
অফিসে যেতে হয় না। সকাল নয়টায় হাজিরা দেওয়ার তাড়া নেই। মাস শেষে বসের কাছ থেকে বেতনের চেকও নিতে হয় না। তাঁর কর্মস্থল নিজের বাড়ি, কাজ সংসার ও সন্তান সামলানো। কিন্তু সেই কাজের জন্যই বছরে আড়াই লাখ ডলার পান আজ’আ ইয়াদা। এখানেই শেষ নয়। প্রতিবার গর্ভধারণের জন্য আরও দেড় লাখ ডলার। প্রতিটি সন্তানের জন্যও ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত বছরে দেড় লাখ ডলার করে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তাঁর স্বামী ইয়াহদান ইয়াদা।
এত টাকা স্ত্রীকে যিনি দেন, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, লোকটির নিজের সম্পদ কত এবং এত অর্থ আসে কোথা থেকে? ইয়াহদান ইয়াদার ব্যক্তিগত সম্পদের নির্ভরযোগ্য কোনো প্রকাশ্য হিসাব নেই। তাঁর মোট মাসিক বা বার্ষিক আয়ও প্রকাশিত নয়। তবে তিনি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার নন, তাঁর প্রধান পরিচয় উদ্যোক্তা। আটলান্টাভিত্তিক The World’s Greatest Rejuvenation-এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়াদা স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস পণ্য, হারবাল সামগ্রী, ডিজিটাল গাইড ও ব্যক্তিগত পরামর্শ বিক্রি করেন। ২০২১ সালে LatestLY-তে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম পাঁচ বছরে ৫ মিলিয়ন ডলার মুনাফার কথা উল্লেখ করা হয়। এর বাইরে পশ্চিম আফ্রিকায় Yadalo Group SA নামে পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যবসাও রয়েছে তাঁর। ২০২২ সালে সেনেগালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি পরে মালিতেও কার্যক্রম বাড়ায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইয়াদার উপস্থিতি বড়। Instagram-এই তাঁর অনুসারী প্রায় ১২ লাখ। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে তাঁর প্রকৃত আয় কত, সেই তথ্য প্রকাশিত নয়।
কিন্তু সামর্থ্য থাকলেই কেউ স্ত্রীকে ঘর সামলানোর জন্য বছরে আড়াই লাখ ডলার দেন না। ইয়াদার এই চিন্তার শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় তাঁর শৈশবে।
ইয়াদা বড় হয়েছেন সিঙ্গেল মাদারের সংসারে। তাঁর নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, পরিবারের খরচ চালাতে মা একসঙ্গে একাধিক কাজ করতেন, বেশির ভাগই পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ। কখনো একটি শিফট শেষ করে বাড়ি ফিরে কাজের পোশাক পরেই চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়তেন, কারণ কিছুক্ষণ পর আবার পরের কাজে বের হতে হতো। ইয়াদা তাঁর শৈশবের দারিদ্র্য ও কঠিন বাস্তবতার কথাও বলেছেন বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে। মায়ের সেই সংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা পরিবার, অর্থ এবং একজন পুরুষের দায়িত্ব সম্পর্কে তাঁর পরবর্তী চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
সেখান থেকেই ইয়াদার হিসাবটা বেশ সোজা। একজন নারী সন্তান জন্ম দেবেন, তাদের বড় করবেন, ঘরের অসংখ্য দায়িত্ব সামলাবেন, অথচ সেই শ্রমের কোনো আর্থিক মূল্য থাকবে না, এই ধারণা তিনি মানতে রাজি নন। তাঁর কাছে স্ত্রীকে আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়া কেবল ভালোবাসার প্রকাশ নয়, স্বামীর দায়িত্বও। তাই মুখে কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি স্ত্রীর শ্রমের মূল্য তিনি ডলারে হিসাব করেছেন।
