অপরাধ

ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী থেকে শত কোটির ‘ভূমিদস্যু’: সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও তাণ্ডবে থলের বিড়াল বের হলো নাজিমুদ্দিনের

ঢাকা, ২৭ সেপ্টেম্বর – রাজধানীর মিরপুরের ইসিবি চত্বর ও মানিকদী এলাকায় জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের প্রায় ৫ হাজার বর্গফুটের স্টুডিওতে রাতদুপুরে সন্ত্রাসী তাণ্ডব ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। তবে এই হামলার মূল নেপথ্যে সালমান মুক্তাদিরের নিজের কোনো শত্রুতা বা কর্মকাণ্ড দায়ী ছিল না—ঘটনার সূত্র ধরে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর জমি জবরদখল ও ক্যাডার রাজনীতির খবর।

ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ভবনটির মালিক ও ‘নিউগিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেড’-এর প্রতিষ্ঠাতা মো. নাজিমুদ্দিন ভূঁইয়া ওরফে আরজু (৩৭)-এর নাম। পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য অনুযায়ী, নাজিমুদ্দিন সম্প্রতি অন্য জমির মালিকদের যাতায়াতের পথ রুদ্ধ করে ৩টি বিশালাকার গেট নির্মাণ করেছিলেন। পথ উদ্ধারে ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা গেট ভাঙতে এসে নাজিমুদ্দিনের সম্পত্তি মনে করে ভুলবশত তছনছ করে ফেলে সালমান মুক্তাদিরের কোটি টাকা মূল্যের স্টুডিও।

ধর্মীয় লেবাসে জবরদখল: ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী থেকে আবাসন সাম্রাজ্য

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের সন্তান নাজিমুদ্দিনের উত্থানের ইতিহাসও রূপকথার মতো রহস্যময়।

ভুয়া পরিচয় ও উত্থান: ২০১০ সালে ঢাকায় এসে রামপুরার একটি মাদ্রাসায় পড়ালেখার সূত্রে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরে ভাসানটেকে ভাঙাড়ি ও থাই গ্লাসের ব্যবসা শুরু করেন।

রাজনৈতিক দলবদল: পরবর্তীতে ক্যান্টনমেন্ট থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাজি আব্বাসের ছত্রছায়ায় ভিড়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নিউগিনি প্রোপার্টিজ’। নিজেকে ধর্মীয় পোশাক ও আলোচনার আড়ালে ‘মাওলানা’ হিসেবে দাবি করলেও আদতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শুরু করেন পেশাদার ভূমিদস্যুতা।

জালিয়াতি: ‘গুলশান আজাদ ইউনিট আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক’ পরিচয় দিয়ে ফায়দা লুটলেও উক্ত ইউনিট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়, নাজিমুদ্দিনের কোনো পদ-পদবি ছিল না এবং তিনি একজন সম্পূর্ণ ভুয়া পরিচয়দানকারী।

১৪ বিঘা জমি দখল ও সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মারধর

রাজধানীর জোয়ারসাহারা ও বাউনিয়া মৌজায় প্রায় ১৪ বিঘা জমি গায়ের জোরে দখল করে রাখার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে।

নিঃস্ব শত শত পরিবার: বোরহান উদ্দিন, শরফত মোল্লা, হালিমা খাতুন ও আক্তারুজ্জামানদের মতো সাধারণ মানুষের বাপ-দাদার শত শত কাঠা বসতভিটা জবরদখল করে তাদের পথে বসিয়েছেন এই কথিত মাওলানা।

সেনা কর্মকর্তাকে পিটুনি: নিজের জমিতে সীমানা প্রাচীর দেখতে গিয়ে নাজিমুদ্দিনের ক্যাডার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে পিটুনির শিকার হয়েছিলেন সেনাবাহিনীর এক সাবেক কর্মকর্তাও।

রাজউকের ম্যাজিস্ট্রেটকে লাঞ্ছিত ও ২৪ মামলার পাহাড়

ক্যান্টনমেন্ট থানার মানিকদীতে রাজউকের অনুমোদন ছাড়া বহুতল ভবন নির্মাণ করায় সেখানে পরিচালিত হয়েছিল রাজউকের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ম্যাজিস্ট্রেট যখন অবৈধ ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে যান, তখন নাজিমুদ্দিন ও তার সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী সরাসরি সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলা ও মারধর চালায়। জমি জবরদখল, মারধর, সন্ত্রাস ও সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বর্তমানে কমপক্ষে দুই ডজন (২৪টি) মামলা ঝুলছে।

অঢেল অবৈধ সম্পদ ও বিদেশে টাকা পাচার

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নাজিমুদ্দিনের শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তির চিত্র:

রাজধানীতে জমি: জোয়ারসাহারা ও বাউনিয়া মৌজায় অন্তত ২৭ বিঘা জমি (যার বাজারমূল্য শতাধিক কোটি টাকা)।

বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও প্লট: মিরপুর ডিওএইচএসে ২টি বৃহৎ ফ্ল্যাট, লাল মিয়ার টেক ও সিটি কাবাব এলাকায় জমি এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এ, বি ও এন ব্লকে ৩টি প্লট ও ১টি ফ্ল্যাট।

বিদেশে বিনিয়োগ: গ্রামে ৮০ বিঘা সম্পত্তি ছাড়া দুবাইয়ে একটি স্বর্ণের দোকান এবং মালয়েশিয়ায় ২টি দোকান ও ১টি পেট্রোল পাম্পে অঢেল অর্থ পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

যদিও সব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্র দাবি করে নাজিমুদ্দিনের ভাষ্য, “আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে। মানিকদীতে কেবল ৩ কাঠা জমিতে একটা টিনশেড ঘর ছাড়া আমার আর কোনো অবৈধ সম্পদ নেই।”

স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনার পর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তবে একজন চিহ্নিত ভূমিদস্যুর কর্মকাণ্ডের কারণে নিরপরাধ তৃতীয় পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় চরম ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে এলাকায়।

এনএন/ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language