সিলেট থেকে ক্যালিফোর্নিয়া কালী প্রদীপ চৌধুরীর বিলিয়ন ডলারের বিস্ময়কর যাত্রা
নজরুল মিন্টো

মাত্র আট ডলার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পা রেখেছিলেন এক তরুণ চিকিৎসক। সামনে ছিল অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, অচেনা দেশ, আর একেবারে শুরু থেকে জীবন গড়ে তোলার কঠিন পরীক্ষা। চাকরির খোঁজে গিয়ে একদিন একটি হাসপাতালের কর্তাব্যক্তিকে বলেছিলেন, একদিন এই হাসপাতালই তিনি কিনে নেবেন। শুনতে তা দুঃসাহসী উচ্চারণের মতো লাগলেও বহু বছর পর সত্যিই সেই স্বপ্ন বাস্তব হয়। এক হাসপাতাল থেকে একাধিক হাসপাতাল, চিকিৎসাসেবা থেকে শিক্ষা, ওষুধ, আবাসন এবং বড় নির্মাণপ্রকল্প, তাঁর কর্মজীবনের পরিধি ক্রমে বিস্তৃত হতে থাকে। KPC Group-এর দাবি, তাদের নিয়ন্ত্রিত সম্পদের পরিমাণ এখন এক হাজার কোটি ডলারেরও বেশি। সেই তরুণের নাম ড. কালী প্রদীপ চৌধুরী। সিলেটে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি এখন ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক চিকিৎসক, উদ্যোক্তা ও বহুমুখী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত।
তাঁর জীবনের বিস্ময় এখানেই থেমে নেই। বয়স আশির ঘর পেরোলেও তিনি এখনও নতুন ব্যবসা, নতুন হাসপাতাল এবং আকাশচুম্বী ভবনের পরিকল্পনা নিয়ে সক্রিয়। লস অ্যাঞ্জেলেসের কেন্দ্রস্থলে তিনটি সুউচ্চ ভবনঘেরা প্রায় ৪৭ কোটি ডলারের এক বিশাল প্রকল্পের অধিগ্রহণ-উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত তাঁর প্রতিষ্ঠান। সে কারণেই আবারও সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছে তাঁর নাম। একজন অর্থোপেডিক সার্জন কীভাবে এত বড় নির্মাণ ও ব্যবসায়িক পরিসরে পৌঁছালেন, তার উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হয় বহু বছর আগের বাংলাদেশে।
সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম কালী প্রদীপ চৌধুরীর। তাঁর বাবা কালীপ্রসন্ন চৌধুরী ছিলেন জমিদার পরিবারের মানুষ। মা শোভা চৌধুরী ছিলেন শিক্ষানুরাগী। কালী প্রদীপের স্মৃতিচারণায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে মায়ের কথা। ছয় ভাইবোনকে পড়াশোনায় মনোযোগী করতে মা ভোর তিনটায় উঠে চুলা জ্বালাতেন, সন্তানদের ঘুম থেকে ডাকতেন। ছোটবেলায় এত ভোরে ঘুম থেকে ওঠার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে না পারলেও পরবর্তী জীবনে তিনি উপলব্ধি করেছেন, মায়ের সেই কঠোর নিয়মই তাঁদের জীবনে শৃঙ্খলার ভিত তৈরি করে দিয়েছিল।
সিলেটেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন। পরে ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ কলেজ, যা এমসি কলেজ নামে পরিচিত, সেখান থেকে ইন্টারমিডিয়েট সায়েন্স সম্পন্ন করেন। এরপর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে চলে যান কলকাতায়। ভর্তি হন ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে।
কলকাতায় এমবিবিএস শেষ করার পর তাঁর সামনে খুলে যায় আন্তর্জাতিক চিকিৎসাশিক্ষার পথ। মালয়েশিয়া, ইংল্যান্ড ও কানাডায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসাসেবার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এরপর পৌঁছান যুক্তরাষ্ট্রে। নতুন দেশে চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পথ সহজ ছিল না। বিদেশে অর্জিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও নতুন ব্যবস্থায় নিজেকে প্রমাণ করতে হয়েছে। চাকরির জন্য চেষ্টা করেছেন, প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হয়েছেন, আবার চেষ্টা করেছেন। নিজের জীবনের গল্প বলতে গিয়ে তিনি একাধিকবার উল্লেখ করেছেন, আমেরিকায় পৌঁছানোর সময় তাঁর পকেটে ছিল মাত্র আট ডলার।
অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থোপেডিক সার্জারিতে প্রশিক্ষণ ও পেশাগত স্বীকৃতি অর্জন করেন তিনি। American Board of Orthopaedic Surgery-এর সনদ লাভ করেন। ১৯৮২ সাল থেকে অর্থোপেডিক সার্জন হিসেবে চিকিৎসাসেবায় যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া যায় তাঁর পেশাগত পরিচিতিতে। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার হেমেট শহর হয়ে ওঠে তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। Hemet Valley Medical Center এবং Menifee Valley Medical Center-এর মতো হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত হন। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি হাসপাতাল পরিচালনা ও প্রশাসনিক দায়িত্বেও তাঁর অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে।
এখানেই তাঁর জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা। একজন চিকিৎসক সাধারণত নিজের দক্ষতা দিয়ে রোগীর চিকিৎসা করেন। কালী প্রদীপ ভাবতে শুরু করেন, চিকিৎসার পুরো ব্যবস্থাটিকেই কীভাবে আরও বড় পরিসরে পরিচালনা করা যায়। একটি হাসপাতালের কার্যক্রম, চিকিৎসক ও নার্সদের সমন্বয়, রোগীদের সেবা, আধুনিক যন্ত্রপাতি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, এসব বিষয় তাঁকে আকৃষ্ট করে। রোগীর অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি হাসপাতাল পরিচালনার ব্যবসায়িক সম্ভাবনাও দেখতে পান তিনি।
১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন KPC Group। তাঁর নামের আদ্যক্ষর দিয়েই প্রতিষ্ঠানটির নাম। শুরুতে স্বাস্থ্যসেবা ছিল ব্যবসার প্রধান ভিত্তি। পরে হাসপাতাল পরিচালনা, চিকিৎসকদের সংগঠিত সেবা, জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র ও বিশেষায়িত চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবসা বিস্তৃত হতে থাকে। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় একাধিক হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয় তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। চিকিৎসকের পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি হয়ে ওঠেন হাসপাতাল উদ্যোক্তা।
কালী প্রদীপের সাফল্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি নিজেকে একটি খাতে সীমাবদ্ধ রাখেননি। চিকিৎসাসেবার অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে শিক্ষা, ওষুধশিল্প, জৈবপ্রযুক্তি, রিয়েল এস্টেট, অবকাঠামো, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিকল্প জ্বালানির মতো নানা ক্ষেত্রে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন। KPC Group-এর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সম্পদের মোট মূল্য এক হাজার কোটি ডলারের বেশি। বিপুল ব্যবসায়িক সম্পদের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পদের কারণেও তিনি আলোচিত। বিভিন্ন সূত্রে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়।
তাঁর ব্যবসায়িক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গড়ে উঠেছে কলকাতায়। সেখানে প্রতিষ্ঠা করেছেন KPC Medical College & Hospital। চিকিৎসক তৈরির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এই মেডিকেল কলেজ পশ্চিমবঙ্গের বেসরকারি চিকিৎসাশিক্ষার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছে। হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ও প্যারামেডিকেল শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি চিকিৎসাসেবার সঙ্গে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে যুক্ত করেছেন। তাঁর জীবনের যে পথ একসময় কলকাতার একটি মেডিকেল কলেজ থেকে শুরু হয়েছিল, বহু বছর পর সেই শহরেই নিজের উদ্যোগে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা সেই পথচলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
