলের এক প্রেমিক যা করেছেন, তা শুনলে প্রেমে অভিজ্ঞ মানুষেরও চোখ কপালে উঠবে। প্রেমিকাকে বিয়ে করে সংসার পাতবেন বলে নিজের জিনিসপত্র বিক্রি করে বাসে চেপে পাড়ি দিয়েছেন দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ। অথচ গন্তব্যে পৌঁছে জানতে পারলেন, যাঁর জন্য এত আয়োজন, সেই নারীর জন্মই হয়নি! তিনি রক্তমাংসের মানুষ নন, কম্পিউটারে তৈরি এক সুন্দরী। তাঁর নাম আছে, ছবি আছে, ভিডিও আছে, এমনকি তিন লাখের বেশি অনুসারীও আছে। শুধু বাস্তবে তাঁর কোনো অস্তিত্ব নেই।
এই হতভাগ্য প্রেমিকের নাম এডিমার রোচা মার্টিন্স। বয়স ৪৯ বছর। পেশায় রাজমিস্ত্রি। বাড়ি ব্রাজিলের মারানহাও রাজ্যের ইমপেরাত্রিজ শহরে। ইট, বালু আর সিমেন্ট দিয়ে মানুষের বাড়িঘর তৈরি করেন তিনি। নিজের জন্যও একটি সুখের সংসার গড়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সেই সংসারের জন্য পাত্রী খুঁজতে গিয়ে এমন বিপদে পড়বেন, তা হয়তো কল্পনাও করেননি।
মার্টিন্সের জীবনে একসময় বেশ একাকিত্ব নেমে আসে। মায়ের মৃত্যুর পর সেই একাকিত্ব আরও বেড়ে যায়। দিনের কাজ শেষে বাড়িতে ফিরে কথা বলার মতো একজন মানুষ, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার মতো একজন সঙ্গী চাইছিলেন তিনি। এমন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর নজরে আসে এক সুন্দরী নারীর ছবি ও ভিডিও। নাম জেসিকা অলিভেইরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ‘জেসিকা ফাজেন্দেইরা’ নামেও পরিচিত। পর্তুগিজ ভাষায় ‘ফাজেন্দেইরা’ বলতে খামারের সঙ্গে যুক্ত নারীকে বোঝায়।
জেসিকার পরিচয়টাও বেশ আকর্ষণীয়। সুন্দরী নারী, নিজের খামার রয়েছে। ভিডিওতে তিনি জানাচ্ছেন, জীবনে একজন পুরুষ সঙ্গী চান। সেই পুরুষকে নিজের খামারে নিয়ে যাবেন, একসঙ্গে সংসার করবেন, এমনকি তাঁর আর্থিক দায়িত্বও নেবেন। অর্থাৎ প্রেমিকার সঙ্গে শুধু সংসার করার সুযোগ নয়, বাড়তি পাওনা হিসেবে খামারে নিশ্চিন্তে বসবাসের ব্যবস্থাও রয়েছে!
এমন প্রস্তাব শুনে মার্টিন্সের মনে আশা জাগে। তাঁর বিশ্বাস হতে থাকে, এত দিনে বুঝি মনের মতো একজন মানুষ পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেসিকার ভিডিও দেখতেন, মন্তব্য করতেন এবং সেখান থেকে আসা উত্তরগুলোকে নিজের প্রতি আগ্রহের প্রকাশ বলে ধরে নিতেন। পরে জানা যায়, এসব উত্তরের অনেকগুলোই ছিল স্বয়ংক্রিয়।
কিন্তু প্রেমের হিসাব তো সব সময় যুক্তি মেনে চলে না। মার্টিন্সও নিজের মতো করে ভবিষ্যতের হিসাব কষতে থাকেন। জেসিকার সঙ্গে দেখা করবেন, তারপর সুযোগ হলে বিয়ে করে সংসার পাতবেন। প্রেমিকার খামারে থাকার স্বপ্নও দেখতে শুরু করেন।
অবশেষে চলতি বছরের ৯ অক্টোবর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তিনি। মারানহাও থেকে যাবেন প্রায় ২ হাজার ১০০ কিলোমিটার দূরের মিনাস জেরাইস রাজ্যের রাজধানী বেলো হরিজন্তে। সেখানেই রয়েছেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত নারী।
যাত্রার খরচ জোগাতে নিজের জিনিসপত্র বিক্রি করেন মার্টিন্স। তারপর বাসে উঠে বসেন। দীর্ঘ পথ, একের পর এক শহর, রাস্তার দুই পাশে পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্য। কিন্তু তাঁর মাথায় তখন একটাই চিন্তা, কখন পৌঁছাবেন বেলো হরিজন্তে, কখন দেখা হবে জেসিকার সঙ্গে।
১১ অক্টোবর বেলো হরিজন্তে পৌঁছে যান মার্টিন্স। কিন্তু এত দূর থেকে প্রেমিকার শহরে এলেও তাঁর হাতে ছিল না জেসিকার নির্দিষ্ট ঠিকানা। ফলে শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। যাঁকে পাওয়া যায়, তাঁকেই দেখান জেসিকার ছবি। কেউ কি চেনেন এই নারীকে? কোথায় তাঁর খামার? কীভাবে তাঁর সঙ্গে দেখা করা সম্ভব? কেউ কোনো সদুত্তর দিতে পারেন না।
মার্টিন্সের কাছে বিষয়টি অদ্ভুত লাগতে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে নারীকে এত মানুষ চেনে, বাস্তব শহরে তাঁর কোনো খোঁজ মিলছে না কেন? তিন লাখের বেশি অনুসারী আছে, অথচ ঠিকানা জানার মতো একজন মানুষও নেই!
শেষ পর্যন্ত স্থানীয় রেডিও স্টেশন ইতাতিয়াইয়ার সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে যায় তাঁর গল্প। সেখানেই বেরিয়ে আসে আসল ঘটনা। জেসিকা অলিভেইরা নামে যাঁকে তিনি খুঁজছিলেন, তিনি বাস্তবের কেউ নন। ছবি, কণ্ঠস্বর আর ভিডিও মিলিয়ে তাঁকে কম্পিউটারেই বানানো হয়েছে। অর্থাৎ মার্টিন্স যাঁর জন্য এত দূর এসেছেন, তাঁকে পৃথিবীর কোনো শহরেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।
প্রেমিকের জন্য এর চেয়ে বিব্রতকর সংবাদ আর কী হতে পারে! বিয়ের স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন, অথচ এসে জানতে পারলেন, পাত্রীই নেই। এমনকি পাত্রীর বাড়ির ঠিকানাও নেই। এত দূর পথ পাড়ি দেওয়ার পর তাঁর সামনে তখন আরও বড় সমস্যা, বাড়ি ফিরবেন কীভাবে?
পকেটের টাকাও প্রায় শেষ। অচেনা শহরে থাকার ব্যবস্থা নেই। শেষ পর্যন্ত ১৩ অক্টোবর বেলো হরিজন্তের পৌর কর্তৃপক্ষের অভিবাসী সহায়তাকেন্দ্রে যান তিনি। নিজের দুর্দশার কথা খুলে বলেন সমাজকর্মীদের। কর্তৃপক্ষ তাঁর জন্য আশ্রয় ও ফেরার বাসের টিকিটের ব্যবস্থা করে।
এদিকে জেসিকার অ্যাকাউন্টটি নিয়েও শুরু হয় আলোচনা। তিন লাখের বেশি অনুসারী থাকা ওই অ্যাকাউন্টে সুন্দরী নারীর নানা ভিডিও প্রকাশ করা হতো। কখনো তিনি খামারের কথা বলতেন, কখনো নিজের জন্য জীবনসঙ্গী খোঁজার কথা জানাতেন। ভিডিওগুলোর সঙ্গে অনলাইনে পণ্য বিক্রির প্রচারও চলত।
ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর অ্যাকাউন্টটির পরিচালনাকারী একটি ভিডিওতে জানান, জেসিকা বাস্তবের কোনো নারী নন। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ভিডিও তৈরি এবং অনুসারীদের আকৃষ্ট করার জন্যই চরিত্রটি বানানো হয়েছে। পরিচালনাকারীর দাবি, মার্টিন্সের সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত কথোপকথন হয়নি, তাঁকে বেলো হরিজন্তে আসার আমন্ত্রণও জানানো হয়নি।
এখানেই ঘটনাটির সবচেয়ে অদ্ভুত দিক। একদিকে মার্টিন্স বিশ্বাস করেছেন, তিনি একজন নারীর সঙ্গে প্রেম করছেন। অন্যদিকে অ্যাকাউন্টটির পরিচালনাকারীর বক্তব্য, সেই নারী কাউকেই ব্যক্তিগতভাবে প্রেমের প্রস্তাব দেননি। তবে মার্টিন্সের কষ্ট যে সত্যি, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
সাংবাদিকদের কাছে নিজের একাকিত্বের কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, একাকিত্বের চেয়ে খারাপ আর কী আছে? তাঁর কথায়, একাকিত্ব মানুষকে দুঃখ দেয়, হতাশ করে। জীবনে একজন সঙ্গী পাওয়ার আশাতেই এত দূর এসেছিলেন।
তবে তাঁর দুর্ভোগ সেখানেই শেষ হয়নি। ১৩ অক্টোবর ফেরার বাসে ওঠার পর পথেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। চিকিৎসাও নিতে হয়। প্রায় ৫০ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা শেষে ১৫ অক্টোবর রাতে ফিরে আসেন মারানহাও রাজ্যের ইমপেরাত্রিজ শহরে। সেখানে এখন বোনের বাড়িতে রয়েছেন তিনি। এমনকি তাঁর ঘুমানোর জায়গাটিও বেশ সাধারণ। কাপড় ধোয়ার মেশিনের পাশে ঝোলানো একটি দোলনা-বিছানা।
১৬ অক্টোবর স্থানীয় রেডিও স্টেশন ইতাতিয়াইয়াকে পাঠানো এক ভিডিওবার্তায় মার্টিন্স জানান, জেসিকা নামে বাস্তবে যে কেউ নেই, সেটি এখন তিনি পুরোপুরি বিশ্বাস করেছেন। তবে এত কিছু ঘটার পরও বেলো হরিজন্তে শহরের প্রতি তাঁর কোনো ক্ষোভ নেই। বরং সেখানে অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে যে সহযোগিতা ও ভালোবাসা পেয়েছেন, তা মনে রেখেছেন।
মার্টিন্স জানিয়েছেন, আগামী বছর নিজের ৫০তম জন্মদিন উদ্যাপন করতে আবারও বেলো হরিজন্তে যেতে চান। তবে এবার আর কোনো প্রেমিকার খোঁজে নয়। যাঁরা বিপদের সময় তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের সঙ্গে দেখা করতেই ফিরে যেতে চান।
মার্টিন্সের ঘটনাটি শুনে কারও কারও মজা লাগতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে সতর্ক হওয়ার মতো বিষয়ও রয়েছে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির সাহায্যে এমন নিখুঁত ছবি ও ভিডিও তৈরি করা সম্ভব, যেখানে মানুষটির বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই। ভিডিওতে তিনি কথা বলেন, হাসেন, ভালোবাসার প্রস্তাব দেন। অথচ পর্দার পেছনে হয়তো বসে আছেন একজন ব্যবসায়ী, যার উদ্দেশ্য অনুসারী বাড়ানো কিংবা পণ্য বিক্রি করা।
মার্টিন্স মানুষকে বাড়ি বানিয়ে দেন। কিন্তু নিজের ঘর বাঁধতে গিয়ে এমন এক নারীর প্রেমে পড়েছিলেন, যাঁর থাকার জন্য কোনো বাড়িরই প্রয়োজন নেই। তাঁর জন্য ইট লাগবে না, বালু লাগবে না, সিমেন্টও লাগবে না। প্রয়োজন শুধু কম্পিউটার আর কিছু সফটওয়্যার।
প্রেমে পড়ার আগে তাই এখন শুধু নাম, ঠিকানা আর বৈবাহিক অবস্থা জানলেই হচ্ছে না। নতুন করে আরেকটি প্রশ্নও করতে হচ্ছে, মানুষটি সত্যিই আছেন তো?
তথ্যসূত্র: Rádio Itatiaia (১৬ অক্টোবর ২০২৬), CNN Brasil (১৫ অক্টোবর ২০২৬)







