
বিগত কয়েক বছর ধরে ভিসা জালিয়াতি ও মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে কানাডায় প্রবেশের ব্যবস্থা করে দেওয়ার অভিযোগ উঠছে বিভিন্ন চক্রের বিরুদ্ধে। কোথাও ভিসা আবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিতে কানাডীয় নাগরিকদের আতিথ্যদাতা দেখানো হয়েছে, কোথাও ব্যবহার করা হয়েছে জাল পরিচয়পত্র। বাংলাদেশেও কানাডার ভিসা ও চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছে। কেউ সম্পদ বিক্রি করে টাকা দিয়েছেন, কেউ টাকা দেওয়ার পর হাতে পেয়েছেন জাল ভিসা। আবার কানাডায় ভিসা আবেদন ও আশ্রয়ের দাবিতে মিথ্যা তথ্য দিতে সহায়তার অভিযোগেও মামলা করেছে কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি বা সিবিএসএ।
এর মধ্যেই ২০৯ বাংলাদেশির জন্য জমা দেওয়া ২৪৩টি ভিসা আবেদন নিয়ে একটি বড় জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এনেছে সিবিএসএ। তদন্তকারীদের অভিযোগ, জাল নথি ও মিথ্যা বক্তব্য ব্যবহার করে এসব বাংলাদেশিকে ভিজিটর ভিসা পাইয়ে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। এ ঘটনায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
রাশেল মির্জা, মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, মো. মুদাসসার আলম ভূঁইয়া ও কাজী নাফিজ আলম গত ২২ অক্টোবর কুইবেকের ভ্যালিফিল্ড আদালতে হাজির হন। অপর অভিযুক্ত মো. রাকিবুল হাসান বাংলাদেশে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছে সিবিএসএ। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।
তদন্তের শুরু হয়েছিল একটি বাড়ি থেকে। ২০২৪ সালের ৩ জুলাই কুইবেকের মার্সিয়ের একটি ব্যক্তিগত বাসভবনে বসবাসকারীদের বিষয়ে অভিবাসন আইন মানা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে যান কর্মকর্তারা। সেখানে পাওয়া কিছু অসংগতির সূত্র ধরে ওই বছরের আগস্টে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়।
তদন্তে ২০৯ বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য জমা দেওয়া মোট ২৪৩টি ভিসা আবেদন শনাক্ত হয়। অর্থাৎ আবেদনকারীর সংখ্যার চেয়ে আবেদনের সংখ্যা বেশি ছিল। আবেদনগুলোতে কানাডীয় নাগরিকদের আতিথ্যদাতা হিসেবে দেখানো হয়েছিল। সিবিএসএর অভিযোগ, ভিসা পাওয়ার জন্য ব্যবহৃত নথি ও বক্তব্যে ছিল জালিয়াতি।
২০২৫ সালের ৩ জুন কুইবেক ও অন্টারিওতে চারটি তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করেন তদন্তকারীরা। জব্দ করা হয় নথিপত্র ও কম্পিউটার সরঞ্জাম। সংগৃহীত আলামত থেকে পাঁচজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায় বলে জানায় সংস্থাটি। ঘটনার ব্যাপকতা ও জটিলতা বিবেচনায় তদন্তকারীরা সবচেয়ে জোরালো প্রমাণসংবলিত ৭৯টি আবেদনের ওপর বিশেষভাবে মনোযোগ দেন।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কানাডায় প্রবেশের ব্যবস্থা করা বা প্রবেশে সহায়তার ষড়যন্ত্র, অভিবাসন আবেদনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন কিংবা মিথ্যা তথ্য দিতে জেনেশুনে সহযোগিতা এবং অভিবাসন আইন লঙ্ঘনে প্ররোচনা বা সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে এমন আরেকটি মামলার তথ্য সিবিএসএ প্রকাশ করেছিল এর দুই মাস আগে। গত ২১ আগস্ট সংস্থাটি জানায়, মন্ট্রিয়লের ৪২ বছর বয়সী আবুল কাসিমের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের অভিযোগ, ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ১৯ মার্চের মধ্যে তিনি ৬৫ জনকে ভিসা আবেদন ও আশ্রয়ের দাবিতে মিথ্যা তথ্য দিতে সহায়তা করেন। জালিয়াতির মাধ্যমে পাওয়া ভিসা ব্যবহার করে ৫৩ জনের কানাডায় প্রবেশের ব্যবস্থাও করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই মামলায় অভিযোগ শুধু মিথ্যা আমন্ত্রণপত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। সিবিএসএর ভাষ্য, আবুল কাসিম চারটি জাল কানাডীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করে আমন্ত্রণপত্রে আতিথ্যদাতাদের পরিচয় ভুয়াভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি নিজেকে কানাডা, ফ্রান্স ও বাংলাদেশে কার্যালয় আছে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের অভিবাসন পরামর্শক হিসেবে পরিচয় দিতেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, তিনি ২০২৫ সালের জুনে কানাডার বাইরে চলে গেছেন। তাঁর বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
বিয়ের আমন্ত্রণপত্র দেখিয়ে কানাডার ভিসা নেওয়ার এমন অভিযোগ আগেও আলোচনায় এসেছিল। ২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর সিলেট থেকে ঢাকায় আসা ৪৫ যাত্রীকে টরন্টোগামী ফ্লাইটে উঠতে দেয়নি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। তাঁদের সবার কাছে একই ব্যক্তির বিয়ের আমন্ত্রণপত্র ছিল। বিমানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আমন্ত্রণপত্রে হোটেলে থাকার কথা থাকলেও যাত্রীরা ভাড়া করা বাড়ির কাগজ দেখান। কানাডীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পর এই অসংগতির কারণে তাঁদের যাত্রা আটকে দেওয়া হয়।
যুগান্তরের প্রতিবেদনে উঠে আসে, জনপ্রতি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার চুক্তিতে বিয়ের আমন্ত্রণপত্র ব্যবহার করে ভিসা করানোর অভিযোগ। একই ব্যবস্থায় এর আগে দুই দফায় ৩৩ জন কানাডায় পৌঁছেছিলেন বলেও পত্রিকাটি জানায়। এ ছাড়া বিভিন্ন সূত্রের দাবি, একই বিয়ের আমন্ত্রণপত্র ব্যবহার করে শতাধিক ব্যক্তি কানাডায় প্রবেশ করেন এবং পরে এখানে আশ্রয়ের আবেদন করেন।
পৃথক এসব ঘটনায় ভিসা পাওয়ার জন্য আমন্ত্রণপত্র ও অন্যান্য নথিতে মিথ্যা তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। আবার বাংলাদেশে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে কানাডায় পৌঁছানোর আগেই লাখ লাখ টাকা খুইয়েছেন বিদেশযাত্রায় আগ্রহীরা। চাকরি ও ভিসার প্রতিশ্রুতিতে টাকা নেওয়ার পর তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে জাল কাগজপত্র। বিশ্বাস অর্জনের জন্য দূতাবাসের আদলে কার্যালয় সাজিয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
যশোরের ঝিকরগাছার দুই যুবক আলসাবা রাতুল ও শাকিলের অভিজ্ঞতা তেমনই। ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কানাডায় ভিসা ও চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযুক্ত হন নাসির উদ্দিন আলতাফ ও তাঁর স্ত্রী শাহানাজ বেগম।
রাতুলের অভিযোগ, ২০২৪ সালের মার্চে তাঁকে নেপালে নিয়ে কানাডার দূতাবাসের কার্যালয়ের আদলে সাজানো একটি জায়গায় সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। পরে আবার নেপালে গেলে একটি হোটেলে দুই মাস আটকে রেখে বাড়তি টাকা আদায় করা হয়। শেষ পর্যন্ত ভিসা লাগানো পাসপোর্ট পেলেও দেশে ফিরে জানতে পারেন, ভিসাটি জাল।
শাকিলের বাবা হাবিবুর রহমান জানিয়েছিলেন, ছেলেকে কানাডায় পাঠানোর জন্য দোকানপাট, জমিজমা ও গবাদিপশু বিক্রি করে সাত দফায় ১৯ লাখ টাকা দেন। অভিযুক্ত আলতাফ ওই সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তিনি মাধ্যম হিসেবে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন এবং জনপ্রতি ২০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। পুলিশ তখন অভিযোগটি তদন্তের কথা জানায়।
কানাডার একটি কোম্পানিতে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আরেকটি মামলা হয় ঢাকার কাফরুল থানায়। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ৩০ লাখ টাকার চুক্তিতে এক ব্যক্তিকে কানাডায় পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে নেওয়া হয় ২০ লাখ ১০ হাজার ৭০০ টাকা।
