সম্পাদকের পাতা

স্ত্রীকে হত্যা করে ২০ বছর পালিয়ে থেকেও শেষরক্ষা হলো না

নজরুল মিন্টো

২০০৪ সালের ২৯ আগস্ট। কানাডার টরন্টো শহরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একটি বহুতল আবাসিক ভবন। গভীর রাত। চারপাশ যখন নিস্তব্ধ, তখন ওপরের একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ভেসে আসে নারী-পুরুষের উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা। স্প্যানিশ ভাষায় চিৎকার করছেন এক পুরুষ। আতঙ্কিত এক নারী বারবার ঈশ্বরের কাছে সাহায্য চাইছেন। নিচের তলায় বসবাসকারী এক প্রতিবেশীর ঘুম ভেঙে যায় সেই চিৎকারে। কিছুক্ষণ পর শোনা যায় নারীর এক ভয়ংকর আর্তনাদ। তারপর হঠাৎ সব নিস্তব্ধ। প্রতিবেশী তখনো জানতেন না, মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে যে আর্তচিৎকার তিনি শুনেছেন, সেটিই ছিল ২৬ বছর বয়সী রোসাউরা তোলেন্তিনো রামোসের জীবনের শেষ আর্তনাদ।

পরদিন সকালে সেই অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দা হুয়ান আন্তোনিও আভালোসকে দেখা যায় স্যুটকেস নিয়ে ভবন থেকে বেরিয়ে যেতে। এরপর তিনি কানাডা ছেড়ে পালিয়ে যান মধ্য আমেরিকার দেশ এল সালভাদরে। অথচ টরন্টোয় তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের শোবার ঘরে পড়ে থাকে স্ত্রী রোসাউরার নিথর দেহ। গলায় ছুরিকাঘাতের ক্ষত। মাথার কাছেই একটি রান্নাঘরের ছুরি। স্ত্রীকে হত্যার পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া আভালোসকে গ্রেপ্তার করতে লেগে যায় দীর্ঘ ২০ বছর।

অবশেষে ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর, বুধবার টরন্টোর অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্ট অব জাস্টিসে ৬৫ বছর বয়সী আভালোসকে স্ত্রীর মৃত্যুর জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আদালতের কার্যক্রম জুমের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করেন নিহত রোসাউরার স্বজনেরা। ২০০৪ সালে হত্যাকাণ্ডের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত বিচারের হাত থেকে রক্ষা পাননি আভালোস।

এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের ঘটনাগুলো আরও বেদনাদায়ক। আভালোস ১৯৮৫ সালে মধ্য আমেরিকার দেশ এল সালভাদর থেকে কানাডায় অভিবাসী হিসেবে আসেন। পরবর্তী সময়ে কানাডার নাগরিকত্ব লাভ করেন। ২০০৩ সালের শরৎকালে একটি কমিউনিটি সেন্টারে একজন ধর্মযাজকের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় হয় রোসাউরার সঙ্গে। পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা, তারপর বিয়ে। ওই বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। নতুন সংসার শুরু হয়েছিল অনেক আশা নিয়ে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সেই সম্পর্কের ভেতর দেখা দেয় সহিংসতা ও অশান্তি।

২০০৪ সালের জানুয়ারিতে স্ত্রীকে শারীরিকভাবে আক্রমণের অভিযোগে আভালোসকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। আদালত তাঁর জামিনের শর্তে স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেন। এ ঘটনায় তাঁর বিচার হওয়ার কথা ছিল ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু সেই বিচার শুরু হওয়ার আগেই রোসাউরার জীবন শেষ হয়ে যায়। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় তিনি টরন্টোর ফিঞ্চ অ্যাভিনিউ ওয়েস্টের অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ২০০৪ সালের ২৯ আগস্ট বিকেল অথবা সন্ধ্যায় আভালোস সেখানে যান। এর কয়েক ঘণ্টা পর রোসাউরা ও আভালোস দুজনেই ছিলেন আভালোসের অ্যাপার্টমেন্টে। রোসাউরা কীভাবে সেখানে গিয়েছিলেন, তা আদালতে উপস্থাপিত তথ্য থেকে জানা যায়নি।