বিষয়টি প্রথম বড় করে আলোচনায় আসে ২০২৪ সালে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইয়াদা জানান, ঘরে থেকে সন্তান ও সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য স্ত্রী আজ’আকে বছরে আড়াই লাখ ডলার দেন তিনি। অর্থটি যায় আজ’আর নিজের ব্যাংক একাউন্টে। সেই একাউন্টে ইয়াদার কোনো প্রবেশাধিকার নেই এবং সংসারের কোনো বিলও আজ’আকে ওই টাকা থেকে দিতে হয় না। স্ত্রী চাইলে টাকা জমাতে পারেন, বিনিয়োগ করতে পারেন কিংবা নিজের ইচ্ছামতো খরচ করতে পারেন।
আড়াই লাখ ডলারের বাইরেও রয়েছে আরও অনেক কিছু। ইয়াদা জানিয়েছেন, বাড়িতে তাঁর স্ত্রীর জন্য ব্যক্তিগত শেফ, গৃহকর্মী ও স্টাইলিস্ট রয়েছে। রয়েছে আলাদা কেনাকাটার বাজেট এবং বন্ধুদের সঙ্গে বছরে সম্পূর্ণ খরচ বহন করা সফরের ব্যবস্থাও। আরও মজার বিষয়, স্ত্রীর ব্যাংক একাউন্টে নিজের প্রবেশাধিকার না থাকলেও ইয়াদা জানিয়েছেন, তাঁর ব্যাংক একাউন্ট ও ব্যবসায় আজ’আর প্রবেশাধিকার রয়েছে। ইয়াদার ভাষায়, তাঁর টাকা স্ত্রীরও, কিন্তু স্ত্রীর নিজের টাকা শুধু স্ত্রীর।
এই আর্থিক ব্যবস্থার অঙ্ক কতটা বড় হতে পারে, তা আরও পরিষ্কার হয় ২০২৫ সালের শেষ দিকে। তখন দম্পতি তাঁদের পঞ্চম সন্তানের অপেক্ষায় ছিলেন এবং হিসাবটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ভাইরাল হয়। পাঁচ সন্তানের জন্য বার্ষিক সন্তানভাতা দাঁড়ায় সাড়ে সাত লাখ ডলার। এর সঙ্গে আজ’আর নিজের আড়াই লাখ ডলার যোগ করলে বছরে মোট অঙ্ক পৌঁছায় ১০ লাখ ডলারে। গর্ভধারণের জন্য দেওয়া অর্থটি এর বাইরে।
অঙ্কটি শুনে আজ’আকে নিছক একজন গৃহিণী ভাবারও কারণ নেই। তিনি নিজেও একজন উদ্যোক্তা ও ডুলা (Doula), অর্থাৎ গর্ভাবস্থা, সন্তান প্রসব ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে মায়েদের সহায়তাকারী। Dynasty Strategy & Doula Services-এর প্রতিষ্ঠাতা আজ’আ পরিবার, মাতৃত্ব, ব্যবসা এবং প্রজন্ম ধরে সম্পদ গড়ে তোলার কৌশল নিয়ে কাজ করেন। ২০২৩ সালে নিজের একটি লেখায় তিনি বলেছিলেন, মাতৃত্ব ও ব্যবসার মধ্যে নারীদের একটি বেছে নিতেই হবে, এমন ধারণায় তিনি বিশ্বাস করেন না। তাঁর মতে, দুটিই পাশাপাশি চালানো সম্ভব।
ইয়াদাও স্ত্রীকে দেওয়া অর্থকে সাধারণ চাকরির বেতন হিসেবে দেখেন না। তাঁর বক্তব্য, সন্তান লালন-পালন পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। তিনি অন্য পুরুষদের আড়াই লাখ ডলার দেওয়ার কথা বলেন না। তাঁর কথা হলো, যার যতটুকু সামর্থ্য, সে অনুযায়ী স্ত্রীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত। নিজের ক্ষেত্রে অঙ্কটা এত বড় কেন, তার জবাবও দিয়েছেন সহজভাবে। তিনি সবকিছু বড় করে করতে পছন্দ করেন।
ইয়াদার ব্যক্তিগত জীবনও প্রচলিত ছকের নয়। ২০২৪ সালে TUKO-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তাঁর দুই স্ত্রী রয়েছেন। একজন পশ্চিম আফ্রিকায়, অন্যজন যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর দাবি, পশ্চিম আফ্রিকায় থাকা স্ত্রী একটি ট্রাকিং কোম্পানি পরিচালনা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে থাকা স্ত্রীও একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে রয়েছেন। দুই পরিবারের পাশাপাশি তাঁদের আত্মীয়স্বজনেরও আর্থিক দায়িত্ব বহন করেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