পরে তাঁকে বিদেশযাত্রার জন্য কিছু কাগজ দেওয়া হয়। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কানাডার দূতাবাসের মাধ্যমে যাচাই করতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, নথিগুলো জাল। এ ঘটনায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর নীলফামারী থেকে নার্গিস বেওয়া ওরফে সালমা আক্তারকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। সংস্থাটি জানায়, অভিযুক্ত নারী অন্য সদস্যদের সঙ্গে মিলে বিদেশে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ আদায়ের একটি চক্রে কাজ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরেক ভুক্তভোগী পেশায় গাড়িচালক। কানাডায় চাকরির আশায় ১৮ লাখ টাকা দেওয়ার পর তিনি পেয়েছিলেন ভিসার স্টিকার লাগানো পাসপোর্ট ও উড়োজাহাজের টিকিট। ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বহির্গমন ইমিগ্রেশন কাউন্টারে গিয়ে থেমে যায় তাঁর যাত্রা। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরীক্ষা করে ভিসাটি জাল বলে শনাক্ত করেন।
সিআইডির তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৫ অক্টোবর আজকের পত্রিকা জানায়, এই মামলায় হাসান মুরাদ নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে দিদার শেখ ও সোহেল রানাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। বিমানবন্দরে ভিসা জাল ধরা পড়ার পর দায়ের করা মামলার তদন্তে পর্যায়ক্রমে এই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বাংলাদেশে দায়ের হওয়া এসব মামলার সঙ্গে কানাডার সর্বশেষ মামলার সরাসরি সম্পর্ক দেখা না গেলেও ঘটনাগুলোতে দুই ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া যায়। কোথাও টাকা নিয়ে জাল ভিসা দেওয়া হয়েছে, কোথাও কানাডীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ভিসা আদায়ের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে জাল নথি ও মিথ্যা তথ্য। ফলে কেউ বিমানবন্দরেই আটকে গেছেন, আবার কারও আবেদনের তথ্য নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে পরে।
কানাডায় আশ্রয় চেয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশিদের সংখ্যাও কম নয়। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ডের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশকে নিপীড়নের আশঙ্কার দেশ হিসেবে উল্লেখ করা ২০ হাজার ৯৯টি আশ্রয় দাবি অনিষ্পন্ন ছিল। একই বছরে বাংলাদেশসংক্রান্ত এক হাজার ২০৩টি আশ্রয় আবেদন মঞ্জুর এবং ৮৬৭টি আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল।
ভিসা ও অভিবাসনসেবা দেওয়ার নামে অর্থ আদায় এবং মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আরও অভিযোগ আমাদের কাছে রয়েছে। এসব অভিযোগের নথিপত্র যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নিয়ে আমরা ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করব। অনুসন্ধানে যাঁদের বিরুদ্ধে প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের নাম, ছবি ও কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে। প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ কানাডার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও পাঠানো হবে। কানাডায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষের সঞ্চয় হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগগুলোর অনুসন্ধান আমরা চালিয়ে যাব।
তথ্যসূত্র: CBSA news releases; Immigration and Refugee Board of Canada statistics