সেদিন রাত দশটার পর রোসাউরা ও আভালোস দুজনেই ছিলেন ২৩৯৭ ফিঞ্চ অ্যাভিনিউ ওয়েস্টের পেন্টহাউস অ্যাপার্টমেন্টে। সেখানে তাঁরা ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঠিক কী নিয়ে বিরোধ শুরু হয়েছিল, তা জানা যায়নি। তবে গভীর রাতে তাঁদের ঝগড়ার শব্দে ঘুম ভেঙে যায় ভবনটির ১২ তলায় বসবাসকারী এক নারীর। তাঁর অ্যাপার্টমেন্টটি ছিল আভালোসের অ্যাপার্টমেন্টের ঠিক নিচে। তিনি স্প্যানিশ ভাষায় এক পুরুষকে উত্তেজিত কণ্ঠে গালাগাল করতে শোনেন। অন্যদিকে এক নারী অসহায়ভাবে বলছিলেন, ‘সান্তা মারিয়া’, ‘নো দিয়োস’। ঈশ্বরের কাছে সাহায্য চাইছিলেন তিনি। কয়েক মিনিটের উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার পর হঠাৎ শোনা যায় নারীর তীব্র আর্তচিৎকার। কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী সেই চিৎকারের পর সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে যায়।

পরদিন ভোরে নিজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওই প্রতিবেশী ওপরের দিক থেকে পানি ও ঝাড়ু দিয়ে মেঝে ঘষার শব্দ শুনতে পান। শব্দ শুনে তাঁর মনে হয়েছিল, কেউ পাশের বারান্দা অথবা ঘরের মেঝে পরিষ্কার করছেন। এই শব্দের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা তখন তাঁর জানার কথা নয়। কিন্তু দীর্ঘ ২২ বছর পর আদালতে সেই রাতের চিৎকার ও পরদিন ভোরের শব্দের বিবরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সরকারি আইনজীবী স্কট আর্নল্ড আদালতে প্রতিবেশীর এসব বক্তব্য তুলে ধরেন।

আভালোসের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ধরা পড়ে ভবনের নিরাপত্তা ক্যামেরায়। ৩০ আগস্ট সকাল ছয়টার দিকে দুটি স্যুটকেস নিয়ে তিনি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বের হন। গাড়ি নিয়ে ভবনের পার্কিং এলাকা ত্যাগ করেন। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে আবার ফিরে এসে নিজের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে আরও কিছু ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যান। সকাল আটটার কিছু পর কাছের একটি সিআইবিসি ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে এক হাজার কানাডীয় ডলার উত্তোলন করেন। এরপর গাড়ি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট মেট্রোপলিটন বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হন।

সেখানেই নগদ টাকায় কেনেন এল সালভাদর যাওয়ার একমুখী বিমানের টিকিট। সেদিন সন্ধ্যা ৭টা ৮ মিনিটে তাঁর বিমান ছেড়ে যায়। অরল্যান্ডো ও লস অ্যাঞ্জেলেস হয়ে ৩১ আগস্ট তিনি পৌঁছে যান এল সালভাদরে। কানাডার মাটিতে তখনো তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর খবর পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। নিজের দেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে চলে গিয়ে তিনি কার্যত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাগালের বাইরে চলে যান।

এদিকে ২৯ আগস্টের পর থেকে রোসাউরার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। উদ্বিগ্ন হয়ে ৩১ আগস্ট তাঁর বোন পুলিশের কাছে নিখোঁজের অভিযোগ করেন। পুলিশ তখন ২৩৯৭ ফিঞ্চ অ্যাভিনিউ ওয়েস্টে আভালোসের পেন্টহাউস অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে খোঁজ নেয়। শোবার ঘরের বিছানায় পাওয়া যায় রোসাউরার নিথর দেহ। তাঁর পরনে তখনো সেই লাল রঙের পোশাক, যা তিনি ২৯ আগস্ট পরেছিলেন। গলার বাঁ পাশে গভীর ছুরিকাঘাতের ক্ষত এবং মাথার কাছে একটি রান্নাঘরের ছুরি পাওয়া যায়। ময়নাতদন্তে নিশ্চিত হয়, গলায় ছুরিকাঘাতের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

মাত্র ২৬ বছর বয়সে রোসাউরার জীবন থেমে যায়। বিয়ের এক বছরও পূর্ণ হয়নি। স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর তিনি আদালতের সুরক্ষা পেয়েছিলেন। স্বামীর অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে বোনের বাড়িতে আশ্রয়ও নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রাণ রক্ষা করতে পারেননি।

হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে টরন্টো পুলিশ দ্রুতই আভালোসকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করে। ২০০৪ সালের ১ অক্টোবর তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলও তাঁর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে। কানাডার তদন্তকারীরা তাঁর অবস্থান শনাক্ত করতে চেষ্টা চালালেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় দুই দেশের প্রত্যর্পণসংক্রান্ত আইনি ব্যবস্থা। ২০০৪ সালে কানাডা ও এল সালভাদরের মধ্যে কার্যকর প্রত্যর্পণ চুক্তি ছিল না। ফলে তাঁকে খুঁজে পাওয়া গেলেও সহজে কানাডায় ফিরিয়ে আনার সুযোগ ছিল না।

এভাবেই বছরের পর বছর কেটে যায়। টরন্টোয় রোসাউরার হত্যাকাণ্ড পুলিশের অমীমাংসিত মামলার তালিকায় থেকে যায়। নতুন তদন্ত আসে, নতুন অপরাধ ঘটে, সময়ের সঙ্গে শহরের চেহারাও পাল্টে যায়। কিন্তু রোসাউরার পরিবারের কাছে ২০০৪ সালের সেই ভয়ংকর রাতটি অতীত হয়ে যায়নি। তাঁদের প্রিয়জনের মৃত্যুর বিচার তখনো অসম্পূর্ণ।

দীর্ঘ ২০ বছর পর ২০২৪ সালের ২৪ জানুয়ারি মামলাটি নতুন মোড় নেয়। সেদিন ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে এল সালভাদরে আভালোসকে গ্রেপ্তার করা হয়। দেশটির সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, লা ইউনিয়ন অঞ্চলের সান আলেহো এলাকার কোপালিওতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে কারাগারে রাখা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে কানাডার কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রত্যর্পণের আবেদন জানায়। ফেব্রুয়ারিতে এল সালভাদরে প্রত্যর্পণসংক্রান্ত শুনানি শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে কানাডায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৫ আগস্ট টরন্টো পুলিশের তদন্তকারীরা এল সালভাদরে গিয়ে আভালোসকে ফিরিয়ে আনেন। কানাডায় পৌঁছানোর পর তাঁর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় মাত্রার হত্যার অভিযোগে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।

অবশেষে ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর মামলার গুরুত্বপূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আভালোসের বয়স এখন ৬৫ বছর। টরন্টোর সুপিরিয়র কোর্টে বিচারকের সামনে তাঁকে উপস্থিত করা হয়। আদালতে দোভাষীর মাধ্যমে তিনি জানান, অনিচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগে তিনি নিজেকে নির্দোষ মনে করেন। এরপর সরকারি আইনজীবী স্কট আর্নল্ড ও ইসোল্ট ব্রার মামলার ঘটনাবলি বিচারকের সামনে উপস্থাপন করেন। আশ্চর্যের বিষয়, সেদিন এসব তথ্য নিয়ে আসামিপক্ষ কোনো বিরোধিতা করেনি। আভালোসের আইনজীবী ইয়ান ম্যাককুয়েগ কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণও উপস্থাপন করেননি।

একদিনের বিচারিক কার্যক্রম শেষে আভালোসকে manslaughter বা অনিচ্ছাকৃত হত্যার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আদালত জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে তাঁর সাজা নির্ধারণের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

রোসাউরার পরিবারের জন্য এই রায় দীর্ঘ ২২ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছে। কিন্তু আদালতের সিদ্ধান্ত তাঁদের প্রিয়জনকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। যে তরুণীর জীবন মাত্র ২৬ বছর বয়সে থেমে গিয়েছিল, তাঁর মৃত্যুর শোক নিয়েই পরিবারটিকে বেঁচে থাকতে হয়েছে এতগুলো বছর।

এই হত্যাকাণ্ড পারিবারিক সহিংসতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার জটিলতাও সামনে এনেছে। কানাডায় অপরাধ সংঘটনের পর আভালোস নিজের জন্মভূমিতে পালিয়ে যান। দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় তাঁকে ফিরিয়ে আনা সহজ ছিল না। কিন্তু টরন্টো পুলিশ তদন্ত বন্ধ করেনি। দীর্ঘ ২০ বছর পর তাঁকে গ্রেপ্তার করে কানাডায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

রোসাউরা স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করেছিলেন। স্বামীর বাড়ি ছেড়ে বোনের কাছে আশ্রয়ও নিয়েছিলেন। তারপরও শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবন রক্ষা করা যায়নি। ঘটনাটি তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়। পারিবারিক সহিংসতার শিকার একজন নারী আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরও তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব? ২০০৪ সালের সেই ভয়ংকর রাতের ২২ বছর পর আভালোস দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এখন অপেক্ষা তাঁর সাজা ঘোষণার।

তথ্যসূত্র: Global News, CityNews Toronto

Back to top button
🌐 Read in Your Language