রাশিয়ায় চাকরির নামে চরম প্রতারণা: যুদ্ধক্ষেত্রে বলির পাঠা ৩০ বাংলাদেশি, প্রাণ হারালেন ২০ জন

ঢাকা, ১৪ অক্টোবর – উচ্চ বেতনের নির্মাণ শ্রমিকের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাশিয়া পাঠানো হয়েছিল দেশের সাধারণ তরুণদের। কিন্তু রাশিয়ায় পা রাখার পরপরই তাদের ভাগ্যে নেমে আসে নির্মম পরিণতি— ৩০ জন বাংলাদেশি যুবককে বলপ্রয়োগ করে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তপ্ত সম্মুখসারিতে (Frontline)। রণক্ষেত্রে নামার প্রথম দিনেই ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় নিহত হন ১৭ জন, পরবর্তীতে আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-১০)-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি আসাদুজ্জামান এই নজিরবিহীন ও ভয়াবহ মানবপাচারের তথ্য উন্মোচন করেন।
পাচার চক্রের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও করুণ ট্র্যাজেডি
রাশিয়ায় ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত ও পঙ্গু হয়ে দেশে পালিয়ে আসা ২১ বছর বয়সী তরুণ রাজন হোসেনের বাবার দায়ের করা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে এই পাচার চক্রের নেটওয়ার্ক।
দেশের ৯টি জেলা থেকে শিকার সংগ্রহ:
রাশিয়া ও কিরগিজস্তানের দুজন এজেন্টের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক এই চক্রটি গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুর থেকে বেকার ও সহজ-সরল তরুণদের টার্গেট করত।
তিনটি ভুয়া এজেন্সি ও কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া:
জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই তরুণদের রাশিয়া পাঠানো হয়। প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা আদায় করেছিল পাচারকারীরা।
প্রশিক্ষণ ছাড়া যুদ্ধের আগুনে ঠেলে দেওয়া:
গত ৭ মে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের নির্মাণকাজে না দিয়ে সরাসরি রাশিয়ান সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা বা কৌশলগত প্রস্তুতি ছাড়াই মাত্র ২১ দিনের নামমাত্র ট্রেইনিং দিয়ে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠায় রুশ বাহিনী।
অতিরিক্ত ডিআইজি আসাদুজ্জামান বলেন: “বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এই তরুণদের যুদ্ধ করার কোনো শারীরিক সক্ষমতা বা সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল না। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ভয়াবহ ড্রোন হামলায় ১৭ জন ঘটনাস্থলেই মারা যান।”
৪ কিলোমিটার হামাগুড়ি দিয়ে বেঁচে ফেরা রাজনের জবানবন্দি ও ২ মূলহোতা গ্রেপ্তার
অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা রাজন: যুদ্ধে ড্রোনের আঘাতে রাজনের কোমরের হাড় ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে পড়ে। ওই অবস্থায় নিজের বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় ৪ কিলোমিটার পথ হামাগুড়ি দিয়ে জীবন বাঁচিয়ে একটি ক্যাম্পে পৌঁছান তিনি। পরবর্তীতে মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে দূতাবাসের সহায়তায় ২৩ আগস্ট দেশে ফেরেন।
পরিবারকে হুমকি ও মামলা: পঙ্গু অবস্থায় দেশে ফিরে ক্ষতিপূরণ চাইলে পাচারকারীরা উল্টো রাজনের পরিবারকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এরপর রাজনের বাবা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেন।
অভিযানে গ্রেপ্তার ২: মামলায় যুক্ত হয়ে এসআরবি অভিযান চালিয়ে ফরিদপুরের নগরকান্দা থেকে মিজানুর রহমান (৫৫) এবং ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থেকে আবু তাহের লেন্টু (৫০) নামের দুই প্রধান পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করেছে।
৩০ বাংলাদেশির বর্তমান আপডেট
- নিহত: ২০ জন (১৭ জন ১ম দিনেই ড্রোন হামলায়, ৩ জন পরে)।
- দেশে ফিরেছেন: ২ জন (পঙ্গু ও মারাত্মক আহত অবস্থায়)।
- হাসপাতালে চিকিৎসাধীন: ২ জন (মস্কোর একটি হাসপাতালে)।
- এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থানরত: ৬ জন (জীবনের চরম ঝুঁকিতে)।
এই মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি বাকি আসামীদের গ্রেপ্তার করতে এসআরবি-র কঠোর অভিযান চলছে।
এনএন/ ১৪ অক্টোবর ২০২৬







