বিশ্ব ফুটবলে রেকর্ড ৩.৪ বিলিয়ন ডলারের মেগা প্রজেক্ট ফিফার, বাংলাদেশ ফুটবলও পাচ্ছে ৩০০ কোটি টাকা

জুরিখ, ১৫ অক্টোবর – বিশ্বব্যাপী ফুটবলের পরিকাঠামো পরিবর্তন ও মাঠপর্যায়ের সার্বিক উন্নয়নে এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (ফিফা)। বর্ধিত ৪৮-দলের বিশ্বকাপ থেকে অর্জিত বিপুল রাজস্ব এবং সংস্থার নিজস্ব আর্থিক রিজার্ভ ব্যবহার করে ২০২৭-২০৩০ চক্রের জন্য অতিরিক্ত ৩.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ২.৬ বিলিয়ন পাউন্ড) অনুদান বাড়ানোর প্রস্তাব পেশ করা হচ্ছে।
সংস্থার নিজস্ব জমানো মূলধন থেকে এই বিপুল অর্থ ছাড়ের অনুমোদন চূড়ান্ত হলে বিশ্ব ফুটবলের সার্বিক উন্নয়ন বাজেট এক লাফে ৬.৩৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছাবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি স্পোর্টসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রস্তাবের ফলে আগামী চার বছরের জন্য নির্ধারিত উন্নয়ন তহবিল সরাসরি দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাবে।
ফিফা কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বহুল আলোচিত এই প্রস্তাবটি পেশের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।
নতুন মহাপরিকল্পনা: কে কত পাচ্ছে?
নতুন এই মেগা আর্থিক প্রস্তাবের অধীনে ফিফা বিশ্বজুড়ে তহবিল বণ্টন করবে। হিসাব অনুযায়ী:
সদস্য দেশগুলো (বাংলাদেশসহ): ফিফার অন্তর্ভুক্ত ২১১টি সদস্য দেশের প্রতিটি চার বছরের (২০২৭–২০৩০) নতুন চক্রে পাবে ২৫ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা)। আগে যেখানে এই বরাদ্দের প্রাক্কলন ছিল মাত্র ১০ মিলিয়ন ডলার।
আঞ্চলিক কনফেডারেশন: ফিফার আওতাধীন ৬টি আঞ্চলিক কনফেডারেশন (যেমন: উয়েফা, কনমেবল, এএফসি) এই চার বছরে পাবে ৯৯ মিলিয়ন ডলার করে।
উদ্বৃত্ত তহবিল: উন্নয়ন খাতে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূলধন ব্যবহার করার পরও ফিফার মূল ব্যাংকিং রিজার্ভে উদ্বৃত্ত জমা থাকবে প্রায় ১.৭ বিলিয়ন ডলার।
ব্যাকফুটে ইনফান্তিনো: নেপথ্যে গভীর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল অর্থ ঢালার সিদ্ধান্তের পেছনে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ওপর সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া তীব্র প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক চাপের বড় ভূমিকা রয়েছে:
বাণিজ্যিক প্রজেক্টের চরম ব্যর্থতা: বিশ্বকাপে বেসরকারি ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ইনফান্তিনো ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (FFE) নামে একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা (উয়েফা)-সহ মূল অংশীজনদের তীব্র আপত্তির মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় ফিফা।
কনফেডারেশনগুলোর আলটিমেটাম: গত সেপ্টেম্বরে উয়েফা এবং উত্তর-মধ্য আমেরিকার কনফেডারেশন (কনকাকাফ) যৌথভাবে ফিফা সভাপতিকে একটি চিঠি পাঠায়। সেই চিঠিতে ফিফার নগদ রিজার্ভ ফান্ড থেকে ২১১টি সদস্য দেশের প্রত্যেককে অবিলম্বে কমপক্ষে ১০ মিলিয়ন ডলার করে পরিশোধের জোরালো দাবি জানানো হয়।
২০২৭ সালের নির্বাচন: ২০২৭ সালের মার্চে মরক্কোর রাবাতে ফিফার পরবর্তী সভাপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে ইনফান্তিনো পুনরায় প্রার্থী হতে যাচ্ছেন। নির্বাচনের আগে ২১১টি সদস্য দেশের সমর্থন পোক্ত রাখা এবং বাণিজ্যিক বিতর্কের ক্ষতিপূরণ হিসেবে রিজার্ভের টাকা সরাসরি মাঠে ছড়িয়ে দেওয়ার এই কৌশলগত মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য এটি কী বার্তা বহন করে?
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) মতো তীব্র আর্থিক সংকটে থাকা সংস্থাগুলোর জন্য চার বছরে ২৫ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৩০০ কোটি টাকা) এই নিশ্চিত প্রবাহ একটি ঐতিহাসিক দিগন্ত খুলে দেবে।
অবকাঠামোর আমূল পরিবর্তন: এই অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশে আধুনিক অ্যাকাডেমি স্থাপন, আন্তর্জাতিকমানের টেকনিক্যাল সেন্টার তৈরি, মানসম্পন্ন কোচিং এবং নারী ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন সম্ভব হবে।
স্বচ্ছতা ও মনিটরিং: অতীতে বিভিন্ন দেশে ফিফার অনুদান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিপুল এই অর্থ যাতে স্রেফ প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রে নষ্ট না হয়ে সরাসরি মাঠের ফুটবলে কাজে আসে, সে জন্য কঠোর নজরদারি ও স্বচ্ছতা বজায় রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ফুটবলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতি কিংবা নির্বাচনী সমীকরণ যাই থাক না কেন—বিশ্ব ফুটবলের মাঠপর্যায়ে সরাসরি এভাবে ব্যাংক রিজার্ভের টাকা পৌঁছে দেওয়ার পদক্ষেপটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বের ফুটবল পরিকাঠামোয় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করবে।
এনএন/ ১৫ অক্টোবর ২০২৬







