অপরাধ

ছিনতাইয়ের ভয়ে বিমানবন্দরে কাটালাম রাত, ভোরে ভুয়া পুলিশের পেটে ৬ বছরের জমানো আয়!

ঢাকা, ০৩ অক্টোবর – “এবার আর প্রবাসে থাকতে হবে না বাবা, দেশে থেকেই কিছু একটা করব”—ভবিষ্যতের কত রঙিন স্বপ্ন আর টানা ৬ বছরের রক্ত পানি করা উপার্জন নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন প্রবাস ফেরত যুবক ওমার ফারুক (৩০)। বিমানবন্দরে প্রিয় ছেলেকে জড়িয়ে ধরার আনন্দের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব ওলটপালট হয়ে গেল।

গভীর রাতে রাস্তায় ছিনতাইকারীদের ভয়ে সারা রাত বিমানবন্দর টার্মিনালেই পরিবারসহ অপেক্ষা করেছিলেন তিনি। অথচ ভোর হতেই ঢাকা শহরের বুকে গণভবনসংলগ্ন সিগন্যালে ভুয়া ‘পুলিশ’ সেজে মাত্র দেড় মিনিটের ঝটিকা অপারেশনে তাঁর সাড়ে ছয় বছরের হাড়ভাঙা খাটুনির সঞ্চয় লুটে নিল একটি ছিনতাইকারী চক্র।

শনিবার (৩ অক্টোবর) ভোর ৫টা ৬ মিনিটে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার গণভবন সংলগ্ন জুলাই জাদুঘর ও জিয়া উদ্যানের সিগন্যালে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

হাইয়েস’ গাড়ির ব্যারিকেড ও শুদ্ধ ভাষায় ভুয়া পুলিশের নাটক

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাত ১১টায় সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় নামেন কেরানীগঞ্জের সুবর্ণসুর গ্রামের দুদু মিয়ার ছোট ছেলে ওমার ফারুক। তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে বিমানবন্দরে এসেছিলেন বৃদ্ধ বাবা ও দুই চাচাতো ভাই। গভীর রাতে রাস্তায় ছিনতাইয়ের ভয়ে তাঁরা বিমানবন্দর টার্মিনালেই রাত কাটিয়ে ভোর পৌনে ৫টায় কেরানীগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

কিন্তু গাড়িটি গণভবনসংলগ্ন সিগন্যালে ইউটার্ন নেওয়ার সময়ই ঘটে যায় অঘটন:

গতি রোধ ও পরিচয়: একটি সাদা রঙের ‘হাইয়েস’ মাইক্রোবাস দ্রুত এসে তাঁদের প্রাইভেটকারের গতিপথ আটকে দাঁড়ায়। গাড়ি থেকে ৪-৫ জন লোক নেমে নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেয়।

তল্লাশির নাম করে লুটপাট: “গাড়িতে অবৈধ মালামাল রয়েছে, ভয়ের কিছু নেই—আমরা শুধু চেক করব”—অত্যন্ত শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে ড্রাইভারের কাছ থেকে গাড়ির চাবি কেড়ে নেয় চক্রটি।

রিয়াল ও সোনা গায়েব: তল্লাশির নামে ওমার ফারুকের সাথে থাকা ৪,৭০০ সৌদি রিয়াল (প্রায় দেড় লাখ টাকার বেশি) এবং ৮৮ গ্রাম স্বর্ণালংকার পকেটে পুরে নেয় তারা।

ছুরির ভয় ও হুমকি: যাওয়ার সময় এক ডাকাতের হাতে ধারালো ছুরি ও অন্যজনের হাতে পুলিশী লাইট স্টিক দেখা যায়। “সোজা চলে যা, চিল্লাচিল্লি করবি না”—এমন হুমকি দিয়ে মাত্র দেড় মিনিটের মাথায় চম্পট দেয় চক্রটি।

সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরার আগেই সব শেষ

দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে এমন সর্বস্ব হারানোর ধাক্কায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন ওমার ফারুক। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, “যে টাকা আর সোনা নিয়ে ফিরেছিলাম, তা শুধু জিনিস ছিল না—ছিল প্রবাসে টানা ৬ বছরের দিনরাত এক করা পরিশ্রম আর পরিবারের ভবিষ্যতের ভরসা। ছিনতাইয়ের ভয়েই সারা রাত বিমানবন্দরে বসে কাটালাম, অথচ পথেই ভুয়া পুলিশের হাতে সব হারালাম! এখনো নিজের সন্তানকে ভালো করে কোলে নেওয়ার সুযোগটাই পেলাম না।”

এদিকে উপার্জন হারিয়ে ছেলে সর্বস্বান্ত হওয়ার খবর শুনে বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ওমারের মা। বৃদ্ধ বাবা দুদু মিয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন যেন পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে তাঁর ছেলের রক্ত পানি করা রিয়াল ও স্বর্ণালংকার উদ্ধার করে।

থানায় লিখিত অভিযোগ, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার আশ্বাস

ঘটনার পর ভুক্তভোগী ওমার ফারুক শেরেবাংলা নগর থানায় উপস্থিত হয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম জানান, প্রবাসীর লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ সদস্যরা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং আশপাশের সড়কের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অপরাধীদের শনাক্ত ও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে এটিকে দ্রুত নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে।

এনএন/ ০৩ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language