ক্যালিফোর্নিয়ায় তাঁর ব্যবসার নতুন অধ্যায় এখন বড় বড় নির্মাণ প্রকল্প। লস অ্যাঞ্জেলেসের কাছের ইঙ্গলউড শহরে বিশ্বখ্যাত SoFi Stadium-এর পাশে নির্মিত হচ্ছে তাঁর প্রতিষ্ঠানের Kali Hotel & Rooftop। প্রায় ৩০ কোটি ডলারের এই প্রকল্পে থাকছে ৩০০টি অতিথিকক্ষ, বিলাসবহুল স্যুইট, রেস্তোরাঁ, সম্মেলনকক্ষ ও ছাদের ওপর বিশেষ বিনোদনব্যবস্থা। হোটেলটি যুক্ত হচ্ছে Marriott-এর Autograph Collection-এর সঙ্গে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ভবনটির মূল কাঠামোর নির্মাণ শেষ হয়। হোটেলটির ওয়েবসাইটে এখন ২০২৭ সালের বসন্তে উদ্বোধনের কথা বলা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ লস অ্যাঞ্জেলেসের Oceanwide Plaza। শহরের কেন্দ্রস্থলে বহু বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে তিনটি অসমাপ্ত আকাশচুম্বী ভবন। ২০১৯ সালে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ভবনগুলোর গায়ে ছড়িয়ে পড়ে গ্রাফিতি, আর স্থানীয়ভাবে সেগুলো পরিচিত হয়ে ওঠে ‘Graffiti Towers’ নামে। এত বড় একটি প্রকল্প দীর্ঘদিন অসমাপ্ত পড়ে থাকায় তা নগর কর্তৃপক্ষের জন্যও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রায় ৪৭ কোটি ডলারে সেই প্রকল্প অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেয় কালী প্রদীপ চৌধুরীর KPC Group এবং নির্মাণপ্রতিষ্ঠান Lendlease-এর যৌথ প্রতিষ্ঠান KPC Square। তাদের লক্ষ্য দীর্ঘদিন অসমাপ্ত পড়ে থাকা ভবনগুলোর নির্মাণকাজ শেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেসের কেন্দ্রস্থলে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনা।
কালী প্রদীপের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর পরিবারের ভূমিকা। দীর্ঘ পেশাগত ও ব্যবসায়িক পথচলায় পাশে ছিলেন স্ত্রী সুনন্দা চৌধুরী। প্রায় ৪৮ বছরের দাম্পত্যজীবনে একসঙ্গে কাটিয়েছেন সাফল্য ও সংকটের দিনগুলো। নিজের স্মৃতিচারণায় কালী প্রদীপ বলেছেন, কঠিন আর্থিক সময়ে স্ত্রী নিজের সোনার গয়না বিক্রি করে তাঁকে সহায়তা করার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। ২০২৫ সালে সুনন্দার মৃত্যু তাঁর ব্যক্তিজীবনে বড় শূন্যতা তৈরি করে। তাঁদের দুই সন্তান কালী প্রিয় চৌধুরী ও ড. সুমন্তা চৌধুরী সাইনি। ছয় নাতি-নাতনিও রয়েছে পরিবারে। দীর্ঘ ব্যবসায়িক জীবনের অর্জনের কথা বলতে গিয়ে তিনি এখনও স্ত্রীর অবদান এবং মা-বাবার শিক্ষার কথা স্মরণ করেন।
ব্যবসার পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক উদ্যোগেও যুক্ত হয়েছেন তিনি। Kali P. Chaudhuri Foundation এবং KP Human Development Foundation-এর মাধ্যমে শিক্ষাবৃত্তি, স্বাস্থ্যসহায়তা, পুষ্টি ও গ্রামীণ উন্নয়নের বিভিন্ন কার্যক্রমে সহায়তা দেওয়া হয়। তাঁর প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হাসপাতালগুলোর মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের চিকিৎসা, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং কমিউনিটিভিত্তিক সেবার উদ্যোগও রয়েছে। চিকিৎসক হিসেবে যে পেশাজীবন শুরু করেছিলেন, সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে জনকল্যাণমূলক কাজের একটি ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
ব্যক্তিগত জীবনে কালী প্রদীপ চৌধুরী একজন দানশীল ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। চিকিৎসা ও শিক্ষার পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। উত্তর আমেরিকায় বাঙালিদের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক আয়োজন বঙ্গ সম্মেলনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন তিনি। প্রবাসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির চর্চাকে এগিয়ে নিতে এসব আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যবসায়িক ব্যস্ততার মধ্যেও বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর এই সম্পৃক্ততা তাঁর জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক।
বাংলাদেশের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক বজায় রয়েছে। জন্মভূমি সিলেটের প্রতি তাঁর বিশেষ টান। ২০১৬ সালে ঢাকার পূর্বাচলে ১৪২ তলা ভবন নির্মাণের একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত হয়েছিল। রাজধানী ঢাকায় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও ছিল আলোচনায়। বাংলাদেশে বড় পরিসরে বিনিয়োগ ও প্রতিষ্ঠান গড়ার আগ্রহ যে তাঁর দীর্ঘদিনের, এসব পরিকল্পনায় তার পরিচয় পাওয়া যায়।
তথ্যসূত্র: KPC Group, KPC Health, Los Angeles Business Journal, Bloomberg, GlobeNewswire







