যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাশিমের বিরুদ্ধে লাখ লাখ পাউন্ড প্রতারণার অভিযোগ
নজরুল মিন্টো

যুক্তরাজ্যের পাঁচটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে চাকরি করে লাখ লাখ পাউন্ড প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাশিম চৌধুরীর (৫৫) বিরুদ্ধে। পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলের এই বাসিন্দা তিন বছরের বেশি সময় ধরে আটটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে প্রায় সাড়ে তিন লাখ পাউন্ড বেতন পেয়েছেন। এর মধ্যে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৩ পাউন্ড প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে বলে লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে অভিযোগ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
গত ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী লুসি অর্গান অভিযোগ করেন, কাশিম করোনা মহামারির সময় ঘরে বসে কাজের সুযোগ নিয়ে একের পর এক সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছেন। নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় আগের চাকরির তথ্য গোপন করেছেন বলেও অভিযোগ তাঁর। তবে কাশিম প্রতারণার নয়টি অভিযোগই অস্বীকার করেছেন। মামলার বিচার এখনও চলছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তখন কাশিম চৌধুরী লন্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে চাকরি শুরু করেন। কিছুদিন পরই করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়লে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ বাড়ে। অফিসে হাজিরা দেওয়ার পরিবর্তে অধিকাংশ কাজ ও সভা চলতে থাকে অনলাইনে। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই কাশিম একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়া শুরু করেন।
২০২১ সালের এপ্রিলে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের চাকরি বহাল রেখেই তিনি যোগ দেন যুক্তরাজ্যের পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে, সংক্ষেপে ডেফরা (Defra)। দুটি পূর্ণকালীন চাকরি তিনি এক বছরের বেশি সময় একসঙ্গে চালিয়ে যান বলে আদালতে জানানো হয়েছে। ২০২২ সালে ইস্ট লন্ডন এনএইচএস ট্রাস্টেও চার মাস কাজ করেন। অর্থাৎ একপর্যায়ে তাঁর একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতনের খাতায় নাম ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানত না, তাদের কর্মী একই সময়ে অন্য প্রতিষ্ঠানেও চাকরি করছেন।
পরে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের চাকরি ছেড়ে দিলেও কাশিমের একাধিক চাকরি করার অভিযোগ থামেনি। ডেফরার পাশাপাশি তিনি যুক্ত হন স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবাবিষয়ক মন্ত্রণালয় (Department of Health and Social Care), যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থা (UK Health Security Agency), ব্যবসা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় (Department for Business and Trade), খাদ্যমান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (Food Standards Agency) এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Home Office)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে। সব মিলিয়ে তিন বছর সাত মাসে আটটি প্রতিষ্ঠানে তাঁর চাকরি করার তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর পরিস্থিতি তৈরি হয় ২০২৩ সালের মে মাসে। ওই সময় কাশিম একসঙ্গে পাঁচটি পূর্ণকালীন চাকরির বেতন পাচ্ছিলেন বলে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি। সব প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা যোগ করলে দাঁড়ায় সপ্তাহে ১৮৩ ঘণ্টা। অথচ এক সপ্তাহে মোট সময়ই ১৬৮ ঘণ্টা। অর্থাৎ সপ্তাহের প্রতিটি ঘণ্টা কাজ করলেও আরও ১৫ ঘণ্টার ঘাটতি থেকে যেত। তারপরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত বেতন পাচ্ছিলেন তিনি।