স্ত্রীকে বছরে এত টাকা দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়াও হয়েছে দুই রকম। একদল মনে করেন, গৃহিণী ও মায়েদের যে শ্রম যুগের পর যুগ আর্থিক স্বীকৃতি পায়নি, ইয়াদা অন্তত সেটির একটি মূল্য নির্ধারণ করেছেন। সন্তান জন্ম দেওয়া, রাত জেগে শিশুকে সামলানো, রান্না, ঘর সামলানো, স্কুলের কাজ, চিকিৎসকের কাছে নেওয়া, বাজার থেকে শুরু করে পরিবারের অসংখ্য ছোট-বড় দায়িত্বের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই। অন্য কাউকে দিয়ে এসব কাজ করাতে গেলেও যে বিপুল অর্থ খরচ হতো, সেই কথাও সামনে আনছেন তাঁরা।
অন্যদের আপত্তি আবার অন্য জায়গায়। তাঁদের প্রশ্ন, স্বামী যখন স্ত্রীকে ‘বেতন’ দেন, তখন ভালোবাসা ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ব্যবসায়িক হিসাব ঢুকে পড়ে কি না। কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এত বড় অঙ্ক দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া কতটা বাস্তবসম্মত। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাস্যরসও কম হয়নি। অনেকের বক্তব্যের সারকথা, ইয়াদার দর্শনে আপত্তি নেই, সমস্যা নিজেদের ব্যাংক ব্যালান্সে।
বিতর্ক যা-ই থাক, ইয়াহদান ইয়াদা অন্তত এমন একটি কাজ করেছেন, যার ফলে ঘরের ভেতরের শ্রমের দাম নিয়ে মানুষ আবার কথা বলছে। রান্নাঘরের চুলা সামলানো থেকে স্কুলের টিফিন তৈরি, অসুস্থ সন্তানের পাশে রাত জাগা পর্যন্ত এসব কাজের জন্য সাধারণত কোনো বেতনপত্র থাকে না। ইয়াদা সেই অদৃশ্য কাজের পাশে ডলারের অঙ্ক বসিয়ে দিয়েছেন।
তাঁর অঙ্ক প্রায় সবার নাগালের বাইরে। কিন্তু প্রশ্নটি মোটেও নাগালের বাইরে নয়। ঘর সামলানো আর সন্তান বড় করার কাজটিকে সত্যিই যদি পেশা হিসেবে হিসাব করা হতো, তাহলে একজন স্ত্রীর বেতন কত হওয়া উচিত?
তথ্যসূত্র:
Atlanta Black Star
The Standard
FAQ
১. ইয়াহদান ইয়াদা স্ত্রীকে বছরে কত টাকা দেওয়ার দাবি করেছেন?
ইয়াদার দাবি অনুযায়ী, স্ত্রী আজ’আ ইয়াদাকে ঘরে থেকে সন্তান ও সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য বছরে ২.৫ লাখ ডলার দেওয়া হয়।
২. প্রতিটি সন্তানের জন্য কত টাকা দেওয়ার দাবি করেছেন ইয়াদা?
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিটি সন্তানের জন্য ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত বছরে ১.৫ লাখ ডলার দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
৩. প্রতিটি গর্ভধারণের জন্য কত টাকা দেওয়ার কথা বলেছেন?
ইয়াদা প্রতি গর্ভধারণের জন্য ১.৫ লাখ ডলার দেওয়ার দাবি করেছেন।
৪. ইয়াহদান ইয়াদা কী ব্যবসা করেন?
তিনি The World’s Greatest Rejuvenation-এর প্রতিষ্ঠাতা। প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস পণ্য ও ডিজিটাল সামগ্রী বিক্রি করে। তিনি Yadalo Group SA-এর সঙ্গেও যুক্ত, যা পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত।
৫. ইয়াহদান ইয়াদার মোট সম্পদ কত?
তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের নির্ভরযোগ্য, স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রকাশ্য হিসাব পাওয়া যায় না। তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট তাঁকে বহু-মিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের নির্মাতা হিসেবে বর্ণনা করে, তবে এটি স্বাধীন সম্পদ-যাচাই নয়।







