সম্পাদকের পাতা

আয়ারল্যান্ডে তরুণী যাত্রীকে যৌন নিপীড়নের দায়ে বাংলাদেশি ট্যাক্সিচালককে ডিপোর্টেশনের অর্ডার

নজরুল মিন্টো

২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর। রাত আড়াইটার দিকে আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনের একটি শহরতলি থেকে বাড়ি ফেরার জন্য অ্যাপের মাধ্যমে ট্যাক্সি ডাকেন ১৮ বছর বয়সী এক তরুণী। গাড়িতে ওঠার পরই তাঁর সঙ্গে অশালীন কথাবার্তা শুরু করেন চালক। তরুণী লক্ষ করেন, চালক তাঁকে নির্ধারিত পথে নিয়ে যাচ্ছেন না। পথ দেখানোর জন্য নিজের মোবাইল ফোনের ম্যাপ ব্যবহারের প্রস্তাব দেন তিনি। কিন্তু চালক ম্যাপ দেখার অজুহাতে তাঁকে সামনের আসনে বসতে বলেন। সামনের আসনে বসার পর একপর্যায়ে তরুণীর উরুতে বারবার হাত দিতে থাকেন চালক। শেষ পর্যন্ত বাড়িতে পৌঁছালেও রেহাই পাননি তরুণী। গাড়ি থেকে নামার সময় তাঁকে জড়িয়ে ধরে বুকে হাত দিয়ে যৌন নিপীড়ন করেন চালক। যে ট্যাক্সিতে নিরাপদে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, সেই গাড়িতেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার শিকার হন তিনি। ঘটনার পর পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন তরুণী। তদন্তে বেরিয়ে আসে চালকের পরিচয়। তিনি বাংলাদেশি নাগরিক বদরুজ্জামান মাসুম।

অভিযোগ পাওয়ার পর আয়ারল্যান্ডের পুলিশ বাহিনী গার্ডা সিওখানা তদন্ত শুরু করে। তরুণী যে অ্যাপের মাধ্যমে ট্যাক্সি ডেকেছিলেন, সেটির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। পাশাপাশি সংগ্রহ করা হয় সিসিটিভি ফুটেজ। এই দুই ধরনের তথ্যের সাহায্যে শনাক্ত করা হয় মাসুমকে। পরে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি অপরাধের কথা স্বীকার না করলেও পরবর্তী সময়ে আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে দোষ স্বীকার করেন।

২০২৫ সালের ১১ মার্চ মামলার রায় ঘোষণার সময় বিচারক প্যাট্রিশিয়া রায়ান বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন চালকের প্রতি যাত্রীর আস্থার বিষয়টিকে। একজন যাত্রী অর্থের বিনিময়ে ট্যাক্সিতে ওঠেন নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য। সেই বিশ্বাস ভেঙে চালক নিজেই যৌন নিপীড়ন করেছেন। বিচারকের বিবেচনায় এটি ছিল অপরাধটির সবচেয়ে গুরুতর দিকগুলোর একটি। ভুক্তভোগীর অল্প বয়সও সাজা নির্ধারণে বিবেচনায় নেওয়া হয়।

আদালতে মাসুমের আইনজীবী জানান, তাঁর মক্কেলের আগে কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না। ঘটনার জন্য তিনি অনুতপ্ত এবং দোষ স্বীকারের পর থেকে আর ট্যাক্সি চালাচ্ছেন না। ভুক্তভোগীর ওপর অপরাধের প্রভাব নিয়ে একটি লিখিত বিবৃতিও আদালতে জমা দেওয়া হয়। সবকিছু বিবেচনায় বিচারক মাসুমকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন এবং যৌন অপরাধীদের তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন।

প্রায় দুই যুগ ধরে আয়ারল্যান্ডে বসবাসকারী ৪৮ বছর বয়সী মাসুম ডাবলিনের সোর্ডস এলাকার বাসিন্দা। যৌন অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পর তাঁর বসবাসের অনুমতি বাতিল করে আয়ারল্যান্ড সরকার। সেই সঙ্গে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি মাসুম। শুরু হয় আদালতে নতুন এক আইনি লড়াই।

২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে শিক্ষার্থী ভিসায় প্রথম আয়ারল্যান্ডে আসেন বাংলাদেশি নাগরিক মাসুম। পরবর্তী সময়ে নিয়মিত ভিসা নবায়ন করেন এবং ধাপে ধাপে তাঁর অভিবাসন মর্যাদার উন্নতি হয়। আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে তাঁর স্ত্রী ও তিন সন্তান আয়ারল্যান্ডে এসে তাঁর সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে দেশটিতে তাঁদের আরেক সন্তানের জন্ম হয়।

আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া সন্তান আইরিশ নাগরিকত্ব পাওয়ার পর ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর মাসুম ও তাঁর স্ত্রী স্ট্যাম্প ৪ (Stamp 4) শ্রেণির বসবাসের অনুমতি পান। এই অনুমতি নিয়ে দেশটিতে কাজ ও বসবাসের সুযোগ ছিল তাঁদের। ফলে মাসুমের বিরুদ্ধে বহিষ্কারাদেশ জারি হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী ও চার সন্তানের পারিবারিক জীবনও আলোচনায় আসে।

২০২৬ সালের জুনে আয়ারল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী মাসুমের বসবাসের অনুমতি বাতিল করেন। এরপর ২৬ আগস্ট তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বহিষ্কারাদেশ জারি করা হয়। ৮ সেপ্টেম্বর মাউন্টজয় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অভিবাসন আইনের আওতায় তাঁকে আবার আটক করা হয়। এবার তাঁকে নেওয়া হয় ক্লোভারহিল কারাগারে। কর্তৃপক্ষ ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিল।

তবে বহিষ্কারাদেশের বিরুদ্ধে আদালতের আশ্রয় নেন মাসুম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ১৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে তাঁর বহিষ্কার কার্যক্রম স্থগিত করেন। ফলে নির্ধারিত ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে বাংলাদেশে পাঠানো সম্ভব হয়নি। এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর আটকাবস্থা থেকে মুক্তির আবেদন করেন মাসুম। ৫ অক্টোবর হাইকোর্ট তাঁকে বহিষ্কারাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বিচারিক পর্যালোচনার মামলা পরিচালনার অনুমতি দেন। পরদিন, ৬ অক্টোবর, বিচারপতি কনলেথ ব্র্যাডলি তাঁর শর্তসাপেক্ষ মুক্তির আদেশ দেন।

আদালতের শর্ত অনুযায়ী, মাসুমকে ডাবলিনের সোর্ডস এলাকায় নির্ধারিত পারিবারিক ঠিকানায় বসবাস করতে হবে। পাসপোর্টসহ সব ভ্রমণসংক্রান্ত নথি জমা দিতে হবে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে। প্রতি মঙ্গলবার নির্ধারিত কার্যালয়ে হাজিরা দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশ ও অভিবাসন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

দীর্ঘ ২৩ বছর আয়ারল্যান্ডে বসবাস করলেও যৌন অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার কারণে এখন দেশটি ছাড়ার মুখে মাসুম। তবে হাইকোর্টের শর্তসাপেক্ষ মুক্তির আদেশে তাঁর বিরুদ্ধে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত বাতিল হয়নি। ১৭ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেই আদেশের বিরুদ্ধে তাঁর আইনি লড়াই চলছে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে, নাকি আদালতের রায়ে আয়ারল্যান্ডে থাকার সুযোগ পাবেন, তার নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

তথ্যসূত্র: দ্য আইরিশ টাইমস

Back to top button
🌐 Read in Your Language