মামলার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি উঠে এসেছে ২০২৩ সালের মে মাসের একটি অনলাইন বৈঠককে কেন্দ্র করে। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থায় কাশিমের অনুপস্থিতি ও অসুস্থতার ছুটি নিয়ে কথা বলতে তাঁর ব্যবস্থাপক আলিশা অ্যাডামস ভিডিও বৈঠকের আয়োজন করেন। অভিযোগপক্ষের বর্ণনা অনুযায়ী, কাশিম সেদিন ক্যামেরার সামনে হাজির হন অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে চেহারা নিয়ে। বারবার কাশছিলেন, নাক পরিষ্কার করছিলেন। কিন্তু অ্যাডামসের নজরে পড়ে, তাঁর মুখ সাদা হলেও গলার রং স্বাভাবিক। কিছুক্ষণ পর কপালের সাদা মেকআপ খসে পড়তে শুরু করে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, অসুস্থতার ভান করতেই কাশিম মুখে মেকআপ লাগিয়েছিলেন।
সেদিনের বৈঠকে আরও একটি ভুল করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে কাশিমের বিরুদ্ধে। স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থার ব্যবস্থাপকের সঙ্গে অনলাইন বৈঠকে যোগ দেওয়ার সময় তিনি ব্যবহার করেন ডেফরার ইমেইল ঠিকানা। অর্থাৎ এক সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে ফেলেন। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, সেটি হয়তো তাঁর পুরোনো ইমেইল ঠিকানা। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর দাবি, একই সময়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার তথ্য আড়াল করতেই তিনি এমন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।
ডেফরায় বছরে প্রায় ৫২ হাজার পাউন্ড বেতনে চাকরি করতেন কাশিম। কিন্তু তাঁর কাজের মান নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন সরাসরি ব্যবস্থাপক ড্যান ম্যাককার্টনি। আদালতে তিনি জানান, সাধারণ কাজেও কাশিমকে বারবার নির্দেশনা দিতে হতো। কাজের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি মায়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানাতেন। অনলাইন বৈঠকে ক্যামেরা বন্ধ রাখার কারণ হিসেবে দেখাতেন প্রযুক্তিগত সমস্যা। এরপরও তাঁকে স্থায়ী চাকরি দেওয়া হয়।
আদালতে আরও অভিযোগ উঠেছে, একাধিক চাকরি সামলাতে কাশিম অসুস্থতার ছুটির আশ্রয় নিয়েছিলেন। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার কারণে চিকিৎসকের সনদ জমা দিলেও সব নিয়োগকর্তাকে একই তথ্য জানাননি। এমনকি একটি প্রতিষ্ঠানে অসুস্থতার ছুটিতে থাকাকালে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ চালিয়ে গেছেন বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছে। তাঁর ব্যবস্থাপক আদালতে জানিয়েছেন, ডেফরায় চাকরির সময় অন্য কোথাও কর্মরত থাকার তথ্যও কাশিম জানাননি।
তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা কথিত অনিয়ম শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে সরকারি তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ফ্রড ইনিশিয়েটিভ (National Fraud Initiative) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেতনসংক্রান্ত তথ্য মিলিয়ে দেখতে গিয়ে কাশিমের একাধিক চাকরির বিষয়টি চিহ্নিত করে। অর্থাৎ যেসব প্রতিষ্ঠানে তিনি চাকরি করতেন, সেখানকার নিয়মিত তদারকির পরিবর্তে সরকারি তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থাতেই প্রথম সন্দেহের সূত্র পাওয়া যায়।
কাশিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রতারণার এই মামলা ব্রিটিশ সরকারের নিয়োগ ও তদারকিব্যবস্থা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে। যে দেশে সরকারি চাকরি পেতে নানা যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেখানে একজন ব্যক্তি কীভাবে একই সময়ে পাঁচটি পূর্ণকালীন চাকরির বেতন পাওয়ার সুযোগ পেলেন? নিয়োগের সময় তাঁর পূর্ববর্তী চাকরির তথ্য কতটা যাচাই করা হয়েছিল? এতগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন ও কর্মঘণ্টার হিসাবে অসংগতি থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি বছরের পর বছর কারও নজরে এল না কেন?
তথ্যসূত্র: Sky News (১৩ অক্টোবর ২০২৬), The Independent (১৩ অক্টোবর ২০২৬), BBC (১৪ অক্টোবর ২০২৬)







